| |

ময়মনসিংহে গারো সংগঠনের ব্যপক কর্মসূচী

আপডেটঃ ৩:৩৯ অপরাহ্ণ | আগস্ট ০৮, ২০১৮

Ad

এএইচএম মোতালেবঃ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে ৯আগস্ট/১৮ ময়মনসিংহে ব্যপক কর্মসূচী গহন করা হয়েছে। গতকাল ৮আগস্ট বেলা ১১টায় ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ট্রাইবাল এসাসিয়েশেনের সভাপতি হিল্লোল নকরেক এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সন্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উদযাপন কমিটির মহাসচিব অরন্য চিরান, কারিতাস প্রতিনিধি অসমান গনি, টিআইবি প্রতিনিধি চিত্ত রঞ্জন, আদিবাসী নেতা সুচনা সাংমা , পিসিসি প্রতিনিধি ধিরেন সাংমা, প্রমূখ। এ কর্মসূচীর কথা সাংবাদিকদের জানানো হয়েছে।
কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে সকাল সাড়ে নয়টায় রেলওয়ে কৃষ্ণচূড়া চত্তরে জমায়েতসহ এক বর্নাঢ্য শোভাযাত্রা প্রধান সড়ক দক্ষিণ শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গনে শেষ হবে।
প্রধান মন্ত্রীর কাছে ৭দফা দাবী সম্বলিত স্মারকলিপি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রদান করা হবে বলে জানিয়েছেন।
গারো নেতা হিল্লোল নকরেক বলেন ৯ আগস্ট সারা বিশ্বব্যাপী আদিবাসীদের প্রত্যাশার একটি দিন। জাতিসংঘ তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, মানবাধিকার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রতিটি রাষ্ট্রকে তাগিদ দিতে এদিবসটি ঘোষণা করেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে এই পৃথিবীতে প্রায় সাতশত কোটি মানুষের বাস, তার মধ্যে ৩৭ কোটি আদিবাসী জনগণ এবং পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ ভূমি রয়েছে তাদের দখলে। তাদের মধ্যে যেমন রয়েছে ভাষা-বৈচিত্র্য তেমনি রয়েছে জীবন বৈচিত্র্য।
তিনি আরো জানান বিশ্বে আদিবাসীরা পাঁচ হাজারেরও বেশি আদি সংস্কৃতিকে ধারণ করে আছে। আর এ আদিবাসীরাই বিশ্বের সব চেয়ে বেশি সংস্কৃতি বৈচিত্র্যের ধারক, তারপরও তারা এ পৃথিবীতে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত। তাদের ভূমির অধিকার থাকলেও বাস্তবে তা স্বীকার করা হয় না। বিশ্বের অনেক দেশেই আদিবাসীদের সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের ভূমির অধিকারও ফিরিয়ে দিয়েছে কিন্তু এখনও বাংলাদেশে এ জনগোষ্ঠী সাংবিধানিকভাবে “আদিবাসী” হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। বাংলাদেশে সুপ্রাচীন কাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আদিবাসী গোষ্ঠী বসবাস করে আসছে।
মিঃ হিল্লোল আরো বলেন এদেশে গারো, হাজং, বম, কোচ, বানাই, চাকমা, মগ, মুরং, মারমা, বর্মণ, ডালু, ক্ষত্রিয়, হদি, মনিপুরী, খাসিয়া, সাঁওতাল, খুমি, রাজবংশী ইত্যাদিসহ প্রায় ৪৫টি জাতিসত্তা বসবাস করছে। আদিবাসীরা সংখ্যাগত দিক দিয়ে স্বল্প হলেও বহুকাল ধরে নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণ, ধারণ ও লালন করে এদেশের সংস্কৃতিকে উচ্চতম স্থানে নিয়ে এসেছে। এ জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও ভূমির অধিকার প্রদানসহ তাদের জীবনমান নিশ্চিত করতে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আমাদের সামনে এসেছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০১৮ ।
আদিবাসী দিবসের পেক্ষাপট পর্যালোচনা করে জানা যায় যে, ১৯৮২ সনে জেনেভাতে আদিবাসী জনসংখ্যা বিষয়ে জাতিসংঘের কার্যনির্বাহী পরিষদের প্রথম সভায় বিশ্বের আদিবাসীদের স্বীকৃতির জন্য ৯ আগস্টকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্মরণ করা হয়। এরপর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৩ সনে বিশ্বের অনুন্নত আদিবাসী জনগণের উন্নয়ন ও মানবাধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রথম আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ পালনের সূচনা করে। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সনে ২৩ শে ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৪-২০০৪ সালকে প্রথম আদিবাসী দশক হিসেবে ঘোষণা করে। সাথে সাথে এ দশকে তাদের জীবনমান উন্নত করার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। প্রথম দশকে তেমন সফলতা না পাওয়ায় জাতিসংঘ আবার পরবর্তীতে ২০০৫-২০১৪ সালকে পুনরায় দ্বিতীয় আদিবাসী দশক হিসেবে ঘোষণা করে এবং সেই সাথে ৯ আগস্টকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সময় থেকে প্রতিবছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘের ঘোষণার সাথে সাথে ১৯৯৩ সালে ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ ময়দানে ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন (টি.ডব্লিউ.এ) এর কেন্দ্রীয় পরিষদের উদ্যোগে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপিত হয়। সেদিন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে এ দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার এ জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়নি। এ বছর জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০১৮ এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- “ওহফরমবহড়ঁং ঢ়বড়ঢ়ষবং’ সরমৎধঃরড়হ ধহফ সড়াবসবহঃ” অর্থাৎ “আদিবাসী জাতিসমূহের দেশান্তর রোধ ও অধিকারের আন্দোলন”.- টঘ উবপষধৎধঃরড়হ-২০১৮ – এই প্রতিপাদ্য বিষয়টি আদিবাসী জনগণের ভূমি ও ভূমির জন্য আন্দোলন, অভিবাসনের মূল কারণ, গৃহ হারানো, শহুরে এলাকায় বা আন্তর্জাতিক সীমান্তে বসবাসরত আদিবাসীদের সুরক্ষা এবং জীবনের অধিকারের উপর আলোকপাত করেছে।
বহু বছর যাবৎ আদিবাসী জনগণের উপর ন্যায়বিচারের অভাব, ভূমির উপর নিজেদের অধিকার খর্ব হওয়া, সম্পদ ও বাসস্থান হারানো, নির্যাতন ও বৈষম্যের কারণে তাদের জীবনমান অনেক পিছিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠী ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ, ১৯৬৪ সালের রায়ত, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সালের কাদের বাহিনীর সময় নানান অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। এদেশের আদিবাসী জনগণ বাঙালিদের পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগহণ করে দেশের স্বাধীনতা আনয়নে সহায়তা করেছে। আধুনিক রাষ্ট্র ও ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে তাদের উন্নয়ন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। জাতিসংঘের সমীক্ষা অনুযায়ী, পৃথিবীর অতি-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এক তৃতীয়াংশ আদিবাসী জনগণ এবং তাদের মধ্যে নিরক্ষর ও বেকার লোকের সংখ্যাই বেশি। ধুমপান এবং এই জাতীয় উপাদান গ্রহণের মাত্রা বেশি বলে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বেশি। আদিবাসীদের জীবনমানের বিষয়টি উন্নয়নশীল দেশ এমনকি উন্নত বিশ্বেও কোন ইস্যু হিসেবে আলোচিত হয়না। জীবনমানের দিক থেকে আদিবাসী জনগণ অ-আদিবাসীদের চাইতে অনেক পিছিয়ে। উচ্চ বেকারত্ব, অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আদিবাসীরা অত্যন্ত নি¤œমানের জীবন যাপন করছে। কুসংস্কার ও অসচেতনতার ফলে তাদের মধ্যে বিভিন্ন মারাতœক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায় এবং এর ফলে মৃত্যুহারও অত্যন্ত বেশি। প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে নিবিড় সম্পর্ক এবং প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল বলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ ফলাফল আদিবাসীরাই সর্বপ্রথম ভোগ করছে। যদিও আদিবাসীরা গ্রীন হাউজ প্রভাব কমানোর জন্য অবদান রাখছে তবুও বিশ্বব্যাপী তারাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিরাট হুমকির সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের তিক্ততা ইতোমধ্যেই তারা ভোগ করছে, সেই সাথে তারা এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভূমি ও সম্পদ হারানো, মানবাধিকার লংঘন ও বেকারত্বের শিকার হয়ে প্রান্তিক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই আদিবাসীদের ভূমি ও জীবনের অধিকার রক্ষায় সরকারসহ সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। আদিবাসী জনগণেরও এখন সচেতন হতে হবে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায়। দেশের সরকারকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে যতœশীল হতে হবে। যতœশীল হতে হবে সেইসব বিচিত্র সংস্কৃতির ধারক ও বাহকদের রক্ষার করার জন্য। তবে বর্তমান সরকার আদিবাসীদের জন্য সমস্যা সমাধানে কিছু কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যা আশা ব্যঞ্জক। সমস্যা জর্জরিত আদিবাসী জনগণের প্রত্যাশা হলো বাংলাদেশ সরকার সংবিধানে তাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, তাদের ক্ষমতায়নের জন্য মহান সংসদে ৫% কোটা বরাদ্ধ করা, সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, ভুমি কমিশন গঠন, সংরক্ষিত মহিলা আসনে আদিবাসী নারীদের মনোনয়ন প্রদান ও সরকারি চাকরিতে সরকার প্রদত্ত কোটায় নিয়োগ নিশ্চিত করণের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সকল জনগণকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের নিরন্তর শুভেচ্ছা। আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের সেবা করি।