| |

সাকিবের মত খেলোয়াড় দশ হাজার বছরে একবার জন্ম নেয়ঃ সৌরভ গাঙ্গুলি

আপডেটঃ ৬:০১ অপরাহ্ণ | জুন ২৫, ২০১৯

Ad

সাকিবের মত খেলোয়াড় – বলা হচ্ছিল আফগানিস্তান বলেই বেশি সতর্ক বাংলাদেশ। এ ছাড়া শেষ ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে তাদের বোলিং সাফল্যও চোখ রাঙাচ্ছিল। বিশেষ করে আফগানদের স্পিন আক্রমণ নিয়ে না ভেবে উপায় ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ যেন কাটা দিয়েই কাটা তুললো। স্পিন বনাম স্পিনের লড়াইয়ে রাজত্ব করলো বাংলাদেশ। যেখানে সেনাপতির ভূমিকায় থাকলেন ম্যাচসেরা সাকিব আল হাসান।

ব্যাট হাতে বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় হাফ সেঞ্চুরি করার পর বল হাতে জাদু দেখালেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। আফগানদের ব্যাটিং লাইন আপ লণ্ডভণ্ড করে মাত্র ২৯ রান খরচায় একাই তুলে নিলেন ৫ উইকেট। তাঁর এমন চোখ জুড়িয়ে দেয়া পারফরম্যান্সে বাংলাদেশও ম্যাচ জিতল দাপটের সঙ্গে। বিশ্বকাপে নিজেদের সপ্তম ম্যাচে আফগানিস্তানকে ৬২ রানে হারিয়ে আরেক সিড়ি উপরে উঠলো বাংলাদেশ।

দারুণ এই জয় তুলে নেয়ার ম্যাচে টসভাগ্য বাংলাদেশের পক্ষে আসেনি। টসে হেরে আগে ব্যাটিং করতে নেমে সাকিবের ৫১ ও মুশফিকর রহিমের ৮৩ রানে ৭ উইকেটে ২৬২ রান তোলে বাংলাদেশ। জবাবে ৪৭ ওভারে ৪৭ উইকেটে ২০০ রানেই শেষ হয় এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে জয়হীন থাকা আফগানিস্তানের ইনিংস। এই জয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার পাঁচ নম্বরে উঠলো বাংলাদেশ। বাকি থাকা দুই ম্যাচে ভারত ও পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে মাশরাফি বিন মুর্তজার দল।

জয়ের লক্ষ্যে ব্যাটিং করতে নেমে অতি সাবধানী শুরু করে আফগানিস্তান। প্রথম ১০ ওভার এভাবেই পার করে তারা। ১০ ওভার পার হওয়ার পর খোলস ভেঙে বেরোতে চেয়েছে তারা। তবে তাতে বিপদে পড়তে হয়েছে আফগানদের। ওপেনার রহমত শাহ বাংলাদেশ অলরাউন্ডার সাকিবের প্রথম শিকারে পরিণত হয়ে ফিরতেই এলোমেলো হয়ে পড়ে আফগানদের ইনিংস।

সেই এলোমেলো ইনিংসে দ্বিতীয় আঘাতটি হানেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। হাসমতউল্লাহ শহীদিকে ফিরিয়ে আফগানিস্তানকে আরও চাপে ফেলেন দেন ডানহাতি এই অফ স্পিনার। এই চাপে দিশেহারা হয়ে ওঠে আফগানরা। এসময় রান তোলার গতিও একেবারে কমে যায় তাদের। ২৮ ওভারে ১০৪ রান যোগ হয় আফগানদের স্কোরকার্ডে।

সুযোগ বুঝে সাকিব তাঁর স্পিন গোলা নিক্ষেপ করতে থাকেন প্রতিপক্ষ শিবিরে। আর টপাটপ তুল নিতে থাকেন উইকেট। ১০৪ রানের মাথায় এক বলের ব্যবধানে আফগান অধিনায়ক গুলবাদিন নাইব ও মোহাম্দ নবিকে ফিরিয়ে দেন সাকিব। ৪৭ রান করা গুলবাদিনের উইকেট নিয়ে বিশ্বকাপে অনন্য এক রেকর্ড গড়ে ফেলেন বাঁহাতি এই স্পিনার। বিশ্বকাপে একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে সাকিব এখন ১০০০ রান ও ৩০ উইকেটের মালিক।

১০৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে মহা বিপদে পড়ে যাওয়া আফগানদের বিপদ আরও বাড়িয়েছেন সাকিবই। ২০ রান করা আজগর আফগানকেও নিজের শিকারে পরিণত করেন প্রতি ম্যাচেই দ্যুতি ছড়িয়ে যাওয়া সাকিব। এরপর ইকরাম আলিখিলকে সাজঘরে ফেরেন রান আউট হয়ে। তবু জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। কারণ জুটি বেঁধে তোলেন সামিউল্লাহ শিনওয়ারি ও নাজিবুল্লাহ জাদরান।

এই জুটি বেশ ছন্দেই দরকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। বাংলাদেশ শিবিরে যখন চিন্তার ছাপ, তখন আবারও ত্রাতার ভূমিকায় সাকিব। ২৩ রান করা নাজিবুল্লাহকে ফিরিয়ে বাংলাদেশের প্রথম বোলার হিসেবে বিশ্বকাপে ৫ উইকেট পূর্ণ করেন সাকিব। যা তাকে জায়গা করে দেয় ভারতের কিংবদন্তি কপিল দেব ও যুবরাজ সিংয়ের পাশে। সাকিব তৃতীয় অলরাউন্ডার, যে কি না বিশ্বকাপের একই আসরে সেঞ্চুরি ও ৫ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখালেন।

শেষের কাজটা করেছেন মুস্তাফিজুর রহমান। নিজের করা টানা দুই ওভারে রশিদ খান ও দওলত জাদরানকে ফিরিয়ে দেন বাঁহাতি এই পেসার। তবে একপাশ আগলেই রাখেন আফগান অলরাউন্ডার সামিউল্লাহ শিনওয়ারি। শেষ পর্যন্ত ৪৯ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। ১০ ওভারে মাত্র ২৯ রান খরচায় ৫ উইকেট নেন ম্যাচসেরা সাকিব। এ ছাড়া মুস্তাফিজ ২টি এবং মোসাদ্দেক ও সাইফউদ্দিন একটি করে উইকেট নেন।

এরআগে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশকে চেপে ধরেছিল আফগান জুজু। বিশেষ করে ওপেনার তামিম ইকবালকে। আফগান স্পিনার মুজিব উর রহমানকে দেখলেই যেন পিলে চমকে যায় তামিমের! তাই আগের কয়েকবারের মতো এবারো মুজিবকে এড়িয়ে গেছেন তিনি। ইনিংসের প্রথম বল মোকাবেলা করেছেন সৌম্য সরকারের জায়গায় ব্যাটিং করতে নামা লিটন দাস।

আফগানিস্তানের স্পিন আক্রমণের কথা মাথায় রেখে বাঁহাতি-ডানহাতি সমন্বয়কে বেছে নেয় বাংলাদেশ। যে কারণে সৌম্যর বদলে তামিমের সঙ্গে ইনিংস উদ্বোধন করতে যান লিটন। তামিম ভয় পেলেও লিটনকে সাবলীলই দেখাচ্ছিল। স্বাভাবিক খেলাই খেলছিলেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। কিন্তু যার ভয়ে তামিম প্রথম বল মোকাবেলা করেননি, সেই মুজিবের স্পিন ঘূর্ণিতেই থামতে হয় লিটনকে।

১৭ বলে ১৬ রান করে ফিরে লিটন ফিরলেও দলকে বিপদে পড়তে হয়নি। তামিমের সঙ্গে জুটি বেঁধে তোলেন জাদুর বাক্স নিয়ে বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া সাকিব আল হাসান। ৫৯ রান যোগ করে দলকে প্রাথমিক চাপ থেকে মুক্ত করেন তাঁরা। আগের ম্যাচগুলোর মতো ধীর গতিতেই ব্যাটিং করা তামিম এদিনও ইনিংস বড় করতে পারেননি। ৫৩ বলে ৩৬ রান করে মোহাম্মদ নবীর বলে বোল্ড হন তিনি।

তামিম ফেরার পর বাংলাদেশ তাদের ইনিংসের সবচেয়ে বড় জুটিটি পায়। সাকিবের সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে বাংলাদেশকে এই স্বস্তি এনে দেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকানো মুশফিকুর রহিম। এর মাঝে চলতি বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন সাকিব। যদিও এরপর সাজঘরে ফিরতে হয় তাকে। ফেরার আগে ৬৯ বলে ৫১ রানের ইনিংস খেলেন সাকিব। এই ইনিংস দিয়ে বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে বিশ্বকাপে ১ হাজার রান পূর্ণ করেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার।

পাঁচ নম্বরে ব্যাটিং করতে নেমে দলের হয়ে ব্যাট চালাতে পারেননি ওপেনার সৌম্য সরকার। মাত্র ৩ রান করেই মুজিবের তৃতীয় শিকারে পরিণত হয়ে ফিরে যান বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। সাকিব ও সৌম্যকে দ্রুত হারিয়ে বিপাকেই পড়তে হয় বাংলাদেশকে। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ গিয়ে সেই বিপদ কাটিয়ে তোলেন। এ সময় মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ রানের গতিও বাড়িয়ে নেন।

এই ধারায় বেশিক্ষণ থাকা হয়নি বাংলাদেশের। ২৭ রান করে সাজঘরের পথ ধরেন মাহমুদউল্লাহ। বাকিটা সময় ব্যাট চালিয়েছেন মুশফিক ও মোসদ্দেক হোসেন সৈকত। এই জুটিই মূলত বাংলাদেশকে ২৬২ রানে পৌঁছে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের ইনিংসে যে নামটি সবচেয়ে বড়, সেটি হলো মুশফিক।

দলের দুঃসময়ে হাল ধরে ৮৭ বলে ৪টি চার ও একটি ছক্কায় ৮৩ রানের মহা কার্যকর এক ইনিংস খেলেন উইকেটরক্ষক এই ব্যাটসম্যান। আর শেষের দিকে ২৪ বলে মোসাদ্দেকের করা ৩৫ রান বাংলাদেশকে এনে দেয় ২৬২ রানের মতো লড়াকু পুঁজি। আফগানিস্তানের হয়ে সর্বোচ্চ ৩টি উইকেট নেন মুজিব। এ ছাড়া গুলবাদিন নাইব ২টি এবং দওলত জাদরান ও মোহাম্মদ নবী একটি করে উইকেট নেন।

সাকিব সম্পর্কে সৌরভ গাঙ্গুলি একবার বলেছিলেন, শচীন টেন্ডুলকার কিংবা জ্যাক ক্যালিসের মত খেলোয়াড় ১০০ বছরে একবার জন্ম নেয়, আর সাকিব আল হাসানের মত খেলোয়াড় দশ হাজার বছরে একবার জন্ম নেয়…

২০১৫ বিশ্বকাপে যখন অস্ট্রেলিয়ার এক ছেলেকে প্রশ্ন করা হয় তুমি বড় হয়ে কোন ক্রিকেটারের মতো হতে চাও? উত্তরে সে তখন বলেছিলো আমি সাকিব আল হাসানের মতো হতে চাই। অস্ট্রেলিয়ার এতো বড় বড় তারকা থাকতে তার কাছে সাকিব আল হাসানকেই পছন্দ হয়েছে।