| |

তিন সিটি ভোটে অংশ নেবে বিএনপি

আপডেটঃ ২:১৯ অপরাহ্ণ | জুলাই ০২, ২০১৯

Ad

আগামীতে স্থানীয় সরকারসহ সব নির্বাচনেই অংশ নেবে বিএনপি। দলের হাইকমান্ড এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে ‘সন্ত্রাসী’ দলের তকমা মুছতে গণতন্ত্রের দায়বদ্ধতা থেকেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলের সিনিয়র একাধিক নেতা জানান, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ন্যূনতম স্পেস তারা পাচ্ছেন না। সেক্ষেত্রে নির্বাচনই একমাত্র ইস্যু হতে পারে। নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা রাখার পাশাপাশি মাঠে সক্রিয়ও করা হবে ভোটের রাজনীতিতে। তাই সামনে যত প্রতিকূল পরিবেশই আসুক, সব নির্বাচনেই অংশ নেবে দলটি। এ ছাড়া নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনে বিশ্বাসী বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে সামনে একসঙ্গে ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর, ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও অংশ নেবে দলটি। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল প্রথমবারের মতো ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একই দিনে ভোট হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেও। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে ভোট করতে হবে। সে হিসেবে আগামী নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যেই তিন সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির সিনিয়র একাধিক নেতা জানান, নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে মাঠে হয় কর্মসূচি থাকবে, নয়তো ভোটের রাজনীতি থাকতে হবে। যেহেতু এখন কর্মসূচি নেই, তাই নির্বাচনের মাঠে থাকাই শ্রেয়। তাই সামনে স্থানীয় সরকারসহ সব ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তও সঠিক ছিল না। কারণ, গণহারে বহিষ্কারের পরেও অনেক তৃণমূল নেতাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে আনা যায়নি। যেহেতু সংগঠনকে শক্তিশালী করে জাতীয় নির্বাচনের দাবি আদায়ে আন্দোলনে যেতে হবে, তাই নির্বাচন বর্জন করে সংগঠনকে দুর্বল করার সিদ্ধান্ত আর বিএনপি নিতে চায় না। ভোটে বিজয়ী হলে ভালো না হলে ভোট ডাকাতি বা কারচুপির অভিযোগের ইস্যু নিয়েও রাজনীতি করা যায়। এতে তৃণমূলের হাতে ইস্যু তুলে দেওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা এখন দল গোছানোর কাজ করছি। ঢাকাসহ তিন সিটি নির্বাচনের এখনো অনেক দেরি। এ ব্যাপারে দলীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে বিএনপি গণতান্ত্রিক দল। সব সময় গণতন্ত্র ও নির্বাচনের পক্ষে। কিন্তু সরকার যেভাবে ভোট ডাকাতি করে জনমত ছিনিয়ে নিচ্ছে তাতে ভোটের প্রতি মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তবে আমরা সিটি নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করছি। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে প্রায় এক যুগ মেয়র ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা। অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। এরই মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। দুই ভাগে প্রথম এ সিটি নির্বাচনে অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। এবার তার নির্বাচন করার সম্ভাবনা কম। সেক্ষেত্রে ঢাকা সিটি দক্ষিণে খোকার ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন খোকা বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হতে পারেন। এর আগে সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের  স্বার্থে তিনি আর নির্বাচনে অংশ নেননি।  এ প্রসঙ্গে ইশরাক হোসেন খোকা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি নির্বাচনে লড়ব। আমার বাবা অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। আমিও প্রকৌশলী। ঢাকার যানজট নিয়েও পড়াশোনা করেছি। তাই বাবার পাশাপাশি আমার অভিজ্ঞতাকেও আমি কাজে লাগাতে পারব।’ ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা সিটি উত্তরের ভোটে অংশ নিয়েছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনিসুল হক বিজয়ী হয়। আড়াই বছর পর মারা যান আনিসুল হক। এরপর ওই আসনে উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তাবিথ আউয়াল অংশ নিয়েও পরে বর্জন করেন। আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে তাবিথ আউয়াল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দল নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা জানি না। অংশ নিলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত নেব।’ একই সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম। তিনি আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাও হন। কিন্তু নির্বাচনের দিন সকাল ১০টায় দলের নির্দেশে ভোট বর্জন নিয়ে তাকে সংবাদ সম্মেলন করতে হয়। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন তিনি। কিন্তু বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত মানতে তিনি বাধ্য ছিলেন। এ কারণে পরে তিনি বিএনপির সব পদ থেকে পদত্যাগ করেন। আগামীতে এই সিটিতে বিএনপি নতুন প্রার্থীর চিন্তাভাবনা করছে। সেক্ষেত্রে মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হতে পারেন। এ ছাড়াও মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসেম বক্কর ও কারাগারে থাকা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর নামও আলোচনা আছে বিএনপির ভিতরে-বাইরে। জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সব নির্বাচনই বর্জনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএনপি। সেই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে সম্প্রতি শেষ হওয়া ৪৭০টি উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। কেন্দ্রের এ সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে শতাধিক নেতা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। দল থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু অবস্থান পরিবর্তন করে দলীয় সিদ্ধান্তে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ীরা এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর, বিএনপি সবকিছুই নতুন করে ভাবছে। বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে দলটি অংশ নিয়ে জিতেছে। বিএনপির নেতারা বলছেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর সব কিছুই তাদের নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে বিএনপিকে একটি ‘সন্ত্রাসী’ দল হিসেবে চিহ্নিত করতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ উঠেপড়ে লেগেছে। অনেকাংশে সফলও হয়েছে। এই তকমা মোছা অনেক কঠিন। এ ছাড়া বিএনপি একটি উদারপন্থি গণতান্ত্রিক দল। গণতান্ত্রিকভাবে সরকারের পরিবর্তন হতে পারে শুধু ভোটের মাধ্যমেই। সামগ্রিকভাবে চিন্তাভাবনা করেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিএনপি ভোটে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। বিএনপি নেতারা এও বলছেন, নির্বাচনে জয়-পরাজয় দুটোতেই বিএনপির লাভ। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ভোট হলে বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে। নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলের সাংগঠনিক শক্তিকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাওয়া যাবে। নির্বাচনকে  কেন্দ্র করে নেতা-কর্মীরা সাধারণ মানুষের (ভোটারদের) কাছে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তাদের মধ্যে একটা চাঙ্গাভাব ফিরে আসবে।

অনিয়ম চ্যালেঞ্জ করে শেষ পর্যন্ত এসব নির্বাচনে জয় পেলে নেতা-কর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়বে। অন্যদিকে সরকারের দখলদারি মানসিকতারও উন্মোচন হবে। পরাজিত হলে এ ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলন বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি আদায়ের আন্দোলন আরও গতিশীল করতে পারবে।