| |

কারাবন্দি খালেদার এক বছর, কী প্রভাব বিএনপিতে

আপডেটঃ ১২:৩৪ অপরাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৯

Ad

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজা পেয়ে কারাগারে যান তিনি। এ মামলায় হাইকোর্টের আপিলে সাজা বেড়েছে তার। গত ৩০ অক্টোবর তাকে ১০ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি রাজনীতিতে যোগ দেয়ার পর খালেদা জিয়া মোট পাঁচবার গ্রেফতার হয়েছেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি তিন দফায় গ্রেপ্তার হন। তবে এ সময় তাকে বেশিদিন আটক থাকতে হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির মামলায় ৩৭২ দিন জাতীয় সংসদ ভবন এলকায় স্থাপিত বিশেষ সাব জেলে ছিলেন তিনি।

পঞ্চমবার গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সাধারণ কারাবন্দী হিসেবে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, নামাজ আদায় ও পত্রিকা পড়ে কারাগারে প্রথম দিনটি কাটান খালেদা জিয়া। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পরিবারের চার সদস্য তার সঙ্গে দেখা করেন। টানা চারদিন সাধারণ কয়েদির জীবন যাপনের পর ১১ ফেব্রুয়ারি ডিভিশন (প্রথম শ্রেণির বন্দী হিসেবে বিশেষ সুবিধা) পাওয়ার পর সেখান থেকে খালেদা জিয়াকে বন্দীদের সন্তান রাখার ডে-কেয়ার সেন্টারে নেয়া হয়। একজন ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দী হিসেবে সেখানেই কারাবাস করছেন তিনি।

কারা সূত্রে জানা গেছে, কারাগারের সব নিয়মই মেনে চলেন খালেদা জিয়া। তাকে কোনো বিষয় নিয়ে কারা কতৃর্পক্ষের অনুরোধও করতে হয় না। শেষ রাতের দিকে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পর্যন্ত জেগে থাকেন তিনি। ফজরের নামাজ সেরে ঘুমান। এরপর নাশতা করে ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে গোসল করেন। পরে দুপুরের খাবার খান। জোহরের নামাজের পর নিয়মিত অজিফা পড়েন তিনি। বিকালে কিছু সময় ডে-কেয়ার সেন্টারের বারান্দায় পায়চারি করেন। সেখানে থাকা একটি চেয়ারে বসেও সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় কাটে তার। এরপর রাতের খাবার খেয়ে ৯টার দিকে ঘুমাতে যান।

এদিকে খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকায় তিনি দলের যেসব কর্মসূচিতে অংশ নিতেন সেগুলোতে এখন নেতাকর্মীদের তেমন উপস্থিতি দেখা যায় না।

বিশেষ করে দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী, জিয়াউর রহমানের জন্ম বা মৃত্যু বার্ষিকী, ইফতার কর্মসূচি, ঈদুল ফিতর এবং আজাহার শুভেচ্ছা বিনিময়, এমন কি খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠপুত্র আরফাত রহমান কোকোর মৃত্যু বার্ষিকীতেও নেতাকর্মীদের তেমন উপস্থিতি দেখা যায়নি।

খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর প্রথম দিকে প্রতীকী অনশন, মানববন্ধন, প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশের মত কিছু কর্মসূচি পালন করলেও একটা পর্যায়ে তাতেও খেই হারিয়ে ফেলে বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০ দলীয় জোটকে কিছুটা পাশ কাটিয়ে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে কয়েকটি সমমনা দলকে সঙ্গে নিয়ে ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে বিএনপি। এ ঐক্যফ্রন্ট গঠনে পুরানো জোটে যেমন অস্বস্তি দেখা যায়, তেমনি তাদের মিত্র বিকল্প ধারা বাংলাদেশের সভাপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর দিনই সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি, সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দিয়ে সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্য সরকার গঠনসহ ৭ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকলেও শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের অংশ হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ১১ নভেম্বর নির্বাচনে অংশ নেয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় বিএনপি। পরবর্তীতে খালেদা বিহীন বিএনপি নেতারা গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও সংলাপেও বসে।

এরপর ১২ নভেম্বর খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির পাঁচ সিনিয়র নেতা। নির্বাচন নিয়ে দলের চেয়ারপারনরে সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন তারা। খালেদা জিয়াও তাদের দিক নির্দেশনা দেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নির্বাচনের মাঠে নামে দলটি।

ওদিকে প্রথম শ্রেণির বন্দী হিসেবে মাসে দুই বার চিঠি লেখার সুযোগ থাকলেও গত এক বছরে খালেদা জিয়া কাউকে চিঠি লিখেছেন এমন খবর পাওয়া যায়নি।

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের মধ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির মধ্যম সারির এক নেতা জাগো নিউজকে বলেন, ‘খালেদা জিয়াও কারাগারে, বিএনপিও কারাগারে। খালেদা জিয়া দলের যেসব দায়িত্ব পালন করতেন সেই দায়িত্ব পালন করার মত যোগ্য নেতা বিএনপিতে নেই। বিএনপি বলেন আর যে কোনো অঙ্গসহযোগী সংগঠন বলেন প্রত্যেকটাই খালেদা জিয়ার দেখতে হত। সে কারণে তিনি কারাগারে থাকায় এসব ক্ষেত্রেও কার্যকারিতা নেই। সিনিয়র নেতাদের মধ্যেও বোঝাপড়ার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যে কারণে তারা একটি নির্বাহী কমিটির সভা আহ্বান করতেও ভয় পাচ্ছেন। কারণ মধ্যম সারির নেতারা সিনিয়র নেতাদের ওপর যে ক্ষোভ ঝাড়বেন তা সামলানোর মানসিকতা তাদের নেই।’

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলেও ঐক্যফ্রন্ট গঠন, নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তার নির্দেশের বাইরে হয়নি। কিন্তু তিনি না থাকায় নির্বাচনে বিএনপির মত বড় দলকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে।’

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘উনি জাতীয় নেত্রী এবং বিএনপির বটগাছ। নেতৃত্ব দিচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। উনার অনুপস্থিতিতে একটা প্রভাব তো পড়বেই। উনি তো বিএনপির প্রাণ। কিছুটা তো প্রভাব পড়ছেই। এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে বিএনপি নেতাকর্মীরা সরকারের ফাঁদে পা দেয়নি। সরকার ভেবেছিল বেগম জিয়া আটক হওয়ার পর বিএনপি ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে যাবে, সেটা হয়নি। বিএনপির নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থেকেছে এবং সরকার বিএনপিকে ভাঙতে পারেনি।

চেয়াপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবেদীন ফারুক বলেন, ‘বেগম জিয়াকে জেলে রেখেও বিএনপি ইলেকশন করেছে। গণভবনের সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের দেয়া দাবি এবং শর্ত যখন মানা হয়নি তখনই আমরা তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছি- এ সংলাপ লোক দেখানো। কোনো সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। মামলা হামলা সহ্য করে ২০১৪ সালের নির্বাচনে না যাওয়ার খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্ত যে ঠিক সেটা প্রামাণ হলো। ঐক্যফ্রন্টের একটা দাবিও মানা হয়নি। ২৭ ডিসেম্বর জনসভা করতে দেয়নি। তখনই বোঝা উচিত ছিল নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের নেত্রী জেলে, আমার বক্তব স্পষ্ট। কর্মসূচি দিয়ে নেত্রীকে বের করতে হবে। কর্মসূচি পালনে দল সংগঠিত করতে হবে। জনগণ আছে কিন্তু নেতা এবং কৌশলের অভাব বলে মনে করি। নেত্রী এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে অনতিবিলম্বে কাউন্সিল করা উচিত। বেগম জিয়ার মুক্তির আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করা উচিত’।

সূত্র: জাগোনিউজ