| |

বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার নিপুণ কারিগর বাবুই পাখি

আপডেটঃ 8:07 pm | July 08, 2017

Ad

মো. আবু রায়হান, শেরপুর ঝিনাইগাতী প্রতিনিধি:  “বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহাসূখে অস্ট্রালিকার পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে”।

 

কবি রজনীকান্ত সেনের কালজয়ী ছড়াটির নায়ক আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরির কারিগর বাবুই পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে আগের মত বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা আজ আর তেমন চোঁখে পরে না।

 

ঝিনাইগাতীর সীমান্তঘেষা পাহাড়ী এলাকার আনাচে-কানাচে তালগাছের পাতায় পাতায় দেখা যেত বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান গ্রাম বাংলার সেই চিরচেনা  ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরির কারিগর বাবুই পাখি ও তার বাসা।

 

খড়ের ফানি, ধানের পাতা, তালের কচিপাতা, ঝাউ ও কাঁশবনের লতাপাতা দিয়ে উচ্চু তাল গাছে চমৎকার আকৃতির বাসা তৈরি করত বাবুই পাখিরা। বাবুই পাখির বাসা যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি মজবুত।

 

প্রবল ঝড়ে বাতাসে টিকে থাকে তাদের বাসা। বাবুই পাখির শক্ত বুননের এ বাসা টেনেও ছেড়া কঠিন। বাবুই পাখি একাধারে শিল্পী, স্থপতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। এরা এক বাসা থেকে আর এক বাসায় যায় পছন্দের সঙ্গি খোঁজতে।

 

সঙ্গি পছন্দ হলে স্ত্রী বাবুই পাখিকে সাথী বানানোর জন্য কত কিছুই না করে। পরুষ বাবুই নিজের প্রতি আকর্ষন করার জন্য খাল-বিল ও ডোবায় গোসল সেরে ফুর্তিতে নেচে নেচে বেড়ায় গাছের ডালে ডালে।

 

এর পর উচু তাল গাছ, নারিকেল গাছ বা সুপারি গাছের ডালে বাসা তৈরির কাজ শুরু করে। বাসা তৈরির অর্ধেক কাজ হলে কাংখিত স্ত্রী বাবুইকে ডেকে দেখায়। বাসা পছন্দ হলেই কেবল পুরো কাজ শেষ করে ।

 

বাসা পছন্দ না হলে অর্ধেক কাজ করেই নতুন করে আরেকটি বাসা তৈরির কাজ শুরু করে। অর্ধেক বাসা তৈরি করতে সময় লাগে ৫/৬দিন। স্ত্রী বাবুই পাখির বাসা পছন্দ হলে বাকিটা শেষ করতে সময় লাগে ৪দিন।

 

কেননা তখন পুরুষ বাবুই মহা আনন্দে বিরামহীন ভাবে কাজ করে। স্ত্রী বাবুই পাখির প্রেরনা পেয়ে পুরুষ বাবুই খুবই শিল্পসম্মত নিপুণ ভাবে বাসা তৈরি করে। স্ত্রী বাবুই ডিম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরুষ বাবুই খোজতে থাকে আরেক সঙ্গিকে।

 

পুরুষ বাবুই এক মৌসুমে ৬টি পর্যন্ত বাসা তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ  এরা ঘর সংসার করতে পারে ৬ সঙ্গির সঙ্গে। তাতে স্ত্রী বাবুয়ের না নেই। প্রজনন প্রক্রিয়ায় স্ত্রী বাবুই ডিমে তা দেওয়ার ২ সপ্তাহের মধ্যেই বাচ্চা ফুটে।

 

৩ সপ্তাহ পর বাবুই বাচ্চা বাসা ছেড়ে উড়ে যায়। বাবুই পাখির প্রজনন সময় হলো ধান ঘরে উঠার মৌসুম। স্ত্রী বাবুই দুধধান সংগ্রহ করে এনে বাচ্চাদের খাওয়ায়। বাবুই পাখি তাল গাছে বাসা বাধে বেশী।

 

রাতের আধারে পাখি শিকারীদের জালে বাবুই পাখি আটক হয়ে বিক্রি হচ্ছে শহরের পাখি শিকারিদের দোকানে । ফলে একদিকে যেমন হারিয়ে যেতে বসেছে বাবুই পাখি, অন্যদিকে বিলুপ্ত হচ্ছে বাবুই পাখির দৃষ্টি নন্দন বাসা।
বাবুই পাখির পাশাপাশি আরও নানা প্রজাতির রঙ বেরঙ্গের পাখি হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলা ধেকে। দেখা মিলে না যে সমস্ত পাখি ময়না, শালিক, টিয়া, তোতা, ঘুঘু, ঢুপি, হারগিলা, মদনচোষ, চিল, চাঁতক, হুতুম পেচাঁ, পান কাকুরী, বুলবুলি, লাল শালিক, গবড়া শালিক, দোয়েল পাখি, মাছরাঙ্গা, টিটটোহরী, রাইচচোড়া, চড়া পাখিসহ আরও নানা প্রজাতির পাখি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

 

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এ সমস্ত পাখির অবদান রয়েছে অপরীসিম। তাই এসমস্ত পাখি রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।  উল্লেখ্য, অনূকুল পরিবেশ না পাওয়ার কারণে এসমস্ত প্রজাতির পাখিগুলি বিলুপ্তি হতে চলেছে।

ব্রেকিং নিউজঃ