| |

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধে তাজউদ্দিন আহমেদের ভুমিকা

আপডেটঃ 12:46 am | July 24, 2017

Ad

প্রদীপ ভৌমিক: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের অগ্রসৈনিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদের ৯২তম জন্মবার্ষিকী ছিল গতকাল।

 

১৯২৫ সালের ২৩ই জুলাই গাজীপুর জেলার অন্তর্গত কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা ছিলেন মৌলবী মো: ইয়াছিন খান এবং মাতা মেহেরুন্নেছা খান। উনার স্ত্রী সৈয়দা জহোরা তাজউদ্দিন।

 

যিনি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ৭৫ পরবর্তী দুঃসময়ের একজন কান্ডারি আওয়ামীলীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য। তাজউদ্দিন আহমেদ ৪ ভাই ৬ বোনের মধ্যে ৪র্থ।

 

উনার পড়াশোনা শুরু হয় আরবী শিক্ষার মাধ্যমে পরে ভুলেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার পড়াশোনা শুরু হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেনীতে তিনি প্রথম স্থান অধীকার করেন। কাপাসিয়া মাইনর ইংলিশ স্কুলে ৪র্থ শ্রেনীতে ভর্তি হন।

 

এরপর কালিগঞ্জ সেন্ট নিকোলাস ইনস্টিটিউশন, ঢাকার মুসলিম বয়েজ হাইস্কুল ও সেন্ট গ্রেগগ্রিজ হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। তিনি ১৯৪৪ সালে মেট্রিক,ও পরবর্তীতে ইন্টারমিডিয়েট পরিক্ষায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবিভক্ত বাংলার সম্মিলিত মেধাতালিকায় যথাক্রমে দ্বাদশ ও ৪র্থ স্থান লাভ করেন।

 

১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ (সম্মান) ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে কারাগারে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে থাকা অবস্থায় এল.এল.বি পরিক্ষা দেন এবং পাশ করেন।

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজউদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৪৩ সাল থেকে। তখন তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হন। ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন।

 

১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারী গঠিত পূর্বপাকিস্তান ছাএলীগের (বর্তমান বাংলাদেশ ছাএলীগ) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ। ১৯৪৮ এর ১১ এবং ১৩ই মার্চ সর্বদলীয় ছাএ সংগ্রাম পরিষদের গুরুত্বপুর্ন সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্বপালন করেন।

 

২৪শে মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নার সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের বৈঠকে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিনিধি। শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ ১৯৪৯ সালের ২৩ই জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে তিনি বিশেষ ভুমিকা পালন করেছিলেন।

 

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৫৩ সাল থেকে প্রথমে ঢাকা জেলা আওয়ামী মুসলিমলীগ ও পরে ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলীম লীগের সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

 

১৯৫৪ এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হিসেবে মুসলিমলীগের সাধারন সম্পাদকে পরাজিত করে পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে প্রাদেশিক আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১৯৬৬ সালে আওয়মীলীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন।

 

১৯৬৬ সালে ৬ই ফেব্রুয়ারী লাহোরে সর্বদলীয় নেতৃসম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবী উত্থাপন করেন। সেই সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তিনিও যোগদান করেন।

 

সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে মরহুম তাজউদ্দিন ছিলেন অন্যতম সদস্য। এ কি বছর ৮মে তিনি দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতার হন। ১৯৬৮ সালে জেলে থাকা অবস্থাতেই আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক পদে পুননির্বাচিত হন। ৬৯এর গনঅভ্যুত্থানের জনতার আন্দোলনের ফলে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান।

 

১৯৭০ সালে তৃতীয় বারের মত আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। এই বছরের সাধারন নির্বাচনের জন্য গঠিত পার্লামেন্টারি বোর্ডের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন।৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বেরের নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

 

১১ই এপ্রিল ১৯৭১এ ভাষনে আওয়ামীলীগ বিপুল ভোটে জয় লাভের পরও ইয়াহিয়া খান আওয়ামীলীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগীত করে দেয়।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ১৯৭১এর ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী শুরু করে গনহত্যা। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।

 

তার পূর্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ইপিআর এর ওয়ার্লেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করে যাহা একটি তার বার্তার মাধ্যমে সারাদেশব্যাপী প্রচার করা হয়।

 

তাজউদ্দিন আহমেদ আত্মগোপন করে যুদ্ধকে সংগঠিত করার জন্য ৩০শে মার্চ সন্ধ্যায় ফরিদপুর থেকে গোপনে কুষ্টিয়ার পথে পশ্চিম বাংলার সীমান্তে পৌছান।

 

ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১শে মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। সে সময় মেহেরপুরের মহকুমা শাসক তৌফিক ই এলাহী চৌধুরী তাকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেন।

 

সীমান্ত অতিক্রম করার পর ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদার তাদেরকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন।

 

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক কে.এফ রুস্তামজী তাজউদ্দিন আহমেদ সাহেবের সাথে দেখা করে পূর্ববাংলার সার্বিক পরিস্থিতি ও বাঙ্গালীর স্বাধীনতা লাভের কর্মপদ্ধতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন এবং ব্যারিস্টার আমির উল ইসলামকে নিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাগান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ ও বিস্তারিত আলোচনা করার জন্য আমন্ত্রন জানানো হয়।

 

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাগান্ধীর সাথে বৈঠকের আগে ভারত সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে তাজউদ্দিন আহমেদের কয়েক দফা বৈঠক হয়। এবং তাদের বাঙ্গালীর মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনার জন্য যে সমস্ত সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন তা বুজিয়ে বলেন।

 

তাজউদ্দিন আহমেদ সরকার গঠন ও মুক্তিযোদ্ধের পক্ষে কি করা প্রয়োজন তিনি তা উপলব্ধি করেন। ইন্দিরাগান্ধীর সাথে বৈঠকের সুচনাতে তাজউদ্দিন আহমেদ জানান পাকিস্তানি আক্রমন শুরুর সাথে সাথে ২৫/২৬ মার্চে বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষনা করে সরকার গঠন করা হয়েছে।

 

শেখ মুজিব সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং মুজিব ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী সকল প্রবীন সহকর্মীই মন্ত্রী সভার সদস্য।

 

মুজিবের গ্রেফতার ছাড়া তখন পর্যন্ত দলের অন্যান্য নেতাকর্মীর খবর অজানা থাকায় উপস্থিত দলীয় প্রতিনিধি দের সাথে পরামর্শক্রমে দিল্লীর উক্ত সভায় তিনি নিজকে প্রধানমন্ত্রীরুপে তুলে ধরেন।

 

ঐ বৈঠকে ইন্দিরাগান্ধীর কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এভাবেই অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ধারনার সূচনা হয়। ৪ঠা এপ্রিল দিল্লীতে ইন্দিরাগান্ধীর সাথে তাজউদ্দিনের আনুষ্ঠানিক আলোচান হয়।

 

১০ই এপ্রিল মেহেরপুরের আ¤্রকাননে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সনদ ঘোষনা করা হয়। ১১ই এপ্রিল তাজউদ্দিন বেতার ভাষন দেন। ১৭্ই এপ্রিল মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিক ভাবে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহন করে।

 

তাজউদ্দিন আহমেদ হন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। শেখ মুজিবর রহমানের অনুপস্থিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রতি হিসেবে শপথ নেন।

 

আরও যারা শপথ নিয়েছিরেন তার হলেন, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী, কামরুজ্জামান,ইউসুফ আলী, বঙ্গবন্ধুর ৭৫এর হত্যাকান্ডের নায়ক কুখ্যাত খন্দকার মোস্তাক প্রমুখ।

 

প্রধানসেনাপতি নির্বাচিত হন কর্ণেল উসমানী। ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২২ ডিসেম্বর তাজউদ্দিন আহমেদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সহ নেতৃবৃন্দ ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন।

 

পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসলে তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাড়ান। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন।

 

১৯৭৩ এ ঢাকা ২২ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও জাতীয় সংসদে প্রথম জাতীয় বাজেট পেশ করেন ও পাঁচশালা পরিকল্পনা প্রনয়ন করেন।

 

১৯৭৪ সালে আওয়ামীলীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলের সমাপনি অধিবেশনের বক্তৃতায় তিনি দল, সরকার ও নেতাকর্মীদের মাঝে দূরত্ব দূর করে সংগঠন এবং সরকারের মাঝে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান।

 

পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর সাথে ষড়যন্ত্রকারিরা তাজউদ্দিন আহমেদের সাথে বঙ্গবন্ধুর দূরত্ব তৈরি করতে সফল হয় এবং ১৯৭৪ সালের ২৬শে অক্টোবর তাজউদ্দিন আহমেদ মন্ত্রী সভা থেকে পদত্যাগ করেন।

 

১৯৭৫এ ১৫ আগষ্ট প্রথম গৃহবন্দী ও পরে ২৩শে আগষ্ট উনাকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরন করা হয়। ২৩শে আগষ্ট উনাদের সাথে সামরিক আইনের অধীনে আরও ২০জন কে গ্রেফতার করা হয় এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়।

 

৭৫এর ১৩রা নভেম্বর কারাগারের অভ্যান্তরে তৎকালিন সামরিক জান্তার নির্দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীর সেনানি সৈয়দ নজরুর ইসলাম তাজউদ্দিন আহমেদ এবং এইচ.এম কামরুজ্জামানকে নিশৃ:স ভাবে হত্যা করা হয়।

 

যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কুখ্যাত জেল হত্যা দিবস হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযোদ্ধের এমন একজন অগ্রসৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদের জন্মবার্ষিকী উজ্জাপিত হয়েছে বাংলাদেশে নিরবে নিভৃতে। যা আমাদের কাছে কাম্য নয়। আমরা তার জন্মবার্ষিকীতে তাকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম।

ব্রেকিং নিউজঃ