| |

নৌকার দখলে ত্রিশাল

আপডেটঃ ৭:৫৯ অপরাহ্ণ | এপ্রিল ১১, ২০১৯

Ad

ইব্রাহিম মুকুট:  ঐতিহাসিক এক দিনের স্বাক্ষী হয়ে থাকলো নৌকা অন্ত:প্রাণ ত্রিশালের বাসিন্দারা। নৌকার পক্ষে গণজোয়ারে নিজেদের সামিল করলেন তাঁরাও। তরুণ-যুবা থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ সবাই নেমে এলেন রাজপথে। সবার গন্তব্য স্থানীয় নজরুল ডিগ্রী কলেজ মাঠ। কন্ঠে কন্ঠে স্লোগানের দামামা ‘নৌকা, নৌকা’। এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।

নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন! দেখে মনে হলো নৌকার ঘাঁটিতে নৌকারই বিজয় পতাকা উড়ছে! ঐতিহাসিক এই মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে শুরু করে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউসুফ খান পাঠান, সবাই উচ্চকন্ঠ- ‘ত্রিশালে নৌকার বিজয় ঠেকাতে পারবে না কেউ।’

অবশ্য যাকে ঘিরে এমন উন্মাদনা, উচ্ছ্বাসের বাতাবরণ তিনি ইকবাল হোসেন। আসন্ন ত্রিশাল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর হাতে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতীক নৌকা তুলে দিয়েছেন।

আবেগের বিহ্বলতায় নিজেকে সমর্পণ না করে বাস্তববাদী ও আধুনিক ত্রিশালের অগ্রযাত্রার মেরুকরণে বিশ্বাসী এই প্রার্থী বিজয়মাল্য পড়তে সক্ষম হলে চেয়ারম্যান পদে তাঁর প্রাপ্ত ভাতা জনগণের জন্যই ব্যয় করারও ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন, ত্রিশাল হাফেজ রুহুল আমিন মাদানীর মতো যোগ্য সংসদ সদস্য পেয়েছে। এই ত্রিশাল ছিলো উন্নয়ন বঞ্চিত এক জনপদ। মাত্র তিন মাসে স্থানীয় সংসদ সদস্য ৮০ কিলোমিটার সড়ক অনুমোদন করেছেন।

আমি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে মডেল ত্রিশাল উপজেলা উপহার দেবো। আমি গত ৭ বছরে ত্রিশালের প্রায় তিন হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা ও এতিমখানায় রেকর্ড সহায়তা করেছি। আপনারা আমাকে নির্বাচিত করলে আমি চেয়ারম্যানের ভাতাও আপনাদের মাঝে বিলিয়ে দিবো।’

রোববার (০৭ এপ্রিল) দুপুর থেকে রাত ৯ টা অবধি ত্রিশালের ঘটনা প্রবাহ ছিলো অন্যরকম। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন থেকে আসা মুষ্টিবদ্ধ হাত আর কন্ঠে নৌকার স্লোগান ধারণ করা প্রতিটি মিছিলে এক পর্যায়ে স্থানীয় ডিগ্রী কলেজ মাঠে আর তিল ধারণের ঠাঁই হলো না। কবিগুরুর ভাষায়-ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই….।

স্থানীয় নজরুল ডিগ্রী কলেজ মাঠে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ইকবাল হোসেনকে বিজয়ী করতে অনুষ্ঠিত এ কর্মী সমাবেশে নৌকার ঘাঁটিতে পুনরায় নৌকাভক্ত-অনুরক্তদের এমন স্বত:স্ফূর্ততায় গোটা ত্রিশাল যেন হয়ে উঠলো এক টুকরো গোপালগঞ্জ।

উপজেলার ধানীখোলা থেকে আসা এক প্রবীণ আওয়ামী লীগ কর্মীর স্বগতোক্তি এমন-‘ত্রিশালের মানুষ কখনো নৌকার সঙ্গে বেঈমানী করে না।

তাদের বুকে শেখ মুজিব আর কন্ঠে জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের স্লোগান। নৌকার এই দুর্গ গোপালগঞ্জ বা গফরগাঁওয়ের চেয়ে কম না। আবারো আমরা সেই প্রমাণই দিলাম।’

‘ত্রিশাল উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কম ষড়যন্ত্র হয়নি। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা কচুরিপানার মতে ভেসে যাবেন। শেষ হাসি হাসবেন ইকবালই’ মোক্ষপুর থেকে আসা এক নারী ভোটারের মন্তব্য ছিলো এমনই। কিন্তু এই ষড়যন্ত্রকারী কারা? কর্মী সমাবেশে আসা আব্দুল মোতালেব উত্তর দিলেন এই প্রশ্নের। তিনি বললেন, ‘নৌকা নিয়ে বারবার হেরেছেন। তৃণমূল থেকে জেলাতেও শীর্ষ পদে আসীন হয়েছেন। এরপরও তিনি সন্তুষ্ট নন। তাঁর আরো চাই চাই। এবার নৌকা না পেয়ে খেঁই হারিয়ে ফেলেছেন।

হায়ার করে আনা নেতাদের দিয়ে স্বয়ং জননেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধেই মিথ্যার বেসাতি করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু পাবলিক জানে, কে ভালো, কে মন্দ। তাঁরা ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমেই এই অপপ্রচারের জবাব দেবে।’
রোববারের (০৭) এই কর্মী সমাবেশটি কেমন ছিলো? মুগ্ধ হয়েই সেই জবাব সমাবেশেই দিয়ে গেছেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম.এ.কুদ্দুস। তিনি বলেছেন, ‘ আজকে হাজার হাজার মানুষ পঙ্গপালের মতো নৌকার জোয়ার তুলেছে। এই নির্বাচনে কেউ নৌকাকে ঠেকাতে পারবে না।’

প্রসঙ্গত, দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীর ছেলে ঋণখেলাপী হওয়ায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত করা হয় ত্রিশাল উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। গত ২৮ মার্চ উচ্চ আদালতের নির্দেশে ইসি নির্বাচন স্থগিত করে। শুরু হয় নতুন জল্পনা-কল্পনা।

সূত্র জানায়, আনারস প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল মতিন সরকারের ছেলে ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের (পদ্মা ব্যাংক) ময়মনসিংহ শাখা থেকে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ২০১৬ সালের ৭ আগষ্ট ২ কোটি টাকা ঋণ নেন। এই ঋণের জামিনদার হন তাঁর বাবা আব্দুল মতিন। গত বছরের ৭ আগষ্টের মধ্যে ঋণ পরিশোধের শর্ত থাকলেও তা পরিশোধ করেননি। ফলে সুদ আসলে ২ কোটি ২৯ লাখ ৮১ হাজার ২৯৭ টাকা হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে এই টাকা পরিশোধ না হওয়ায় ঋণ খেলাপীর অভিযোগ এনে গত ২০ মার্চ উচ্চ আদালতে রিট করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ইকবাল হোসেন। তাঁর করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রাথমিক শুনানির পর গত ২৭ মার্চ ছেলের ঋণ খেলাপীর দায়ে বাবা আব্দুল মতিন সরকারের প্রার্থীতা বাতিল ও চেয়ারম্যান পদে ৬ মাসের জন্য নির্বাচন স্থগিতের আদেশ দেন বিচারপতি মো: নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে উচ্চ আদালতের অবকাশকালীন বেঞ্চ। আদালতের রায়ের স্থগিতাদেশ চেয়ে গত ২৮ মার্চ আব্দুল মতিন সরকার চেম্বার জজ আদালতে বিচারপতি ইমাম আলী’র বেঞ্চে আবেদন করেন।

আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার (০৪ এপ্রিল) পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ শুনানির দিন ধার্য করে। দুই পক্ষের শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল মতিন সরকারকে বৈধ ঘোষণা করে আদালত। ফলে নির্বাচনে অংশ নিতে তাঁর বাঁধা কেটে যায়।

কর্মী সমাবেশে আনারস প্রতীকের প্রার্থীর এমন গোপনীয়তার কড়া সমালোচনা করেন প্রধান অতিথি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল। তিনি বলেন, এই বিষয়টি গোপন করে মতিন সরকার মনোনয়নপত্র বৈধ করেছিলো। পরবর্তীতে ব্যাংকে খোঁজ নেওয়া হলে দেখা যায় তিনি ঋণ খেলাপী। পরে ওই টাকা জমা দিয়ে আপিল করে মনোনয়নপত্র বৈধ করেছেন। শুরুতেই যে ব্যক্তি দুই নম্বরি ও গোপনীয়তার আশ্রয় নেয় তিনি চেয়ারম্যান হলে কী করবেন আপনারা ভেবে দেখবেন।’

উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক আলহাজ আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক আবুল কালামের পরিচালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আনোয়ার হোসেন, মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি এহতেশামুল আলম, জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক এম.এ কদ্দুস, কাজী আজাদ জাহান শামীম, শওকত জাহান মুকুল, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হাসান মাহমুদ প্রমুখ।

ব্রেকিং নিউজঃ