| |

বারবার দুর্ঘটনার পরও বিমান বহরে ড্যাশ-৮

আপডেটঃ ১২:০৪ অপরাহ্ণ | মে ০৯, ২০১৯

Ad

কানাডার বোমবারডিয়ার কোম্পানির তৈরি ড্যাশ-৮ মডেলের উড়োজাহাজের ভাগ্য এ দেশে খুব একটা ভালো নয়। বিশ্বব্যাপী ছোট এয়ারক্রাফট হিসেবে ড্যাশ-৮ এর খ্যাতি থাকলেও বাংলাদেশে প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে এই মডেলের উড়োজাহাজ। সেটি জাতীয় পতাকাবাহী বাংলাদেশ বিমানই হোক বা বেসরকারি অন্য কোনো বিমান সংস্থারই হোক না কেন। কখনো আকাশ পথে এর চাকা খুলে যায়, কখনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা যায়, আবার বিধ্বস্ত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

গত বছরের ১২ মার্চ নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউ এস বাংলার যে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয় ,সেটি ছিল এই ড্যাশ-৮ মেডেলের। ওই দুর্ঘটনায় ৭১ জন আরোহীর মধ্যে ৫১ জন নিহত হন। যার মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশি ছিলেন। সবশেষ গতকাল মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে বাংলাদেশ বিমানের ওই মডেলের একটি বিমান ছিটকে পড়ে রানওয়েতে। প্রাণে বেঁচে যান বিমানের ৩৩ জন আরোহী। তবে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৪ জন।

২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর ড্যাশ-৮ মডেলের উড়োজাহাজ নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের ৫ ক্রুসহ ৭১ জন আরোহীর একটি ফ্লাইট অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিল। ওই দিন সকাল সাড়ে ৯টায় সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয় বিমানের ফ্লাইটটি। উড্ডয়নের পর ছয় হাজার ফুট ওপরে উঠলে ড্যাশের একটি চাকা খুলে যায়। পরে চাকা খোলা অবস্থায় বিমানটি ঢাকার দিকে রওনা হয়। পাইলট মোহাম্মদ আতিকুর রহমান ও ফার্স্ট অফিসার সারফারাজ ইয়ামিনের দক্ষতায় সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান যাত্রীরা।

এরপর পাইলট আতিকুর রহমান বলেন, বিমানটির ডান দিকের একটি চাকা খুলে গিয়েছিল। তারা জরুরি অবতরণ করেন। এ বছরের ৩১ মার্চ ড্যাশ-৮ এর একটি বিমান সিলেট থেকে ঢাকায় রওনা দেয়। কিছুক্ষণ পরই চাকায় ত্রুটি টের পান পাইলট। বিকেল চারটার দিকে শাহজালাল বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেন তিনি।

এতগুলো দুর্ঘটনা তারপরও বাংলাদেশ বিমানে যোগ হতে যাচ্ছে নতুন ড্যাশ-৮ মডেলের আরও তিনটি উড়োজাহাজ।

বাংলাদেশ বিমানের বহরে এখন ৩টি ড্যাশ-৮ মডেলের বিমান রয়েছে। বোমবারডিয়ার ড্যাশ-৮ হল দুইটি টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন বিশিষ্ট মাঝারি পাল্লার বিমান। ১৯৮৪ সালে ডি হ্যাভিল্যান্ড কানাডা সর্বপ্রথম বিমানটি তৈরি করলেও বর্তমানে বোমবারডিয়ার অ্যারোস্পেস এর উৎপাদন করে চলেছে। এ পর্যন্ত ১ হাজার ২০০টির মতো ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ নির্মাণ করা হয়েছে। মিসরের স্মার্ট এয়ার থেকে ‘ড্রাই লিজ’ পদ্ধতিতে ৭৪ আসনের টার্বো-প্রপেলার উড়োজাহাজ দুটি ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে বিমান বহরে আসে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি করা হয়। ২০১৫ সালের আগে বাংলাদেশ বিমানের অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল বন্ধ আছে। এই বিমান দুটি আনার পরই অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়। পরে গত বছর বিমান বহরে যুক্ত হয় আরও একটি ড্যাশ-৮।

প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এগুলো বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটে। ফ্লাইট শিডিউল এলোমেলো হয়ে যায়। দুই বছর আগে রোজার ইদের সময় বাংলাদেশ বিমানের একটি ড্যাশ-৮ বিকল হয়ে যায়। সে সময় অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহনের সমস্যা দেখা যায়। ফ্লাইট শিডিউল এলোমেলো হয়ে যায়। অভ্যন্তরীণ রুটে বেশ কয়েকটি ফ্লাইটের শিডিউল পরিবর্তন করা হয়। তবে এই ড্যাশ মডেলের উড়োজাহাজ দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইট পরিচালনা করা হয় দেশের অভ্যন্তরে সব বিমানবন্দরে। এ ছাড়া ভারতের কলকাতা, নেপাল, মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন এই তিনটি রুটেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ড্যাশ-৮ মডেলের বিমান ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ বিমানের বহরে যে ড্যাশ-৮ গুলো আছে, এগুলোতে উঠতে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। এগুলোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করে না। অবতরণের সময় বেশ ঝাঁকুনি হয়, বাম্পিংও হয়। তাঁদের ধারণা, এগুলো পুরোনো মডেলের উড়োজাহাজ। এগুলো লিজে আনা হয়েছে। এগুলোর মান খুব একটা ভালো না। সেবা নিয়ে যাত্রীরাও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিমান বহরে বোয়িং ৭৩৭ মডেলের চারটি উড়োজাহাজের দুটি লিজে আনা হয়। এই দুটোর মানও খুব খারাপ। এগুলোরও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করে না। অনেক সময় এসি বেশি ঠান্ডা হয়, অনেক সময় গরম বাতাস দেয়। এরপরও বিমান নতুন তিনটি ড্যাশ-৮ কিনছে। এগুলো একেবারে কিনেই আনা হচ্ছে।

গত বছরের জুলাই মাসে কানাডার সরকারের প্রতিষ্ঠান বোমবারডিয়ার ইনকরপোরেশনের সঙ্গে তিনটি ড্যাশ-৮ ক্রয়ে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি হয়। এগুলো খুব শিগগিরই বিমান বহরে যুক্ত হবে।

পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ বিমানের অবসরপ্রাপ্ত বৈমানিক মোহাম্মদ নাসিমুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ড্যাশ-৮ এর বেশ কুখ্যাতি আছে বিশ্বব্যাপী। কিন্তু আমাদের দেশে দুর্ঘটনা ঘটার কারণ হলো তিনটি। এক. আমাদের কপার খারাপ। দুই. এই বিমানগুলো যারা পরিচালনা করেন তাঁদের প্রফেশনালিজম, ট্রেনিং দেওয়ার যে ব্যবস্থা তা আমাদের হয় না। তিন.আমাদের রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি। এসব কারণেই ড্যাশ এইট দুর্ঘটনায় পড়ে।

গতকাল মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরের রানওয়েতে ছিটকে পড়া বিমানের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক শাকিল মেরাজ (জনসংযোগ) প্রথম আলোকে বলেন, এটার জন্য প্রকৌশলীরা বিশেষ ফ্লাইটে গতকাল ইয়াঙ্গুন গেছেন। এবং তারা পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেছেন। এরপরই বলা যাবে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বিমান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন সম্ভবত এটি দিয়ে আর ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখে বোঝা গেছে এর সামনের অংশও ভেঙে গেছে। এবং পেছনের অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ব্রেকিং নিউজঃ