| |

প্রিয় বন্ধু ডাঃ এরশাদুল করিম সেলিম তোমাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসা

আপডেটঃ ৮:১২ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ০৬, ২০১৮

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ সাবেক জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ও সহ সভাপতি ৭৫এর ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ছাত্রলীগের উদ্যোগে ময়মনসিংহে প্রথম প্রতিবাদ মিছিলের নেতৃত্ব দানকারীদের মধ্যে অন্যতম ডাঃ এরশাদুল করিম সেলিম গতকাল পরলোক গমন করেছেন। এ প্রজন্মের ছাত্রলীগের অনেক কর্মী হয়ত এরশাদুল করিম সেলিমের নাম শুনেনি। কেউ যদি তার নাম শুনেও থাকেন ব্যক্তিগতভাবে তাকে দেখেনি। তিনি ডাঃ এরশাদুল করিম সেলিম প্রচারবিমুখ একজন সাবেক ছাত্রনেতা। যার কোন পদের লোভ ছিলনা, ছিলনা নেতৃত্বকে কুক্ষীগত করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের। সে ছিল একজন ত্যাগী, নির্লোভ, মুজিব আদর্শে বিশ^াসী রাজপথের সৈনিক। ব্যক্তিজীবনে সে ছিল আমাদের প্রিয় বন্ধু, সুখ দুঃখের সাথী রাজনৈতিক সহকর্মী। এরশাদুল করিম সেলিমকে আমরা নেতা তৈরির কারিগর বলতাম। সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি নাজিম উদ্দিন আহমেদ এমপি, স্বপন সরকার, মরহুম আমিনুল ইসলাম তারা, ফারুক আহমেদ খান, ডাঃ রফিক, হুসাইন জাহাঙ্গীর বাবু, অসীত রঞ্জন দত্ত বাবন, আহসান মোঃ আজাদের মত নেতারা যারা ছাত্রলীগে অতীতে ময়মনসিংহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ডাঃ এরশাদুল করিম সেলিম ছিলেন তাদের সৃষ্টির নেপথ্যকারিগরদের মধ্যে একজন। আজকের স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের মহাসচিব ডাঃ এম.এ আজিজ ছিল তার নিকটতম রাজনৈতিক সহকর্মী। এরশাদুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে বর্তমান ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানকে ভালবাসতেন সবচাইতে বেশি। তাই বলে তাকে বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাষা সৈনিক সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধের সংগঠক ভাষা সৈনিক রফিক উদ্দিন ভূইয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাষা সৈনিক শামসুল হক এর মত নেতাদেরকে কোনদিন অশ্রদ্ধা করতে দেখিনি। বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রী বৃহত্তম ময়মনসিংহের ছাত্রলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ ছিলেন তার আনন্দমোহন কলেজের সহপাঠী ও একান্ত আপনজন। সৈয়দ আশরাফের সাথে তার ছিল আত্বীক সম্পর্ক। সেই সময়ে আমরা আনন্দমোহন কলেজের তার সহপাঠী ও রাজনৈতিক বন্ধু ছিলাম। তার অনেক ব্যক্তিগত স্মৃতি, রাজনৈতিক কর্মকান্ড আমাদের মনের স্মৃতি কোঠায় আজ জ¦ল জ¦ল করে জ¦লছে। ১৯৭০ সালে আনন্দমোহন কলেজে তৎকালীন স্বাধীনতা বিরোধী কুখ্যাত মোনায়েম খানের পেটুয়া বাহিনী এন.এস.এফ এর বিরুদ্ধে যে মিছিলটি হয়েছিল আনন্দমোহন কলেজে অনেক সাহসী ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে এরশাদুল করিম সেলিমের ভূমিকা ছিল প্রশংসাযোগ্য। এরশাদুল করিম সেলিম আমাদেরকে সংগঠিত করে এবং দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্র যা আমরা ত্রিশালের বালিপাড়া ও নান্দাইল থেকে এনে প্রথমে এরশাদুলের নওমহলের নন্দীবাড়ী বাসায় রাখি। পরবর্তীতে মিছিলের দিন সেই অস্ত্রগুলি কলেজে নিয়ে যাই ও তার নেতৃত্বে মিছিলে অংশগ্রহন করি। এটাই ছিল এন.এস.এফ এর বিরুদ্ধে প্রথম স্বসস্ত্র মিছিল। তার পর এন.এস.এফ আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিদায় নেয় এবং আর কোনদিন কলেজে প্রকাশ্যে তৎপরতা চালায়নি। ৭৫ পরবর্তী সময়ে ১৫ই আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সারা বাঙ্গালী জাতির মত ময়মনসিংহের নেতাকর্মীরা যখন সিদ্বান্তহীনতায় নিমজ্জিত ঠিক সেই মূহুর্তে তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতাদের মধ্যে স্বপন সরকার, এরশাদুল করিম সেলিম, আব্দুল কাদির, লতিফ মির্জা, ডাঃ উইলিয়াম, ¯েœহাংসু দত্ত, ডাঃ বাদল, ডাঃ সাইফুল্লাহ, ডাঃ করিমসহ আমরা কিছু নেতাকর্মী সিদ্ধান্ত নেই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে মিছিল করা হবে। এ লক্ষে স্বপন সরকার ও এরশাদুল করিম সেলিমের নেতৃত্বে গাঙ্গিনাপাড়ের মোড় থেকে বিদ্যময়ী স্কুলের সামনের গলি পর্যন্ত একটি ঝটিকা মিছিল করা হয়। পরে বিদ্যাময়ী স্কুলের গলি দিয়ে নওমহলের দিকের রাস্তাটি ধরে আমরা পালিয়ে যাই। এই মিছিলটির সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন এরশাদুল করিম সেলিম। ময়মনসিংহ ছাত্রলীগের উদ্যোগে এই প্রতিবাদ মিছিলটি ছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে প্রথম প্রতিবাদ মিছিল। আনন্দমোহন কলেজ থেকে ইন্টামিডিয়েট পাশ করার পর এরশাদুল করিম সেলিম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তী হন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালে মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগকে সুসংগঠিত করে ছাত্রলীগের ঘাটি হিসেবে পরিচিত করেন। যেখানে এরশাদুল করিম সেলিমের অবধান ছিল অপরিসীম। আজকের অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের স্বানিধ্যে আমি প্রথম আসি এরশাদুল করিম সেলিমের মাধ্যমে তারপর সুদীর্ঘ সময় অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তীতে এমপি নির্বাচনের প্রত্যেকটিতে এরশাদুল করিম সেলিমসহ আমরা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহন করি। এরশাদুল করিম সেলিম যাকে রাজনৈতিক গুরু বলে মানতেন তিনি হলেন সাবেক জেলা আঃলীগের সহ সভাপতি, ৭৫ পরবর্তী সময়ের সাবেক জেলা যুবলীগের সভাপতি ও বাকশালের জেলার সভাপতি মজিবুর রহমান খান মিল্কীকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ থাকে যে, আজকের মহানগর সভাপতি এহতেশামুল আলম, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইউসুফ খান পাঠানরা রাজনৈতিক গ্রুপিং এর কারণে রফিকউদ্দিন ভূইয়া ও শামসুল হক সাহেবদের সাথে রাজনীতি করতেন। অপরদিকে মুজিবুর রহমান খান মিল্কী, এরশাদুল করিম সেলিম ও আমরা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের সাথে রাজনীতি করতাম। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন বিভক্ত হয়ে বাকশাল গঠিত হলো তখন এরশাদুল করিম সেলিম ও মিল্কী সাহেবের অনুগতরা বাকশাল গঠন করে মতিউর রহমানের কাছ থেকে দূরে সরে গেল। সেই থেকেই এরশাদুল করিম সেলিম আস্তে আস্তে রাজনীতি থেকে দূশ্যের বাইরে চলে গেল। আমরা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের সাথে সম্পৃক্ত রইলাম। পরবর্তীতে মুজিবুর রহমান খান মিল্কীসহ অনেকেই আঃলীগে ফিরে আসলেও এরশাদুল করিম সেলিম আর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়নি। এবার তার ব্যক্তিগত জীবনের কয়েকটি কথা লিখে শেষ করতে চাই। ডাঃ এরশাদুল করিম সেলিম ছিলেন ময়মনসিংহ প্রেমিক। সে ময়মনসিংহ ছেড়ে কোথাও যেতে চাইতেন না। মেডিকেল কলেজে কর্তব্যরত অবস্থায় সে অনেক প্রমোশন পেয়েছিলেন কিন্তু ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে যেতে হবে বিধায় তিনি কোন প্রমোশন গ্রহন করেননি। এরশাদুল করিম সেলিম ছাত্রজীবনে অত্যান্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। স্কুল, কলেজ ও মেডিকেল কলেজে তিনি বরাবরই ভাল রেজাল্ট করতেন। আমাদের সাথে যখন আড্ডা কিংবা কোন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে থাকতেন তখন সময় পেলেই পকেট থেকে বইয়ের পাতা বের করে চোখ বুলিয়ে নিতেন। উল্লেখ করতে চাই তিনি তার পড়ার বইয়ের পাতা ছিড়ে পকেটে বয়ে নিয়ে যেতেন। সময় পেলেই চোখ বুলিয়ে নিতেন। তারপরও তার পরীক্ষার রেজাল্ট হত ঈশর্^নীয় পর্যায়ে। এরশাদুল করিম সেলিমের পিতা আব্দুল আজিজ ছিলেন আনন্দ মোহন কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক। আদিনিবাস নান্দাইল। সর্বশেষ আর একটি স্মৃতি উল্লেখ করে বিদায় নিব। তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক স্লোগান ও কর্মসূচি প্রচার করা হতো দেওয়াল কিংবা কাগজে হাতে লিখে। এগুলো করতে যখন পয়সার অভাব হতো এরশাদুল করিম সেলিম তার বাসা থেকে চাল কিংবা গুটা হলুদ অনেক সময় রসুন ব্যাগে করে নিয়ে এসে আমাদেরকে দিয়ে বলত এগুলো বিক্রি করে কাগজ ও রং কিনে নিয়ে আস সাথে এক প্যাকেট বিড়ি আনিস। আমরা সারা রাত বিড়ি খেতাম আর তার বাসা থেকে চুরি করা জিনিস বিক্রি করে যে টাকা পেতাম তা দিয়ে কাগজ ও রং কিনে পোষ্টার এবং দেওয়াল লিখতাম। এই ছিল আমাদের প্রিয় বন্ধু এরশাদুল করিম সেলিম। দল ও বঙ্গবন্ধুর জন্য তার ভালবাসা ছিল অকল্পনীয়। আমরা এমন একজন নিস্বার্থ, নিরহংকার, প্রচারবিমুখ মুজীব প্রেমিকে হারিয়েছি। তাকে জানাই বিন¤্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।