| |

আমার দেখা গ্রামের ঈদ উৎসবের অতীত ও বর্তমান

আপডেটঃ 3:20 pm | July 04, 2017

Ad

প্রদীপ ভৌমিক: এ বারের ঈদ উৎসব গ্রাম কিংবা শহরে ভিন্ন মাএা যোগ করেছে। অতীত থেকে বর্তমান সময়ে ঈদের উৎসব সম্বন্ধে স্মৃতিচারন করতে চাই কিন্তু এবার ঈদ উৎসব উপলক্ষে গ্রামে গিয়ে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম আমার দেখা চিরদিনের সেই ঈদ উৎসবে কিছুটা ভিন্নতা এসেছে।

 

আমার জন্ম গ্রামে। প্রতি বৎসরের মত এবারও ঈদে নাড়ীর টানে গিয়েছিলাম গ্রামে স্বজনদের সাথে মিলনমেলায় যোগ দিতে। আমার শৈশব, কৌশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কেটেছে গ্রামে তাই গ্রামের ঈদ উৎসব আমার স্মৃতিতে উজ্জল।

 

ঈদ, পূজা ও নববর্ষ ছিল আমাদের গ্রামীন জীবনের প্রদান উৎসব। তাই ঈদ উৎসবের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক স্মৃতি। ঈদ ছিল মিলনমেলা। এই মিলন মেলায় সামিল হতো অবাল বৃদ্ধ বনিতা, নারী পুরুষ সবাই।

 

ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে আমরা সবাই এক হয়ে যেতাম ঈদ উৎসবে। সবার আনন্দ সমানভাবে ভাগাভাগি করে নিতাম আমরা। গ্রামীন সমাজে ছেলে-মেয়ে ও সন্তানরা যে যেখানেই থাকুকনা কেন ঈদ উপলক্ষে সবাই ফিরে আসতো নিজ গ্রামে। বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েরা তাদের ছেলে মেয়ে নিয়ে চলে আসত বাপের বাড়ী।

 

আত্বীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবরা সারাদিন ঈদের কয়েকদিন পূর্ব থেকে পর পর্যন্ত মেতে থাকত খেলা-ধুলা আড্ডা ও অপরাপর আনন্দ উৎসবে। তাই আমরা অপেক্ষা করতাম অধীর আগ্রহে ঈদের দিনটির জন্য। ঈদের আগের দিনের সন্ধ্যা বেলাটা ছিল সবচেয়ে আনন্দের।

 

আমরা আমাদের গ্রামের মুসলিম বন্ধুদের সাথে নিল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম কখন দেখা যাবে ঈদের চাদঁ । সাদা মেঘের ফাক কিংবা বাশঝাড়ের উপর দিয়ে যখন এক ফালি চাদঁ দেখা যেত আনন্দ উল্লাসে ফেটে পরত সবাই। চাদঁ দেখা গেছে কাল ঈদ হবে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরত।

 

মুসলমান বন্ধরা আমাদেরকেও জড়িয়ে ধরে বলত কাল ঈদ আমাদের বাড়ী আসিস সেমাই খেয়ে যাস। সেই সময় আমরা চাদঁ দেখা কমিটির নাম শুনিনি রেডিও টেলিভিশন ছিলনা নিজের চোখে প্রত্যক্ষভাবে চাদঁ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হত কবে হবে ঈদ।

 

আজকের এই বয়সে ঈদের সেই আনন্দময় দিনগুলি আমার কাছে স্বপ্নময় স্মৃতি বলে মনে হয়। আমাদের গ্রামের সেই সময়ের ঈদের বৈশিষ্ট ছিল আলাদা। ঈদ সামনে রেখে যার যার সামর্থ অনুযায়ী গ্রামের চাচি, খালা, নানি, মা ও বোনেরা চালের গুড়ো দিয়ে সেমাই তৈরি করত নিজ হাতে।

 

সেই সেমাই গুড় দিয়ে রেধে ঈদের দিন সকালে নামাজ পরতে যাওয়ার পূর্বে আত্বীয় স্বজন পাড়াপড়শী ও বন্ধুবান্ধবদের খেতে দিত। তখন আজকের মত উন্নতমানের প্যাকেটজাত সেমাই এর প্রচলন ছিলনা।

 

কিন্তু তাদের হাতের তৈরি সেই সেমাই এ ছিল স্নেহ, মায়া, মমত্ববোধে ভরা যার স্বাদ আজ ও ভুলতে পারিনা। তখনকার দিনে গ্রামবাসী খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে ঈদগাহে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হত। পড়ত নতুন জামা। তাদের সাথে সাথে আমরাও তৈরি হতাম।

 

ঈদের নামাজ পরতে যাওয়ার পূর্বে তারা সেমাই খেত। সাথে সাথে আমরাও সেমাই খেতাম। তখন গ্রামে আর একটি জিনিস তৈরি হত বাড়ীতে বাড়ীতে। তাহলো চিকন চাল দিয়ে নাড়িকেল সহযোগে গুড় দিয়ে মিষ্টান্ন। যাকে আমরা গ্রামীন ভাষায় বলতাম “মিডুরি”।

 

আজকের গ্রামীন জীবনে এগুলি আর নেই। ঈদের সময় গ্রামে আর একটি বৈশিষ্ট ছিল আত্বীয় স্বজনের বাড়ী বাড়ী বেড়ানো। তাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়। ঈদ উপলক্ষে অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। তার মধ্যে বিয়েশাদি, সন্তানের আকিকা কিংবা নাটক অথবা আনন্দ অনুষ্ঠানের।

 

এর কারন হলো এ সময় সবাইকে একসাথে পাওয়া যেত। আত্বীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবরা সারাদিন মেতে থাকত গল্প ও আড্ডায়। গ্রামের সেই বৈশিষ্টটি এবার মনে হলো কিছুটা পাল্টে গেছে। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড।

 

গ্রামের ছোট বড় বাজার চায়ের দোকান কিংবা ঈদগাহ মাঠের চতুর্দিকে ছেয়ে আছে পোষ্টার ও ব্যানারে। সেখানে জানানো হচ্ছে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। প্রার্থনা করা হচ্ছে জনসমর্থন জনগনের খেদমত করার সুযোগ ও এলাকার উন্নয়নের জন্য।

 

কোন কোন পোস্টার ও ব্যানারে নেতা-নেএী দের ছবি সংযোজন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন গ্রামে না গেলেও এবার রাজনৈতিক নেতাকর্মিরা ঈদ করছেন গ্রামে। দলের নেতাকর্মিরা আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহনের প্রত্যাশা নিয়ে নিজেদেরকে পরিচিত করছেন।

 

গরীবদের মাঝে বিতরন করছেন পাঞ্জাবী, পায়জামা, জাকাতের কাপড়, সেমাই, চিনি ও নগদ টাকা। পাড়া মহল্লার বিভিন্ন ক্লাবে দিচ্ছে অনুদান। যতটানা নাড়ীর টানে তার চাইতে বেশি নির্বাচনে অংশগ্রহন করে জনসমর্থন আদায়ের কৌশল হিসেবে। প্রার্থী হিসেবে জানান দেওয়া।

 

আমাদের গ্রামের চিরপরিচিত দৃশ্যের  বাইরে এটি একটি ভিন্নরূপ। গ্রামের এখনো ধনী কিংবা ধার্মিক ব্যাক্তিদের সত্যিকারের মানুসিকতা আছে গরীব দুঃখীদের সাহায্য করার। তবে এবার লক্ষ্য করলাম নিজেকে জাহির করার পরিচিত করার ও সামাজিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার লোকের অভাব নেই।

 

অতীতে গ্রামীন সাংস্কৃতি অংশ হিসেবে ঈদ উপলক্ষে যে ঈদ মেলা বসত তা হারিয়ে গেছে। হারিয়েগেছে আরও অনেক কিছু যা আমাদের কাছে এখন শুধু স্মৃতি। যেহেতু আমার জন্ম গ্রামে। শিশু, কৌশোর ও যৌবনের অনেকটা অংশ কেটেছে গ্রামীন জীবনে।

 

অতীতে গ্রামে মুসলমান, হিন্দু, ধনী গরীব, আমরা সবাই মেতে থাকতাম ঈদ আনন্দ উৎসবে ও অন্যান্য উৎসবের বিশেষ দিনগুলিতে। আমাদের গ্রামীন সাংস্কৃতির মূল মন্ত্র ছিল “ধর্ম যার যার উৎসব সবার”।

এই ৬৫ বছর বয়সে আমি প্রত্যাশা করি আমরা ফিরে যেতে চাই অতীতের সেই আনন্দময় ঈদ উৎসবে।

ব্রেকিং নিউজঃ