| |

‘ব্রহ্মপুত্র সভ্যতা’-স্বাধীন চৌধুরী

আপডেটঃ ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ | মে ০১, ২০১৯

Ad

স্বাধীন চৌধুরী:  ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’, ‘বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে’

রবি ঠাকুরের এই কবিতায় তার ছোট বলার কোন এক উপনদী বা শাখা নদীর ক্ষীয়মান বাস্তবতা তুলে ধরেছিলেন। আজকের এই সময়ে আমাদের বাংলাদেশের প্রায় সব বড় নদ-নদী গুলোর অবস্থা এই কবিতার চরণের মতই জীর্ণ-শীর্ণ-শুকনো-খরা করুণ দশায় নিপতিত। নাব্যতাহীন নদীগুলোর প্রাণ যায় যায়। আমাদেও অস্বিত্বের নদ ব্রহ্মপুত্রের অবস্থাও করুণ। প্রাচীন কালের মহানদ ব্রহ্মপুত্র এখন জলশূন্য। ভরাট চরের বুকে সবুজ দূর্বাঘাসে গবাদী পশুর চারণক্ষেত্র। কোথাও সাদা-বালির ধুধু চর মরুময় চিকচিক করছে। কোন রূপোলী বালির উঁচু টিলাকে মনে হতে পারে মৃতপ্রায় চোখের গোলকে যেন এক বাঁচবার অসহায় আকুতি।

পৃথিবীতে সভ্যতার প্রকাশ-বিকাশ আর গড়ে উঠা নদী কেন্দ্রীক। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলা বদ্বীপ এর মানুষের জীবন যাত্রার ইতিহাস বিস্তৃত নদী কেন্দ্রীক এবং মহাকাব্যিক।

সংখ্যায় এত নদী আর কোন দেশে নেই। জালের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেমন সব দিকে নদী, তার মাঝে সবুজাভ দ্বীপমালা, সমতল মৃত্তিকায় জলের সাথে মানুষের জীবন প্রবাহ।

বাংলাদেশের নদী গননার সংখ্যার ইতিহাস নদীময়; ছোট-বড়, উপনদী, শাখানদী, সরু নদী মিলিয়ে দুই হাজার এর অধিক বলে জানা যায়। তাইতো এ দেশ নদীমাতৃক।

এতসব নদীর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র বড় নদ, পুরাণে কথিত মহানদ ব্রহ্মপুত্র। প্রাচীন নাম লৌহিত্য। ব্রহ্মপুত্র দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান প্রাচীন ও বৃহত্তম নদী।

অনুমান করা হয় আড়াই কোটি বৎসর আগে মধ্য মায়োসিন কালের প্রচন্ড গিরিজনির ফলে হিমালয়ের অভ্যুত্থান ঘটে। বলা হয়ে থাকে হিমালয়ের আগেও ব্রহ্মপুত্র প্রবাহিত ছিলো। যা প্রাগৌতিহাসিক মত।

হিমালয় পর্বতের কৈলাস শৃঙ্গে অবস্থিত হিমবাহ থেকে ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি। ‘ব্রহ্মপুত্র-মহাপুত্র মহাভাগো শান্তনু কুলনন্দন’- এ মন্ত্রটির মধ্য ব্রহ্মপুত্রের ইতিহাস আছে। ‘শান্তনু-পুত্র’ অর্থাৎ তিব্বতের শান-পো নদীর সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের সংযোগের ইতিহাস। ব্রহ্মপুত্র উৎপত্তিস্থল হতে শানপো নামে প্রায় বারো হাজার ফুট উঁচু মালভূমির উপর দিয়ে পূর্বদিকে প্রায় এক হাজার মাইল প্রবাহিত হবার পর দক্ষিণ দিকে ঘুরে ৪৪২ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত সাদিয়ার কাছে আসামে প্রবেশ করেছে। আসাম উপত্যকায় ডিহাং এবং পরে  ব্রহ্মপুত্র নামে পশ্চিম দিকে প্রায় ৪৫০ মাইল প্রবাহিত হবার পর  গারো পাহাড়ের কাছে দক্ষিণে বাঁক নিয়ে রংপুরের সীমানায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তারপর যমুনা নামে প্রায় ১৫০ মাইল দক্ষিণে প্রবাহিত হবার পর গোয়ালন্দের কাছে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই মিলিত স্রােত পদ্মা নামে চাঁদপুরের কাছে মেঘনায় এবং উক্ত তিনটি ধারা মেঘনা নামে বঙ্গপোসাগওে পতিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা দুই লক্ষ উনত্রিশ হাজার বর্গমাইল। তারমধ্যে চীনে (তিব্বত) ১ লক্ষ ১৩ হাজার বর্গমাইল,ভুটানে ২১ হাজার বর্গমাইল, ভারতে ৭২ হাজার বর্র্গমাইল এবং বাংলাদেশে ২৩ হাজার বর্গমাইল।

ব্রহ্মপুত্রের বহু উপনদী ও শাখা নদী রয়েছে। এত উপনদী ও শাখা নদী সমন্বয়ে গঠিত বলে  পানি নিষ্কাসনের ব্যাপকতার জন্য নদী বিজ্ঞানীরা এর নামের সাথে সিস্টেম আখ্যা জুড়ে দিয়েছেন। বাহাদুরাবাদের নিকট হতে ব্রহ্মপত্রের যে ধারাটি ময়মনসিংহের ভিতর দিয়ে দক্ষিণ পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে টোক হয়ে ভৈরব বাজারের নিকট মেঘনায় পড়েছে তাই আজ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নামে আখ্যায়িত।

ব্রহ্মপুত্র নদ দুই শত বছর আগেও বাহাদুরাবাদের নিকট থেকে এ পথে প্রবাহিত হতো। ১৭৮৭ সালে তিস্তায় প্রবল বন্যার ফলে ধীরে ধীরে ব্রহ্মপুত্র এর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে আজকের যমুনার পথে প্রবাহিত হতে থাকে। চিলমারী থেকে ভৈরব বাজার পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র ময়মনসিংহের ১২০ বর্গমাইল জায়গা দখল করে আছে।

অষ্টাদশ শতাব্দির শেষ ভাগে যমুনার উৎপত্তির পর ব্রহ্মপুত্র এর গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ায় প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র তার বিশালত্ব হারিয়েছে। ১৮৬৬ সালে  ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর এইচ. জে. রেনল্ডস বলেছিলেন, দশ বৎসর পূর্বে আমি ব্রহ্মপুত্রের যে অবস্থা দেখেছিলাম বর্তমান অবস্থা তার চেয়ে আরো শোচনীয়। আমার বিশ্বাস এমন অবস্থা ২৫ বছর চললে ব্রহ্মপুত্র নিশ্চয়ই একটি অদৃশ্য সুতার আকার ধারণ করবে। সে অনুমান বর্তমানে প্রতিফলিত

হয়েছে। তিনি আরো বলেছিলেন, যদি উজানের বালির বাঁধ সরে গিয়ে যমুনায় প্রবাহিত স্রােত ব্রহ্মপুত্রের খাতে প্রবাহিত হয়তাহলে ব্রহ্মপুত্র বিশালতা প্রাপ্ত হতে পারে। ১৮৫০ সালের জরীপ নকশায় দেখা যায়,  ব্রহ্মপুত্র নদ এই জেলার ১৩৩২০ একর ৩ রোড ২৬ পোল জমি অধিকার করে আছে। এর মোট আয়তন ২০৮১ বর্গমাইল।

বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে পৃথিবীর সকল নদী সংকটাপন্ন। সচেতন দেশগুলোতে নদী বাঁচাতে পরিকল্পনা ও উদ্যোগ আছে।  আছে তার বাস্তবায়ন। ভারতবর্ষের নদীগুলো মরণদশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নদীর হিস্যা নিয়ে আন্ত:দেশীয় সংকট,নদীর জল বন্টন নিয়ে সংকট এবং নদীর বুকে বাঁধ দিয়ে নদীকে যেমন সংকোচিত করা হচ্ছে  তেমনি সাময়িক সুবিধার পাশাপাশি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সংকট আরো দীর্ঘতর হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা জুড়ে যে জনপদ সবাই তার সুফলভোগী। কিন্তু আজ ব্রহ্মপুত্রের শুকিয়ে যাওয়া, ভরাট হয়ে যাওয়া, নদী দখল, নদী দূষণ, বাঁধ দিয়ে নদীর নাব্যতারোধ- এসব কিছুই ব্রহ্মপুত্রের ধ্বংসের পথ তৈরী করছে। নদী কেন্দ্রীক মানুষের জীবন-জীবিকার যে সংস্কৃতি,তাও আজ হারাবার পথে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে জলের স্তর নেমে যাচ্ছে।  সেচ-কৃষিতে নেমে আসছে ধস॥ সূদুর প্রসারী সুপেয় জলের স্তর সকল নদীর মত ব্রহ্মপুত্রের অতলেও নেমে যাচ্ছে॥

নদী খননই নদী বাঁচাবার শেষ কথা নয়। বিশ্ববাস্তবতার পরিবেশের আলোকে সকল নদীরই দুর্দশা। তাহলে কী এই গ্রহের  নদীরা  শুকিয়ে যাবে, একদিন কী মরে যাবে সকল নদী। তাহলে মানব সভ্যতার কী হবে। এসব প্রশ্ন আজকের আধুনিক বিজ্ঞান সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সেই সাথে মানুষের সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে করনীয় সম্পর্কেও নির্দেশনা দিচ্ছে। আমাদের হাজার বছরের ব্রহ্মপুত্রের সভ্যতা আমাদেরকে উপনীত করেছে একুশ শতকের বিশ্বভাতৃত্বে। আর সভ্যতাকে এগিয়ে দিয়ে সেই ব্রহ্মপুত্র হয়েছে ম্রীয়মান। আমাদের দেশে প্রবাহিত সকল নদীর উৎসস্থল হিমালয় উপত্যকা। উৎসস্থলের দেশগুলো ভারত, চীন, ভুটান, নেপাল। উজান দেশের বাঁধগুলো হয়েছে ব্রহ্মপুত্রের কাল। সেই সাথে  অসম পানি বন্টন নদীকে করেছে পানিশূন্য। আর ব্রহ্মপুত্রের দীর্ঘযাত্রার ইতিহাসে নদী উন্নয়নে গ্রহন করা হয়নি কোন উন্নয়ন প্রকল্প । খনন হয়নি আজও পলি পড়া বালির চরগুলো। সারাদেশের সকল নদীর ন্যায় ব্রহ্মপুত্রও নানারকম কল-কারখানার দূষণে এবং মানুষের ব্যবহৃত ময়লা আবর্জনার একমাত্র ক্ষেত্র হয়েছে নদী। অতিরিক্ত পলিথিন ব্যবহারের ফলে নদীর পানি পরিবেশ ও জলজ জীবের বিনাশ হয়েছে বহুগুণ। ভূমিদস্যুরা প্রতিনিয়ত নদী দখল করছে নানা কায়দায়। কোনকিছুই দেখার যেন কেউ নেই। পরিবেশবাদী সমাজ সচেতন নাগরিক ও উন্নয়ন সংগঠন সময় সময় কথা বলে  ব্রহ্মপুত্র নিয়ে। কখনও মানববন্ধন করে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে স্মারকলিপি দেয়। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র বাঁচাবার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ-পরিকল্পনা দাঁড়ায় না। সাম্প্রতিক কালে গণমাধ্যমের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে পরিবেশ ও নদী গ্লোবাল ইস্যু হওয়ায় বাংলাদেশের নদ-নদী নিয়ে নানা খবর আমরা দেখছি। ব্রহ্মপুত্র সম্পর্কেও গণমাধ্যমে অল্পবিস্তর উঠে এসেছে। আপাতত ব্রহ্মপুত্র বাঁচাতে মুখ্য উদ্যোগ আশু নদী খনন এবং বিস্তৃত নদীর ভূমি রক্ষায় সাঁড়াশি অভিযান। নদী দূষণ রুখতে প্রয়োজন সরকারি নীতিমালার প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। জাতীয় নদী কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা গ্রহন জরুরী। আন্তর্জাতিক নদী কমিশন এর সাথে আন্ত:রাষ্ট্রীয় বৈঠকের মাধ্যমে নদী রক্ষার সময়োপযোগী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বরতে হবে।

ব্রহ্মপুত্রের উৎস-প্রাণ যেখানে- ভারত-চীনের সাথে অধিকার আদায়ের কার্যকরী উদ্যোগ তরান্বিত করতে হবে। প্রয়োজনে আন্ত:র্জাতিক আদালতের স্মরনাপন্ন হতে হবে। বর্তমান সরকারের সমুদ্র সংক্রান্ত  অধিকার আদায় আমাদের নদীগুলোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে উদারহরণ হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন দেশপ্রেম, আন্তরিক উদ্যোগ, দৃঢ় চেষ্টা।

ব্রহ্মপুত্র আমাদের অস্তিত্ব। এ নদী আমাদের প্রাণ। জীবন-জীবিকা-সংগ্রাম-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি  সকল কিছুতেই  মিশে আছে সারাক্ষণ। লোকগাঁথা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের সাহিত্যে ব্রহ্মপুত্র নানাভাবে উঠে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ উপন্যাস ও কাব্যে লিখেছেন ব্রহ্মপুত্র নিয়ে। কালের সেরা চিত্রশিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন এই ব্রহ্মপত্র পাড়ে বসে এঁকেছেন ব্রহ্মপুত্র-জীবনকথা। কথা শিল্পী আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর উপন্যাসে ব্রহ্মপুত্রকে যেন এঁকেছেন। কবি ও কথাশিল্পী কাজল শাহ্নেওয়াজ ব্রহ্মপুত্রের বুকে চষে বেড়িয়ে লিখেছেন ‘কাছিমগালা’। আজকের সাহিত্যজন’রা লিখছেন কত লেখা,কত কবিতা, কত কী। সব কিছুই তো ব্রহ্মপুত্রকে ভালবেসে। ব্রহ্মপুত্র বেঁচে থাকলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার জনজীবন বেঁচে থাকবে সস্তিতে। ইউফ্রেটিস-ট্রাইগ্রীস-হোয়াংহো-নীলনদ কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতা। নদীর নামে সে সকল সভ্যতার পরিচিতি। ব্রহ্মপুত্র নদ আমাদের সভ্যতা, সভ্যতার স্রােতধারা। ব্রহ্মপুত্র বাঁচাবার সংগ্রাম রাষ্ট্রের। ব্রহ্মপুত্র বাঁচাবার আমাদের।