| |

আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ ঃ ইতিহাসের পরম্পরা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম প্রকাশক ও প্রধান উপদেষ্টা, জনতার আদালত.কম

আপডেটঃ 11:28 pm | October 04, 2017

Ad

পাকিস্তানী শাসনামলে শোষণের বিরুদ্ধে বাঙ্গালী জাতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলনে জয় লাভ করেও ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে হাজার-হাজার বাঙ্গালী পাকিস্তানী বাহিনীর গুলিবর্ষণে মৃত্যুবরণ করে। বঙ্গবন্ধু ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

 

পাকিস্তানী বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান কারাগারে আটক করে রাখে। বঙ্গবন্ধুর পূর্ব-নির্দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রবেশ করে বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতাকে বানচাল করতে চেয়েছিলো। ৭ই মার্চের পরেও মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের হয়ে কর্মরত ছিলো, চট্রগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানী অস্ত্র বোঝাই করা “সোয়াদ জাহাজ” থেকে অস্ত্র খালাস করেছিলো।

 

যেহেতু বাঙ্গালী ছিলেন জিয়াউর রহমান, সেহেতু চট্রগ্রামের মুক্তিকামী জনতা ও বাঙ্গালী সামরিক অফিসারেরা চেয়েছিলেন যেনো ২৭ই মার্চে কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্রে জিয়াউর রহমানকে দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করাতে। জিয়াউর রহমান অনেকটা বাধ্য হয়েই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তা পাঠ করেন।

 

জিয়াউর রহমান কোনোরূপ যুদ্ধ না করে সোজা চলে যান ভারতে, আরাম-আয়েশের জীবনে এবং খন্দকার মোস্তাকের সাথে শলা-পরামর্শ করতে। এদিকে বাঙ্গালী জাতি বঙ্গবন্ধুর ঘোষণায় উজ্জীবিত হয়ে পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখন খন্দকার মোস্তাকের নেতৃত্বে চক্রান্তকারী দল পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন করার জন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রস্তাব দিয়ে বসেন।

 

তারা সেদিন বাংলার স্বাধিকারের স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মোস্তাকের সেই কূট-প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। মোস্তাকের প্রস্তাব প্রত্যাখিত হওয়ার পর পাক জেনারেল টিক্কা খান, নিয়াজি ও বাংলার কু-সন্তান চক্রান্তের শিরোমণি গোলাম আজম গং বাঙ্গালী জাতিকে নিধন করার উদ্দেশ্যে এদেশীয় দালালদের নিয়ে গঠন করলেন রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী। এইসব বেইমানদের সহযোগিতায় পাকবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা আরম্ভ করলো।

 

রাজাকার বাহিনী গঠন করার পূর্বে পাকবাহিনী ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করার জন্য চেষ্টা করছিলো। আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ তথা মুক্তিকামী শতশত ছাত্র-জনতা জেনারেল শফিউল্লাহর নেতৃত্বে ময়মনসিংহ জেলার প্রবেশ পথে রেলওয়ের কাওরাইদ নামক স্থানে গয়েশপুর ব্রিজ পাহারা দিতে লাগলো।

 

আমারও সৌভাগ্য হয়েছিলো সেখানে মুক্তিকামী জনতার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন করার। আমরা সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ভুলে, খেয়ে না খেয়ে পাকবাহিনী ঠেকাতে সর্বক্ষণ পাহারা দিয়েছি। পাকবাহিনী তাদের বিমানের সাহায্যে আমাদের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে ব্যারিকেড ভেঙ্গে দেয়।

 

আমরা জেনারেল শফিউল্লাহর নির্দেশে ও আমার প্রিয় বন্ধু- গফরগাঁও এর এম.পি আবুল হাসেমের অনুরোধে মুক্তিকামী জনতাকে নিয়ে আপাতত প্রাণ রক্ষার্থে ঐ স্থান থেকে সরে যাই।

 

পরদিন ২১শে এপ্রিল ট্রেন যোগে ময়মনসিংহ শহরের প্রবেশ পথে পাকবাহিনী সকাল ৭টার সময় কালীর বাজার (ফাতেমা নগর) রেলওয়ে স্টেশন পার হবার সময় কে বা কারা পাকবাহিনীর গাড়িতে একটা গুলি করে, সেই অজুহাতে পাকবাহিনী হিন্দু অধ্যুষিত কালীর বাজারে গাড়ি থেকে নেমে শতাধিক নিরীহ লোককে হত্যা করে ও লুটতরাজ চালায়।

 

হত্যাযজ্ঞ ও লুটতরাজ চালানোর পর পাকবাহিনী ট্রেন যোগে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাবু গাড়ে। তাদের অভ্যর্থনা জানায় মুসলিমলীগ নেতা আঃ হান্নান, এডঃ সুরুজ উকিল, ভোলামিয়া, নেজামে ইসলাম নেতা মাওলানা ফয়েজুর রহমান (বড় মসজিদের ইমাম) এডভোকেট আতিকুর রহমান মোহন,

 

এডভকেট সারয়ার আলবদর দিদার,আলবদর মকসেদ,মুসলিমলীগ নেতা আঃ হান্নানের সহোদর ভাই, মোঃ আব্দুল কুদ্দুস,রাজাকার আতাউর রহমান হিরণ প্রমুখ। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার পর আবার ট্রেন যোগে সেনবাড়ি (বর্তমান আহম্মদ-বাড়ি) রেলওয়ে স্টেশনে চলে আসে।

 

বেলা ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে পাকবাহিনী প্রথমেই যায় ত্রিশাল থানার কানিহারী গ্রামে, আমার বাড়িতে। পুরো এলাকা হয় জনমানবশূন্য। পাকবাহিনী তাদের দোসরদের সহযোগিতায় আমার বাড়িটি পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিলো। আমার বাড়ি পুড়তে এসে আশেপাশের অন্যান্য বাড়িঘরেও আগুন দেয়।

 

মানুষের উপর অত্যাচার করে, নারী নির্যাতন করে মসজিদের পুকুরে গোসল করে। এই সর্বপ্রথম ময়মনসিংহ জনপদে এসে পাকবাহিনী পরিকল্পিতভাবে আমার পরিবারকে ধ্বংস করার জন্য মুসলিমলীগারদের সহযোগিতায় আমাদের বাড়িতে আগুন দিয়ে আমাদেরকে সর্বস্বান্ত করে। আমি আর কোনোরূপ দেরি না করে পার্শ্ববর্তী মেজর আফসার সাহেবের মুক্তিবাহিনী দলের ক্যাম্পে যোগদান করে ট্রেনিংপ্রাপ্ত হয়ে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করি।

 

আমার বাবা, মা, ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজন মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নেয়।তাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য অনেক লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা সহ্য করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিকে মেজর আফসার সাহেবের সাথে অস্ত্র আনতে আগরতলায় গিয়েছিলাম। মেজর আফসার সাহেব আমাকে খুব স্নেহ করতেন, কারণ ছাত্রলীগের জেলা পর্যায়ের নেতা ছিলাম, ভালো বক্তৃতা দিতে জানতাম।

 

একারণেই তিনি আমাকে আগরতলায় নিয়ে গিয়েছিলেন। যাই হোক, নয়মাস যুদ্ধ করার পর দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হলো। ময়মনসিংহ জেলা ১০ই ডিসেম্বর মুক্ত হলো। আমি ১২ই ডিসেম্বর মেজর আফসার সাহেবের কাছে আমার অস্ত্র জমা দিয়ে ফের কলেজে গিয়ে পড়াশুনা শুরু করলাম। আমি বা আমার পরিবার কোনোদিন কোনো সরকারী সাহায্য বা বেতন ভাতা নেয়নি।

 

কারণ, এসব বিনিময় পাওয়ার জন্য আমি মুক্তিযুদ্ধ করিনি। ১৯৬৪ সন থেকে ছাত্রলীগ করেছি। ছাত্রলীগ করতে গিয়ে অনেক নেতার সান্নিধ্য পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাত পেয়েছি বহুবার। এটাই আমার সৌভাগ্য। বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথেও বহুবার দেখা করেছি।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের পারিবারিকভাবেই চেনেন জানেন। বঙ্গবন্ধু আমাকে আমার কাজের মূল্যায়ন স্বরূপ পুরষ্কার দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু আমি মহামানব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পা ছুঁয়ে শুধু আশীর্বাদ নিয়েছিলাম সেদিন। সে যাই হোক, এ ব্যাপারে অন্য কোনোদিন বিস্তারিত লিখবো। গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জাতিকে বিশেষ করে ময়মনসিংহবাসীকে জানাতে হবে।

 

পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত কর্মসূচী বাস্তবায়নে পাকিস্তানী নিরাপত্তা আইনে আমার বিরুদ্ধে ৭টি মামলা হয়েছিলো। অনেক ঘটনা, অনেক কষ্ট, অনেক নির্যাতন, অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে এখনো আপনাদের মাঝে বেঁচে আছি। এখনো হাল ছাড়িনি।

 

আমার বাবার বয়স ১০৩ এর মতো এবং আমার বয়স প্রায় ৭০ বছর। এ জীবনে অনেককিছু দেখেছি। বিভিন্ন ঘটনার ইতিহাস অবশ্যই আপনাদের জানাবো। মুক্তিযুদ্ধের পর আমি যখন অস্ত্র জমা দিয়ে পুনরায় কলেজে পড়াশুনার জন্য চলে এলাম, দেখলাম, আমাদের প্রতিপক্ষ ছাত্র ইউনিয়ন, বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন ইত্যাদি কিছু সংগঠন কলেজে রাজনীতি করছে। আমরা তখন ছাত্রলীগের পতাকা হাতে বঙ্গবন্ধু প্রণীত কর্মসূচী বাস্তবায়নে ব্যস্ত।

 

তখন সারা ভারতবর্ষে চারু মজুমদারের “নকশালী” আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। ধীরে ধীরে তার ঢেউ আমাদের দেশের রাজনীতিতেও প্রবেশ করা আরম্ভ করে। এটি নিয়ে প্রায়ই প্রতিপক্ষ দলের সাথে আমাদের বাকবিতণ্ডা হতো। কিছুদিন পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে এসে হঠাৎ দেখলাম আ.স.ম আব্দুর রব ও শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র” নামের এক অদ্ভুত আদর্শকে সামনে রেখে ছাত্রলীগকে ভাগ করে দেওয়া হলো।

 

এর কিছুদিন পর আবার দেখলাম, এই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে “জাসদ” নামের আরেকটি রাজনৈতিক দল গঠিত হলো। আবার, ক’দিন পর দেখলাম, বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে এই জাসদ গঠন করলো এক সশস্ত্র গণবাহিনী। সবারই আদর্শ ছিলো সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম। হয় তারা ছিলো চীনপন্থী কিংবা রাশিয়াপন্থী।

 

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগই একমাত্র গণতন্ত্রের পতাকা ধরে রাখলো। পূর্ব পাকিস্তান আমলেই বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠন ছিলো। যেমনঃ তোহা, মতিন, টিপু, আব্দুল হক, প্রফেসর আইয়ুব। তারা “নকশালী” কায়দায় শ্রেণীশত্রু খতমের নামে নির্বিচারে মানুষহত্যার রাজনীতি করতো। সংগঠনগুলির প্রধানরা প্রায় প্রত্যেকেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

 

কিন্তু তারা ছিলো পাকিস্তানপন্থী, মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রবেশকারী। চরমপন্থি সর্বহারা দল “সিরাজ শিকদার” এর প্রধানও একসময় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো। এরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের ফসলকে ধ্বংস করে দেবার জন্য। তারা তা বাস্তবে করেও দেখিয়েছে। সিরাজ শিকদার সাহেব তার নিজের নামেই সর্বহারা পার্টি গঠন করলেন।

এ পার্টিতে যোগদানে কিছু নির্দেশনাও প্রণয়ন করে দিয়েছিলেন তিনি। তার পার্টিতে যোগদান করতে পারতো, ভাসানীপন্থী ন্যাপের বিপ্লবী কর্মীরা, স্বাধীনতা বিরোধীঃ রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সদস্যরা। অর্থাৎ, স্বাধীনতা যুদ্ধের পরাজিত শক্তি এবং তার সহযোগীরা। আরও যোগ দিতে পারতো, আওয়ামীলীগের মন্ত্রী এম.পিদের দ্বারা বিতাড়িত উচ্চাভিলাষী নেতাকর্মীরা। সিরাজ শিকদার কর্মসূচী দিলো পুলিশের থানা ও ফাঁড়ি লুট করে অস্ত্র সংগ্রহ করতে, আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর মনোবল ভেঙ্গে দিতে। এছাড়াও খাদ্যের গুদাম লুট করা, ব্যাংক লুট করা, রেললাইন উপড়ে ফেলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিঃ রাজাকার, আলবদর, আলশামসের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র জমা নেয়া ইত্যাদি ছিলো তাদের কর্মসূচীতে। তাছাড়া শ্রেণীশত্রু বিনাশ করা, লুটতরাজ করে ফান্ড গঠন করা প্রভৃতি ছিলো তাদের লক্ষ্য। সিরাজ শিকদার পার্টি ময়মনসিংহ জেলায় প্রথম গঠন করা হয়েছিলো ত্রিশাল থানার কানিহারী ইউনিয়নে। কানিহারী ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। নদের ওপারে ঈশ্বরগঞ্জ থানা ও নান্দাইল থানা। তিন থানার মধ্যে বিদ্যমান বিশাল এক চর এলাকা। এই চর এলাকাই ছিলো সিরাজ শিকদার পার্টির অভয়ারণ্য। এখানে তারা ট্রেনিং নিতো। পাশেই আছে বাঘাদাড়িয়া গ্রাম। এ গ্রামে রয়েছে বেপারীবাড়ি। এই বেপারীবাড়ির দুই ছেলে লেখাপড়া করতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাদের নাম আসাদুজ্জামান (দুদু) ও জয়নাল আবেদীন বাদশা। পিতার নাম পাচু বেপারী। সিরাজ শিকদার প্রায়ই এখানে পার্টির কাজ দেখাশুনা করতে আসতো। সমগ্র ময়মনসিংহে এই বাদশা ও দুদু তাদের বাড়ি থেকে পার্টির সমস্ত কাজকর্ম তদারকি করতো। সারা জেলায় শতাধিক আওয়ামীলীগ নেতাকর্মী হত্যা করেছে তারা। থানা ও পুলিশফাঁড়ি লুট করে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছে। আজ পর্যন্ত সেসব অস্ত্র পুলিশ উদ্ধার করতে পারেনি। তারা ব্যাংক লুট করেছে, খাদ্যের গুদাম লুট করেছে। পুলিশ কাউকেই ধরতে পারেনি। আইনের আওতায় কোনোরূপ বিচারও হয়নি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ময়মনসিংহ সদর ৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রখ্যাত শ্রমিকনেতা এডভোকেট ইমান আলীকে সন্ধ্যার সময় স্ত্রী পুত্রের সামনে গুলি করে হত্যা করে সিরাজ শিকদার পার্টি। শুধু জিডি করা হয়েছিলো। কোনো আসামী ধরা হয়নি, বিচারও হয়নি। শহীদ এম.পি এডঃ ইমান আলীর নামে আজ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ কোনোরূপ শোকসভা বা প্রতিবাদ সভাও করতে পারেনি। সিরাজ শিকদার পার্টি প্রকাশ্যে ময়মনসিংহ শহর ও বিভিন্ন থানায় অস্ত্র নিয়ে মিছিল করেছে, হরতাল করেছে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক নেতাও এগিয়ে আসেনি। আমরা মাত্র ৪/৫ জন কর্মী শ্রদ্ধেয় মণি ভাইয়ের নির্দেশে পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আনি। আমার বাড়িঘর সিরাজ শিকদার পার্টির নির্দেশে আবার পুড়ানো হয়। আমার ছোটো ভাই ও চাচাকে নির্যাতন করে অর্ধমৃত অবস্থায় নদীতে ফেলে রাখে তারা। আমি আগেই উল্লেখ করেছি, বঙ্গবন্ধু আমাকে খুব স্নেহ করতেন। সৈয়দ নজরুল স্যারও আমাকে অত্যধিক স্নেহ করতেন। মণি ভাইয়ের কাছে বঙ্গবন্ধু আমার কথা, এলাকার পরিস্থিতির কথা, এলাকার মানুষের অবস্থার কথা শুনার পর আমাদের এলাকায় রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্প গঠন করার নির্দেশ দেন। একটা সময় এমন পরিস্থিতি ছিলো, থানা থেকে পুলিশ বাইরে বের হওয়ার সাহস পেত না। বাঙ্কার করে থাকতে হতো। সারা ময়মনসিংহ জেলার প্রত্যেক থানায়-থানায় রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্প গঠিত হবার পর, এ বাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে অপারেশন করে জেলার প্রতিটি থানার পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। ত্রিশাল থানার কানিহারী ইউনিয়নে সিরাজ শিকদার ও রাজাকাররা মিলে মুক্তিযোদ্ধা মজিদকে ১৯৭৪ সালের ২৭শে নভেম্বর হত্যা করে। আমার তদারকিতে উক্ত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে গত বছর আদালতে তার পিতার হত্যা মামলা দায়ের করলে, আদালত ত্রিশাল থানা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। তদন্তে নিয়োজিত তদন্ত ওসি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মোখলেছুর রহমান সাহসিকতার সহিত প্রায় দু’মাস তদন্ত করে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে আসামী সনাক্ত করে আদালতে চার্জশিট প্রদান করেন। বিজ্ঞ আদালত ১৭ জন আসামীর নামে ওয়ারেন্ট প্রদান করেন। এদের অনেকেই এখন জেলখানায় আছে। বাকিরা পলাতক রয়েছে। যার মামলা নং ১৬৭/১৬। সম্প্রতি আমি নিজে বাদী হয়ে সংসদ সদস্য ইমান আলী হত্যার বিচার চেয়ে আদালতে মামলা করলে, মাননীয় আদালত কোতয়ালী থানার ওসি ও ত্রিশাল থানার ওসিকে তদন্তপূর্বক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন । এই মামলায় এম.পি ইমান আলী ও আরেক আওয়ামীলীগ কর্মী অরুন মাষ্টার হত্যার বিচার চাওয়া হয়েছে। যার মামলা নং- ৮১৬/১৭, কোতয়ালী থানা। আরেকটি মামলাতেও আমি বাদী হয়ে তা আদালতে দাখিল করেছি। যার মামলা নং ৭০২(খ), ত্রিশাল থানা। এই মামলায় ৩টি হত্যাকাণ্ড, হত্যাচেষ্টা, অগ্নিকাণ্ড, লুটতরাজ, থানা ও পুলিশফাঁড়ি লুট, রেললাইন তুলে নেওয়া সহ মোট ৭টি অভিযোগ দায়ের করা হয়। যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের সন্তানদের সাক্ষী রেখে মামলাটি করা হয়েছে। এছাড়াও, আরও একটি মামলায় হেলাল নামের জনৈক ব্যক্তির পিতা ও ভাইকে সিরাজ শিকদার পার্টি হত্যা করেছে, তা উল্লেখ রয়েছে। মামলা নং ৭০২(ক), ত্রিশাল থানা। প্রতিটি মামলাতেই বিজ্ঞ আদালত কোতয়ালী ও ত্রিশাল থানার ওসিকে তদন্ত পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আদেশ দিয়েছেন। আসামীদের অনেকের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে, যার তদন্ত কাজ প্রায় সমাপ্ত। মামলা নং ১০৬০/২০১৫, ৯৩/২০১৬, ৯১৪/২০১৫। আজ আমার এই ক্ষুদ্র পরিসরের লেখার মাধ্যমে আপনাদের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাতে পেরে নিজেকে অনেক হালকা অনুভব করছি। ১৯৭৪ সালের হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসাত্মক কাজের যদি বিচার করা হতো, তবে হয়তো ১৫ই আগস্ট এভাবে আমাদের জীবনে আসতো না। ২০০১ সালে জামাত বিএনপি জোটের সারা দেশে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের বিচার করা গেলে, ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের সৃষ্টি হতো না। এখনো সময় আছে, সবাই সতর্ক হোন। দেশকে, দেশের মানুষকে, দেশের মহাসম্পদ, অস্তিত্বের ঠিকানা, দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ভালোবাসুন। নিজের জীবন মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দিন। শুধু কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করুন। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি খালেদা জিয়ার চক্রান্তের সৃষ্টি। সজাগ থাকুন। পরিশেষে বলতে চাই, আওয়ামী লীগে ও মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকান। কারণ, ঘরের শত্রু বিভীষণ। আমাদের গর্বের, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, দেশপ্রেমিক, দক্ষ ও সাহসী। তাদের তৎপরতার কারণেই জঙ্গিবাদ দমন হয়েছে। তাই উপরোক্ত বিষয়াদি অত্যন্ত সুচারুভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা ও ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে বিচারের সুব্যবস্থা করবেন, এটাই দেশের জনগণ আপনাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে।

ব্রেকিং নিউজঃ