| |

৩ নভেম্বর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রথম সফল সম্মুখ মুক্তিযুদ্ধ ঐতিহাসিক তেলিখালী যুদ্ধ

আপডেটঃ ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ | নভেম্বর ০৪, ২০১৮

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ ময়মনসিংহ জেলায় মহান মুক্তিযোদ্ধে ঐতিহাসিক তেলিখালী যুদ্ধ একটি সম্মুখ যুদ্ধ। ১৯৭১ সনের ৩রা নভেম্বর সংগঠিত হয় এ ভয়াবহ যুদ্ধটি। ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী হালোয়াঘাট উপজেলার ভূবনকুড়া ইউনিয়নে অবস্থিত তেলিখালী সীামন্ত ফাড়ি (বিওপি)।

 

৭১ সনে এ ফাড়ি ছিল পাক হানাদার বাহিনীর ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি শক্তিশালী দূর্গ। সিদ্বান্ত হয় তেলিখালীকে শত্রু মুক্ত করতে পারলে জেলা শহর ময়মনসিংহ দখল করা সহজ হবে। এ লক্ষে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। অক্টোবর/৭১ এর শেষ সপ্তাহে কমান্ডার আবুল হাশেমের নেতৃত্বে ২০১জন মুক্তিযোদ্ধা ভাগ হয়ে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ১৩ রাজপুত রেজিম্যান্টের ৫টি কোম্পানী আলফা, ব্রেভো, চার্লিং, ডেলটা ও এডম এর সাথে একত্রিত হয়। প্রায় ১ সপ্তাহ যৌথ বাহিনীর ৫টি কোম্পানীর চলে যুদ্ধ জয়ের জন্য গোপন মহড়া ও প্রস্তুতি। মহড়া শেষে হাই কমান্ডের নির্দেশ অনুযায়ী ২রা নভেম্বর রাত ১২টায় যাথাকোণা স্কুল মাঠে ৫টি কোম্পানী সমবেত হয়। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে যৌথ বাহিনীর ৫টি কোম্পানী অত্যাধুনীক অস্ত্র-সস্ত্রে সঞ্জিত হয়ে তেলিখালীর চারিদিকে নিজ নিজ অবস্থানে পজিশন নেয়। ৩রা নভেম্বর রাত ৩টার সময় ৩দিক থেকে তেলিখালীর উপর সাড়াশী আক্রমন চালানো হয় ও উত্তর দিক থেকে চলে কভারিং ফায়ার। যৌথ বাহিনীর বীর যুদ্ধারা ক্রোলিং করে একের পর এক পাক বাঙ্কারে গ্রেনেড চার্জ শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের জয় বাংলা স্লোগানে প্রকম্পিত হয় রণক্ষেত্র। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ।

 

মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ার, মর্টার, রকেট লান্সার, গ্রেনেড ও রাইফেলের গুলিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠে ভূবনকোড়া এলাকা। দীর্ঘ ৫ ঘন্টা ধরে চলে এ ভয়াবহ যুদ্ধ। শ^াসরুদ্ধকর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ৪ নভেম্বর সকাল ৮টার সময় পাক বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয় তেলিখালী। এ যুদ্ধে ১২৪ জন পাক সেনা ২৫জন রেঞ্জার ও ৮৫জন রাজাকার (সর্বমোট ২৩৪জন) প্রাণ হারায় হানাদার পাক বাহিনীর পক্ষের। আহত অবস্থায় ১ পাক সেনা ২জন রাজাকার আত্মসমর্পন করে। বহু অস্ত্র,গোলাবারুদ যৌথবাহিনীর হস্তগত হয়। যুদ্ধ জয়ের পর তেলিখালীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে অসংখ্য মৃত পাক সেনা ও রাজাকারদের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন লাশ। এর সাথে ছিল ২জন মহিলার লাশ।

 

পরবর্তীতে জানা যায়, নালিতা বাড়ি উপজেলার আলবদরের কমান্ডার আব্দুর রহমান উক্ত মহিলাদের পাক হায়নাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। তেলিখালী যুদ্ধ জয়ের পর পাক বাহিনীর রক্ষণ ভাগ ভেঙ্গে পরে ও ময়মনসিংহ বিজয়ের পথ প্রসস্থ হয়। তেলিখালী যুদ্ধে ৯জন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ২১জন মিত্র বাহিনীর বীর সেনানী শাহাদাৎ বরণ করেন। যৌথবাহিনীর অনেক বীর যোদ্ধা গুরুতর আহত হন। যে ৯জন বীর মুক্তিযোদ্ধা এ যুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন তারা হলেন, হালোয়াঘাট উপজেলার তেলিখালী গ্রামের আক্তার হোসেন সরকার, ফুলপুর উপজেলার বাইটকান্দি গ্রামের হযরত আলী, ময়মনসিংহ শহরের বাগমারা এলাকার শাহজাহান আলী বাদশা, কৃষ্টপুর এলাকার আলাউদ্দিন, সদর উপজেলার বেগুনবাড়ীর রঞ্জিত দত্ত, বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র ও ষড়িষাবাড়ী উপজেলার শওকত উসমান, তৎকালীন ইপিআর এর সিপাহী ওয়াজিউল্লাহ, নালিতাবাড়ী থানার শেরপুর জেলার শহীদ ইদ্রিস আলী এবং তারাকান্দা উপজেলার মাইলুরা গ্রামের শহীদ আব্দুর রহিম। যুদ্ধ জয়ের পর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল হাসেম ও কমান্ডার আতাউদ্দিন শাহের নেতৃত্বে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের শুত্রুমুক্ত তেলিখালীতে সমাহিত করা হয়। এখনো তেলিখালী সীামান্ত ফাড়ির পেছনে রয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গনকবর। তেলিখালী যুদ্ধে শহীদ ২১ জন মিত্রবাহিনীর সদস্যের শেষকৃত অনুষ্ঠান ১৩ রাজপুত রেজিম্যান্টের তৎকালীন ব্যাটেলিয়ান হেড কোয়াটারে ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। সেই শেষকৃত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ভারতীয় সেনা বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কামান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা।

 

মিত্র বাহিনীর বিগ্রেডিয়ার সান্ত সিং বাবাজী, কর্ণেল রঘুবন সিং সহ উচ্চ পদস্থ অফিসারবৃন্দ। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার আবুল হাশেম এবং এডম গ্রুপ কমান্ডার আব্দুর রব ও টুআইসি নবী হোসেন উপস্থিত ছিলেন। ঐতিহাসিক তেলিখালী যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে নেতৃত্ব দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল হাশেম, মিত্র বাহিনীর পক্ষে নেতৃত্ব দেন কর্ণেল রঘুবন সিং এবং যৌথবাহিনীর নেতৃত্ব দেন বিগ্রেডিয়ার সান্ত সিং বাবাজী, মুক্তিবাহিনীর পক্ষে আলফা গ্রপের নেতৃত্ব দেন গ্রুপ কমান্ডার নুরুল ইসলাম, ব্রেভো গ্রুপের নেতৃত্ব দেন গ্রুপ কমান্ডার আতা উদ্দিন শাহ, চার্লি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন কমান্ডার হাফিজ উদ্দিন, ডেলটা গ্রুপের নেতত্ব দেন কমান্ডার হাবিলদার মেজবাহ এবং এডম গ্রুপের (ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়াটার) নেতৃত্ব দেন গ্রুপ কমান্ডার আব্দুর রব।

 

তেলিখালী যুদ্ধে আরও ৬টি কাটাপ পার্টিতে বিভিন্ন কোম্পানীর বীর মুক্তিযোদ্ধাগন অংশগ্রহন করেন। তেলিখালী সম্মুখ সমরে জীবনবাজি রেখে যারা যুদ্ধ করেছিলেন তাদের মধ্যে স্বরণীয় হলেন সর্বগাজী নবী হোসেন, বদিউল আলম রতন, আব্দুর রশিদ তালুকদার, হাবিবুর রহমান, ফারুক আহমেদ, সেলিম সাজ্জাদ, বিমল চন্দ্র পাল, সেলিম সরকার রবার্ড, আকবর আলী, শামসুল হক বাদল, সোরহাব আলী, শামসুল হক, ইকরাম হোসেন, মানিক চন্দ্র, কিশোর সরকার, আবুল কাশে, মঞ্জু তালুকদার, সৈয়দ আলী, আব্দুস সামাদ, আব্দুর রব, নজরুল ইসলাম, শরাফ উদ্দিন, জামাল উদ্দিন, সাইদুর রহমান, আব্দুর রহমান, আব্দসসুবহান, আলী আহমেদ দুদু, আবু তাহের, রফিকুল আলম, এম এ তাহের, অজয় কুমার ঘোষ, বিজয় চন্দ্র বিশ^াস, দেবল চন্দ্র দত্ত, পরেশ চন্দ্র সরকার, মনুরঞ্জন দেব, হরিশংকর মজুমদার, আব্দুল কাদির, গোলাম মোস্তফা চৌধুরী, হযরত মারাক, হারুন সাংমা প্রমুখ। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে তেলিখালী যুদ্ধ ময়মনসিংহ অঞ্চলের একটি স্বরনীয় রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ। তাই ৩রা নভেম্বরের এই যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী বীর শহীদদের প্রতি জানাই বিন¤্র শ্রদ্ধা ও অংশগ্রহন কারি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ময়মনসিংহ বাসীর পক্ষ থেকে অভিনন্দন শুভেচ্ছা। এই যুদ্ধের বীরত্বগাথা ইতিহাস বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্যই আমার এই লেখাটি। তেলিখালী যুদ্ধের বর্ণনাটি বীর মুক্তিযোদ্ধা এডম গ্রুপ কমান্ডার আব্দুর রবের কাছ থেকে সংগ্রহিত।

ব্রেকিং নিউজঃ