| |

যুবলীগের গৌরব ও ঐতিহ্যের ৪৬ বছর

আপডেটঃ ৯:০১ অপরাহ্ণ | নভেম্বর ১১, ২০১৮

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ গত ১১ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই যুব সংগঠনটি বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ৪৬ বছর অতিক্রম করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুজিবাদর্শের ভাবধারা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করতে গিয়ে এই সংগঠনটি আজ বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ যুব সংগঠনে পরিণত হয়েছে। যুবলীগের এই ৪৬ বছরে রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হচ্ছে যুবসমাজ। এরা একটি রাষ্ট্রের প্রাণ স্পন্দন। এ যুব সমাজকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারলে কোন রাষ্ট্র কাঙ্খিত উন্নয়ন লাভ করতে পারবে না। মেধা ও প্রযুক্তি জ্ঞান দিয়ে যুব সমাজকে গড়ে তুলতে পারলে রাষ্ট্র তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে যুব সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই যুব সামাজ যদি দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ, মেধা ও মননশীল না হয়ে সন্ত্রাস ও মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে তবে একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যত অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। তাই যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে মেধা ও মননে বিকশিত করে একটি আদর্শের ভিত্তিতে দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে যুব সংগঠনের প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খাঁন ও তোফায়েল আহমদ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার বেশ কিছু আগে থেকেই দক্ষ সংগঠক ও তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত সিরাজুল আলম খাঁন এদেশের ছাত্র ও যুব শক্তির বড় একটি অংশকে আওয়ামী রাজনীতির মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস চালাচ্ছিলেন। এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ এর আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠনের পর দেশের যুব সমাজের বিশাল অংশ মূল ধারার রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাসদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত তরুণ ও যুব সমাজকে কোন প্রকার বিভ্রান্তি দ্বারা বিপর্যস্ত এবং হতাশাগ্রস্থ না হয়ে মূল ধারায় সংযুক্ত রাখার লক্ষ্যে একটি যুব সংগঠনের অপরিহার্যতা দেখা দেয়। সেই চিন্তা ভাবনা থেকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা, ৬ দফা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর কমান্ডার, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শেখ ফজলুল হক মনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রথম যুব সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে ঐক্যবদ্ধভাবে আদর্শিক দীক্ষায় দীক্ষিত করে দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে সোনার বাংলা গঠনে যুব সমাজকে কাজে লাগানো ছিল যুবলীগ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র গণতন্ত্র, শোষণমুক্ত সমাজ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতা এই চার মূলনীতিকে সামনে রেখে বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র বিমোচন, শিক্ষা সম্প্রসারণ, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপদান অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা, যুব সমাজের ন্যায্য অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যত নেতৃত্ব গড়ে তোলা ছিল যুবলীগের লক্ষ্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য দেশের সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের মধ্য থেকে স্বাধীনতা ও প্রগতিকামী যুবক ও যুব মহিলাদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদের রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে একটি সুশৃঙ্খল যুব সংগঠন গড়ে তোলা ছিল যুবলীগের অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুবলীগের নেতাকর্মীরা সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ও দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। যুবলীগের প্রতিষ্ঠার পর থেকে সুশৃঙ্খলভাবে এই সংগঠনটির নেতাকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতার চেতনা রক্ষা ও বাস্তবায়ন, যুব সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনার দিক নির্দেশনা বাংলাদেশে জঙ্গী ও সন্ত্রাসী তৎপরতা প্রতিরোধ এবং বর্হিবিশ্বে জননেত্রী শেখ হাসিনার ‘জনগণের ক্ষমতায়ন; একটি শান্তির মডেল’ উপস্থাপন সহ ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে যুবলীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। একটি সুশৃঙ্খল ও আদর্শিক সংগঠন হিসেবে এটি আজ বাংলাদেশের যুব সমাজের প্রিয় সংগঠনে পরিণত হয়েছে। যুবলীগের নেতৃত্বের পরিবর্তন হয় কংগ্রেসের মাধ্যমে। ৪৬ বছরে এ পর্যন্ত ছয়টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম কংগ্রেসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। প্রথম কংগ্রেসে শেখ ফজলুল হক মনি চেয়ারম্যান ও এডভোকেট সৈয়দ আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কংগ্রেসে আমির হোসেন আমু চেয়ারম্যান ও ফকির আব্দুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তৃতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালে। এ কংগ্রেসে মোস্তফা মহসীন মন্টু চেয়ারম্যান ও ফুলু সরকার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ কংগ্রেসে শেখ ফজলুল করিম সেলিম চেয়ারম্যান ও কাজী ইকবাল হোসেন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে পঞ্চম কংগ্রেসে এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক চেয়ারম্যান ও মীর্জা আজম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই কংগ্রেসের পর ২০০৯ সালে এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হলে মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় কংগ্রেসে মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী চেয়ারম্যান ও মোঃ হারুনুর রশীদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যুবলীগ নেতাকর্মীরা দেশগড়ার কাজে আত্মনিয়োগের পাশাপাশি সকল অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। কখনও বুকের তাজা রক্ত দিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পর প্রতিরোধ আন্দোলন করতে গিয়ে চট্টগ্রামের যুবলীগ নেতা মৌলভী ছৈয়দ আহমদ ও বগুড়ার যুবলীগ নেতা আব্দুল খালেক খসরু আত্মদান করেন। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর যুবলীগ নেতা নূর হোসেন বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আন্দোলনকে বেগবান করেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে তত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলন সহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুবলীগের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ওয়ান ইলেভেনের সময় যখন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয় এবং সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় সেসময় যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সারা দেশের নেতা কর্মীদের উজ্জীবিত করে রাখেন। ২০০৮ সালে ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘রুপকল্প-২০২১’ ঘোষণা করেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের জন্য কাজ শুরু করেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধীতাকারী যুদ্ধপরাধ ও মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারকার্য শুরু করেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার এসকল কাজকে বাস্তবায়ন করতে যুবলীগ ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। যুবলীগ প্রতিষ্ঠার পর ময়মনসিংহে প্রথম জেলা যুবলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম। সাধারন সম্পাদক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন আহমেদ। ৭৫ পরবর্তী সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান খান মিল্কী সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক হন বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. আব্দুর রাজ্জাক। জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হন এহতেশামুল আলম ও অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান। পরবর্তীতে এহতেশামুল আলম সভাপতি অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান সাধারন সম্পাদক হিসেবে কাউন্সিলের মাধ্যমে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। পরবর্তী জেলা কমিটিতে ইউসুফ খান পাঠান সভাপতি ও অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। জাতিয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরোধীতা করার অভিযোগে যুবলীগ থেকে ইউসুফ খান পাঠানকে বহিষ্কার করা হয়। জামাত বিএনপি সরকারের আমলে জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি প্রদীপ ভৌমিক সভাপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। এসময় সাধারন সম্পাদক হিসেবে অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী জেলা কাউন্সিলে অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার সভাপতি ও আব্দুল কুদ্দুস সাধারন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগরে আহ্বায়ক কমিটি দায়িত্ব পালণ করছে। জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটিতে এড. আজহারুল ইসলাম আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে যারা আছেন তারা হলেন, শাহরিয়ার মোঃ খান রাহাত, শাহ শওকত উসমান লিটন, এইচ এম ফারুক, রফিকুল হক পিন্টু ও আখেরুল ইমাম সোহাগ। মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক হলেন মোঃ শাহিনুর রহমান যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল খান পাঠান, মোঃ রাসেল আব্দুল্লাহ।