| |

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ৩২ ধারায় যেন সাংবাদিকদের কর্মপরিধিকে সংকুচিত না করা হয়

আপডেটঃ ৭:০৩ অপরাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৮

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ কলাম লেখক সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমান। তথ্য প্রযুক্তি আইন ৫৭ ধারা বাতিলের জন্য প্রতিবাদ করতে গিয়ে লিখেছিলেন ৫৭টি রশি দিয়ে বাধাঁ তার দুই হাত যেন খুলে দেওয়া হয়। তুমুল প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে সরকার ৫৭ ধারা কে বদলে ৩২ ধারা মন্ত্রী সভায় অনুমোদান করেছে।

 

ডিজিটাল অপরাধের বদলে তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০১৮ বত্রিশ ধারায় গুপ্তচর বৃত্তির সাজার বিধান রাখা হয়েছে। কোন সরকারী আধা সরকারী বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ঢুকে কোন সাংবাদিক কিংবা মানবধিকার কর্মী অথবা সচেতন প্রতিবাদি নাগরিকরা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে পতিত দূর্নিতীবাজ স্বেচ্ছাচারী প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যাক্তির বিরুদ্ধে তথ্য উত্তাপ সংগ্রহ করতে পারবেনা।

 

কেও যদি এ কাজটি করে তাহলে তার বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যাক্তি অভিযোগ দায়ের করতে পারবে। এক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমন জারি করে গ্রেফতার করতে পারবে। যাতে ১৪ বছরের জেল ও ২৫ লাখ টাকার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। চোখের সামনে গণমাধ্যমগুলি ও সাংবাদিকরা সত্য দেখে তার উত্তাপ ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারবেনা। যদি কেও করে সেই গনমাধ্যম কর্মীটি হয়ে যাবে গুপ্তচর।

 

৩২ ধারার শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা থাকায় সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে পতিত দূর্নীতিবাজ সরকারি আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান জনপ্রতিনিধিরা হয়ে উঠবে লাগামহীন স্বেচ্ছাচারী। সমাজ, রাষ্ট্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দূর্নীতিমুক্ত রাখতে হলে স্বাধীন গণমাধ্যম বিরোধী সংবিধানের বিপরীতধর্মী আইন প্রণনয় থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে। একটা কথা মনে রাখতে হবে ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী নয় । আমাদের দেশে এরশাদ ও খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন অনেক কালো আইনের বোঝা তারা জাতির উপরে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারাও একসময় বিদায় নিয়েছেন।

 

পৃথীবির অনেক দেশে স্বৈরশাসকরা বিভিন্ন কালো আইনের সহযোগিতা নিয়েও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সৃষ্ট আইন বুমেরাং হয়ে তাদেরকেই ঘায়েল করেছে। আওয়ামীলীগের মত একটি গনমানুষের আস্থাভাজন রাজনৈতিক দলের গনমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করে এমন আইন পাশ করা ও মানুষের অধিকারের পথ রুদ্ধ করা উচিত নয়।

 

যদি কোন দিন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় না থাকে সেদিন মুক্তিযোদ্ধের নেতৃত্বদান কারী রাজনৈতিক দলের কর্মীরা যদি পরবর্তীকালে কোন স্বৈরশাসকের হাতে প্রতিহিংসায় পতিত হয় তাহলে ৭৫ পরবর্তী ২১ বছরের মত গণতন্ত্র স্বাধীনতায় বিশ্বাসী অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনা ধারনকারী গনমাধ্যমকর্মীরা সত্য ঘটনা গুলিকে জনসাধারনের সামনে তুলে ধরে আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় এনে ছিল সেই পথটি যেন রুদ্ধ না হয়ে যায়।

 

ভাবতে অবাক লাগে বানিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন সংসদ সদস্যদের মান ইজ্জত রক্ষা করতেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ করা হয়েছে। আপনারা (সাংবাদিক) গনমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন তাতে মান ইজ্জত থাকেনা। তাদের সম্মান ক্ষুন্ন হয়।

 

তারা জনপ্রতিনিধি সেই কারনেই ২০১৮ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি করা হয়েছে। তোফায়েল আহমেদের বোঝা উচিত যেকোন অনিয়ম অসদাচারন দূর্নীতি তোলে ধরতে সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাকটিভিটিস্ট, মানবধীকার কর্মীরা তথ্য উত্তাপ বিভিন্ন  ভাবে সংগ্রহ করে ও অনুসন্ধান চালায়।

 

সাংবাদিকদের বিভিন্ন রিপোর্টের ফলে সরকার, রাষ্ট্র ও জনগন উপকৃত হয়। রাষ্ট্রীয় কোন অনিয়ম ও দূর্নীতি তুলে ধরার জন্য ৩২ ধারায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগ আনার যে সুযোগ রয়েছে তাতে সাংবাদিকদের ও গণমাধ্যমের কাজের জায়গাগুলি সংকোচিত হবে।

 

ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র ও জনগন। সরকারি দল, এমপি, সরকারি কর্মচারীদের দূর্নীতি ও স্বৈরাচারীতা বেড়ে যাবে। যার ফলে আগামীদিনের জন্য তা মঙ্গলময় হবেনা। খসরা ডিজিটাল নিরপত্তা আইন ২০১৮ এর অনেক ভালো দিক রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দেশকে অপপ্রচার থেকে রক্ষা করা, ধর্ম নিরপেক্ষ চেতনার প্রসার ঘটানো।

 

এই আইনের ২১ ধারায় প্রস্তাব অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার নামে প্রোপাগান্ডা ও প্রচারণা চালালে বা মদদ দিলে অনধিক ১৪ বছরের কারাদন্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড হতে পারে। ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভ’তিতে আঘাত দিলে বা কিছু প্রচার বা প্রকাশ করলে ১০ বছর কারাদন্ড বা অনধিক ২০ লাখ টাকার অর্থদন্ড হতে পারে।

 

২৯ ধারায় বলা হয়েছে কেও মানহানীকর কোন তথ্য দিলে সেই ব্যক্তির ৩ বছরের জেল ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা ও উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। বেআইনি ভাবে কারও ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে তাকে ৭ বছরের জেল ও ২৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ড দেওয়া হবে। এছাড়া বেআইনি ভাবে অন্য ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার পর যদি সেই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে ১৪ বছরের জেল ও ১ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৭ ধারায় বলা হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কেও যদি জনগনকে ভয় দেখায় এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি করে তাহলে ১৪ বছরের জেল ও ১ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড হতে পারে। ৩১ ধারায় বলা হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ অরাজকতার সৃষ্টি করলে তাকে ৭ বছরের জেল ও ৫ লাখ টাকার জরিমানা অথবা উভয় দন্ড দেওয়া হতে পারে। এই আইনের ১৭,১৯,২১,২২,২৩,২৪,২৬,২৭,২৮,৩০,৩১,৩২ ও ৩৪ ধারায় সব অপরাধ জামিন অযোগ্য। তবে ২০,২৫,২৯ ও ৪৮ ধারায় সব অপরাধ জামিন যোগ্য।

বর্তমান বিশ্বে পরিস্থিতিতে সুশাসন ও গনমাধ্যম এই দুটি বিষয় গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আমাদের দেশের মত গনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় দূর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা আইনের শাসনকে যারা অশ্রদ্ধা করে একমাত্র গণমাধ্যম তাদের সমচিত জবাব দিতে পারে। তাই দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

 

গণমাধ্যম রাষ্ট্র সরকার ও জনগনের মাঝে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। দেশে গনসচেতনা তৈরির মাধ্যমে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে গনমাধ্যম। তাই রাষ্ট্রে জনগনের স্বার্থ রক্ষা দূর্ণীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও দূর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধি ও সরকারী কর্মচারীদের বিরোদ্ধে গনমাধ্যমকর্মীরা সাহসী ভ’মিকা পালন করে। তাই সরকারের উচিত ৩২ ধারায় যেসমস্ত আইন গনমাধ্যমকর্মীদের তথ্য উত্তাপ সংগ্রহে বাধাঁগ্রস্ত করবে সেগুলিথেকে বিরত থেকে আইনটিকে অনুমোদন দেওয়া।

ব্রেকিং নিউজঃ