| |

আমাগো কেউ দেয় না

আপডেটঃ 3:01 pm | February 08, 2016

Ad

আলোকিত ময়মনসিংহ  : শঙ্খ চিলের ডানায় চড়ে আসা মুক্ত কণা বিকেলের সূর্যের আলোতে নৃত্য করছে পদ্মার জলে। সেই নৃত্য ঢেউ তুলেছে হৃদয়ের গহীনে। বাদ যাচ্ছে না ভাসমান যান ভাষা সৈনিক ডাঃ গোলাম মাওলা ফেরিতে থাকা শতরূপি মানুষের একটিও অন্তর।

ফেরি এগিয়ে চলেছে দৌলতদিয়া ঘাটের দিকে। ক্ষনিকের এই আবাস্থলে আপনার সামনেই ঘটে যেতে পারে নানা ঘটনা। হঠাৎ কানের কাছে বেজে উঠতে পারে হকারের চেনা সুর ‘এই…ঝাল মুড়ি-টকঝাল-ঝালমুড়ি, কিংবা এই আমড়া, আমড়া হবে আমড়া, তাজা আমড়া। হয়তো আপনার গায়ে হাত  রেখে কেউ বলে উঠবে ‘এই দে ১০টাকা দে হিজড়াদের দে… ৫ টাকা দিলে নিবো না ১০টাকা দিতে হবে হা’।

এমন হতে পারে, আপনার গাড়ির ভেতর থেকে কোনো এক অচেনা যুবক গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে সুর করে সাহায্য চাইছে। মায়ের কিডনি নষ্ট। তার হলদে চোখ, দাঁতে দাগ কাহিল দেহ বার বার মনে করিয়ে দেবে- নেশার জন্য কিছু টাকা যোগাড় করছে মায়ের চিকিৎসার কথা বলে। মাঝে মাঝে উৎসুক মানুষের মন কেঁদে উঠে ওদের এই আকুতিতে।

সব ঘটনা যেন একসঙ্গে বয়ে চলেছে পদ্মার জল কেটে। তার সঙ্গে ফেনা তুলে এগিয়ে চলেছে ভাষা সৈনিক গোলাম মাওলা ফেরি। ভাসমান ফেরিতে অনেক দিন ধরে অবস্থান করছে শিশু শুকুর আলী, বয়স সাত অথবা আট। বাবা-মা নেই বলে জানিয়েছে প্রথম দেখাতে। গ্রামের বাড়ির কথা জানতে চাইলে বলে, বহরপুর, রামদিয়া। অন্যান্য সঙ্গীসহ শুকুর আলী লোকের কাছে চেয়ে চেয়ে সারাদিনের খাবার কেনার টাকা জোগাড় করে। মাঝে মাঝে টাকার অভাবে না খেয়েই নাকি দিন কাটে ওদের। কথার এক পরতে জানা গেল, ‘ইচ্চে করে ইস্কুলে যাতি। দেকি কত মানুসেরে খাতি। কিন্তু আমাগোরে কেউ দেয় না’।

চোখের পলকে ফেরির অন্য প্রান্তে দৌড়ে চলে গেল শুকুর আলী। একটু পর হাতে ১০ টাকার একটা নোট নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে জানান দিল টাকাটা আমার, আমার টাকা… ১০ টাকা পাইছি ১০ টাকা। হাতে উচু করে ধরে রীতিমত একটা মিছিল করে চলেছে শুকুর আলী আর ওর অন্য বন্ধুরা। মনে হচ্ছে স্বর্গের সব আনন্দ ওর কাছে এসে ধরা দিয়েছে।

কিছু সময়ের মধ্যেই গোলাম মাওলা ফেরি তীরে এসে ভিড়লো। শুকুর আলীর দল ছুট দিল একটা টঙদোকানের দিকে।

এমন হাজার শুকুর আলীর বাস এদেশের ফুটপথ, ফেরি ঘাট, লঞ্চ ঘাট, রেল ষ্টেশন, বাস স্ট্যান্ড, মুক্ত উদ্যান কিংবা বস্তির ঝুপরি জনপদে। অবহেলিত এই শিশুর দল অনেকের চোখের কাটা কিংবা ঘৃণার বস্তু। টোকায় নামের বোঝা নিয়ে এগোতে হয় শত বাধা পেরিয়ে একমুঠো ভাতের আশায়। একটা ভালো জামা কিংবা প্যন্টের আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। তবু এদের মুখে হাসি ফিরে আসে, যখন শুকুর আলীর মতো ১০ টাকার একটা নোটের মালিক হয়।

ব্রেকিং নিউজঃ