| |

ইসলামী জীবনধারায় জাকাতের ব্যবহার

আপডেটঃ 12:44 pm | June 20, 2017

Ad

প্রদীপ ভৌমিক:  জাকাত শব্দটি আরবী। এর অর্থ পবিএতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। ইসলামের পাচঁটি স্তম্বের মধ্যে জাকাত হলো  তৃতীয়। ঈমানের পর নামায ও তার পরই জাকাতের স্থান। পবিএ কোরআন শরীফে ৩২ জায়গায় জাকাতের কথা বলা হয়েছে।

 

তার মধ্যে ২৮ জায়গায় নামায ও জাকাতের কথা একএে উল্লেখ করা  হয়েছে। জাকাত স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক, মুসলিম নর-নারী আদায় করবে যার কাছে নিসাব পরিমান সম্পদ আছে। তার এর জন্য শর্ত হলো সম্পদের উপর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা থাকতে হবে।

 

সম্পদ উৎপাদনক্ষম ও বর্ধনশীল হতে হবে। সারা বছরের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকলেই জাকাত ফরয হবে। জাকাত ফরয হওয়ার জন্য ঋণ মুক্ত নিসাব পরিমান সম্পদ থাকা প্রধান শর্ত।

 

কারো কাছে নিসাব পরিমান সম্পদ এক বছর থাকলেই শুধূ এই সম্পদের উপর জাকাত দিতে হয়। জাকাতের নিসাব সোনা ৭.৫ তোলা= ৯৫.৭৪৮ গ্রাম প্রায়। রূপা ৫২.৫ তোলা= ৬৭০.২৪ গ্রাম প্রায়। দেশি,বিদেশী মুদ্রা ও ব্যাবসায়ীক পণ্যের নিসাব নির্ধারণে সোনা-রূপা হলো পরিমাপক।

 

ফকির মিসকিনদের জন্য যেটি বেশি লাভজনক হবে সেটিকে পরিমাপক হিসেবে গ্রহন করায় শরীয়তের নির্দেশ। তাই মুদ্রা ও পণ্যের বেলায় বর্তমানে রূপার নিসাবই পরিমাপক হিসেবে গণ্য হবে। তাই যার কাছে ৫২.৫ তোলা সমমূল্যের দেশি ও বিদেশী মুদ্রা বা ব্যবসায়ীক পন্য মজুদ থাকবে তার উপর জাকাত ওয়াজিব হবে।

 

যে সম্পদের উপর জাকাত ফরজ তার ৪০ ভাগের ১ ভাগ (২.৫০) শতাংশ জাকাত দেওয়া ফরজ। সম্পদের মূল্যে নির্ধারন করে শতকরা আড়াই টাকা বা হাজারে ২৫ টাকা হারে নগদ অর্থ কিংবা ঐ পরিমান টাকার কাপর চোপর বা অন্য কোন প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দিলেও জাকাত আদায় হবে (আবু দাউদ,হাদিস ১৫৭২,সুনানে তিরমিজি হাদিস ৬২৩)।

 

সব ধরনের সম্পদে জাকাত ফরজ হয়না। শুধূ সোনা-রূপা, টাকা-পয়সা, পালিত পশু (নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী) এবং ব্যবসার পণ্যে জাকাত ফরজ হয়। সোনা-রূপার অলংকার সব সময় বা কালেভদ্রে ব্যবহৃত হউক কিংবা একেবারেই ব্যবহার না করা হউক, সর্বাবস্থায় তার জাকাত দিতে হবে (আবু দাউদ শরিফ ১-২৫৫ নাসায়ি হাদিস: ২২৫৮) ।

 

অলংকার ছাড়া সোনা-রূপার অন্যান্য সামগ্রীর উপরও জাকাত ফরজ। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক হাদিস : ৭০৬১)। ব্যাংক ব্যালেন্স ফি´ড ডিপোজিড,বন্ড শেয়ার সার্টিফিকেট ইত্যাদি নগদ টাকা-পয়সার মতই।

 

এ সবের উপরেও জাকাত ফরজ। টাকা-পয়সা ব্যবসায় না খাটিয়ে এমনি রেখে দিলেও তাতে জাকাত ফরজ (আদ্দুররুল মুখতার: ২/২৬৭) । হজ্বের উদ্দেশ্যে কিংবা ঘরবাড়ী নির্মাণ ছেলে মেয়ের বিয়েশাদি ইত্যাদি প্রয়োজনের জন্য যে অর্থ সঞ্চয় করা হয় তাতেও জাকাত দিতে হবে (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস: ১০৩২৫) ।

 

দোকানপাটে বা কিছু বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে রাখা থাকে তা বানিজ্যিক পণ্য এর মূল্যে নিসাব পরিমান হলে যাকাত আদায় করা ফরজ (সুনানে আবু দাউদ: ১/২১৮)।

 

ব্যবসার নিয়তে কোনকিছু ক্রয় করলে বা স্থাবর সম্পত্তি হউক যেমন: জমি-জামা, ফ্ল্যাট কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি যেমন: মুদি-সামগ্রী, কাপর-চোপর, অলংকার, নির্মান-সামগ্রী, গাড়ী, ফার্নিচার, ইলেক্ট্রনিক-সামগ্রী, হার্ডওয়ার-সামগ্রী, বই-পুস্তক ইত্যাদি তা বানিজ্যিক পণ্য বলে গণ্য হবে। এবং মূল্য নিসাব পরিমান হলে জাকাত দিতে হবে (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭১০৩) ।

 

যদি সোনা-রূপা টাকা-পয়সা কিংবা বানিজ্যিক পণ্যের মধ্যে কোনাটি পৃথকভাবে নিসাব পরিমান না থাকে কিন্তু এ সবের    একাদিক সামগ্রী এ পরিমান রয়েছে যা একএ করলে ৫২ তোলার সম-পরিমান বা তার চেয়ে বেশি হয় তাহলে এক্ষেএে সব সম্পদের হিসাব করে জাকাত দিতে হবে (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭০৮১) ।

 

ভ’মি বা রটের ক্ষেএে জাকাতের বিধান হলো যদি ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে ভ’মি বা প্লট ক্রয় করা হয়। প্রতি বছর বাজার মূল্য বিবেচনা করে জাকাত দিতে হবে। দোকানে বিক্রি করার জন্য যে সমস্ত পণ্য বিদ্যমান থাকে তার মূল্য যদি নিসাব পরিমান হয় এ ক্ষেএে জাকাত ফরয হবে।

 

এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর দোকানে ব্যবসার জন্য যে পণ্য থাকে তা যদি নিসাব পরিমাণ হয় সেক্ষেএে সমদয় সম্পদের আড়াই শতাংশ জাকাত দিতে হবে।

 

দোকান ও বাড়ী ভাড়ার জন্য এডভান্স দিতে হয় সেক্ষেএে যেহেতু এডভান্সের টাকা মালিকের হয়ে যায়না তাই তার মালিকানায় এ টাকা রয়ে যায় বিধায় ইহা যদি নিসাবের পরিমান হয় তাহলে জাকাত দিতে হবে।

 

দোকানে বা বাড়ী ভাড়া গ্রহনকারী ব্যাক্তির জন্য জাকাত আদায় করা জরুরী। গরু বকরি ও মুরগীর ফার্মের পালিত প্রানি এক পর্যায়ে বিক্রি করা হয় এসব প্রানীর বিক্রয় মুল্য যদি নিসাব পরিমান হয় তাহলে জাকাত দেওয়া আবশ্যক।

 

বীমায় যে সমস্ত টাকা কাজে লাগানো হয় তার উপর জাকাত ওয়াজিব। প্রতিবছর জাকাত আদায় করার সময় নিজ সম্পদের হিসাব করতে হবে (ফাতাওয়া উসমানি: ২-৩৯) কম্পানির শেয়ারের উপর জাকাত ওয়াজিব হবে এই শর্তে জায়েয আছে যে তার লেনদেন যদি বৈধ হয়।

 

এ ক্ষেএে তার অংশের মুল্যের উপর জাকাত ওয়াজিব হবে (ফাতাওয়া উসমানি: ২-৩৯)। কাফিরদের জাকাত দেওয়া যাবেনা। নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক। নিসাব পরিমান সম্পদের মালিকের নাবালক সন্তান বনু হাশেমের লোক মা, বাবা দাদা-দাদি, নানা-নানি একই ভাবে যত উপরের স্তরের দিকে কাউকে জাকাত দেওয়া যাবেনা ।

 

অর্থাৎ যাদের মাধ্যমে দুনিয়াই এসেছ তাদের সহ উপরের স্তরের কাউকে জাকাত দেওয়া যাবেন। নিজের মাধ্যমে যারা দুনিয়াই এসেছে অর্থাৎ ছেলে মেয়ে ও তাদের সন্তানাদি একই ভাবে তাদের সন্তানদের জাকাত দেওয়া যাবেনা। স্ত্রী ও স্বামী একে অপরকে জাকাত দিতে পারবেনা।

 

মসজিদ মাদরাসা পুল রাস্তা হাসপাতাল বানানোর ক্ষেএে ও মৃতের দাফনের কাজে জাকাতের টাকা দেওয়া যাবেনা (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৮৮, ১৮৯ তাতারখানিয়া: ৩/২০৬, আদদুররুল মুখতার: ৩/২৯৪, ২৯৫) । ভাই বোন, ফুফু-ফুফা, খালা-খালু, মামা-মামিকে জাকাত দেওয়া যাবে।

 

যদি তারা জাকাত গ্রহনের উপযুগি হয়। এমনি ভাবে জাকাতের টাকা দিয়ে কাপর কিনে দিলেও জাকাত আদায় হয়ে যাবে। অন্তরে জাকাতের নিয়ত রেখে মুখে তা উল্লেখ না করে দিয়ে দিলেও জাকাত আদায় হয়ে যায় (হিদায়া: ১/২০৬, বাদায়ে: ২/৪৯) ।

 

জাকাতের অর্থ শুধু গরিবদের ব্যাক্তি মালিকানায় দিয়ে দিলেই জাকাত আদায় হয়। সুতরাং মসজিদ হাসপাতাল, রাস্তা ঘাট, কালভার্ট নির্মানের ক্ষেএে জাকাতের অর্থ খরচ করা যাবেনা।

 

কারন এ সব ক্ষেএে জাকাতের অর্থ ব্যায় ব্যাক্তি বিশেষকে মালিক বানিয়ে দেওয়া হয়না (তাতারখানিয়া: ৩/১৯৮. ২০৮; দুররুল মুখতার: ৩/১৭১-১৭৩) জাকাত ইসলামি সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অনন্য প্রতিষ্ঠান। জাকাত একদিকে দরিদ্র অভাবী ও অক্ষম জনগোষ্ঠির সামাজিক নিরাপওার গ্যারান্টি অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

 

(এই লেখাটি গত ১৬ই জুন দৈনিক কালের কন্ঠে মাওলানা আরিফুর রহমানের “ আধুনিক জীবনধারায় জাকাতের ব্যবহার“ শীর্ষক লেখা হইতে সংকলিত ও প্রকাশিত) ।

ব্রেকিং নিউজঃ