| |

চামড়াশিল্পে বাংলাদেশের ব্যর্থতার সুযোগ নিচ্ছেন চীনারা

আপডেটঃ ১২:৫৮ অপরাহ্ণ | আগস্ট ২০, ২০১৯

Ad

মাস ছয়েক আগে এক চীনা ক্রেতার কাছ থেকে ইকবাল ব্রাদার্স ট্যানারি ৬০ হাজার বর্গফুট ফিনিশড চামড়ার ক্রয়াদেশ পায়। তখন সেই ক্রেতা প্রতি বর্গফুট চামড়ায় এক ডলার দিতে চেয়েছিলেন। তবে প্রক্রিয়াজাত শেষে চামড়ার পুরুত্ব কম, এমন অজুহাত দেখিয়ে চীনা ক্রেতা সেই ক্রয়াদেশ বাতিল করেন। পরে আরেক চীনা ক্রেতা প্রতি বর্গফুটে ৭০ সেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রস্তাবিত দাম কম হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই ক্রেতার কাছে চামড়া বিক্রি করেননি ইকবাল ব্রাদার্স ট্যানারির স্বত্বাধিকারী মো. শামসুদ্দিন। তিনি বলেন, চীনা ক্রেতারা দিনকে দিন চামড়ার দাম কম প্রস্তাব করছেন। অবস্থা এমন হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও উঠছে না। বর্তমানে কারখানায় প্রায় দুই কোটি টাকার চামড়া মজুত রয়েছে।

সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্প নগরের কর্মপরিবেশ উন্নত না হওয়ায় ইউরোপের বড় ক্রেতারা সরাসরি চামড়া কিনছেন না। এর ফলে চীনারা এ শিল্পের মূল ক্রেতা হয়ে উঠেছেন। তবে সুযোগ বুঝে তাঁরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ট্যানারিমালিকদের অনেকটা জিম্মি করে ফেলেছেন। ক্রয়াদেশ দেওয়া ও তারপর নানা অজুহাতে সেই ক্রয়াদেশ বাতিল এবং দাম কমানোর ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত শনিবার বেশ কয়েকজন ট্যানারিমালিকের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

ট্যানারিমালিকদের অভিযোগ, বর্জ্য পরিশোধনাগারসহ (সিইটিপি) অন্যান্য অবকাঠামো প্রস্তুত না করেই ২০১৭ সালে অনেকটা জোর করে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরে নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানান্তরের কারণে সে সময় ক্রেতাদের সময়মতো চামড়া দেওয়া যায়নি। এর ফলে অনেক ক্রেতাই বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যান। শিল্পনগরের কর্মপরিবেশ উন্নত না হওয়ায় সেই ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না।

মাইজদী ট্যানারির কারখানায় সারি সারি ওয়েট ব্লু করা চামড়া মজুত হয়ে আছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর কোরবানিতে ৪৫ হাজার পিস চামড়া কিনেছিলাম। তবে ৫০ শতাংশই অবিক্রীত আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে চীনারা আমাদের বড় ক্রেতা। তাঁরাও বিভিন্নভাবে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইউরোপের ক্রেতারা শিল্পনগরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে আমাদের চামড়া কিনছেন না।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে চীনে ৬ কোটি ৮০ লাখ ডলারের চামড়া রপ্তানি হয়েছিল। গত অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের। এ ছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ইতালিতে চামড়া রপ্তানি হয় ৫ কোটি ৯৮ লাখ ডলারের, যা গত বছর হয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ডলারের। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জাপানে ১ কোটি ৯ লাখ ডলারের রপ্তানির বিপরীতে গতবার ১ কোটি ডলারের চামড়া রপ্তানি হয়েছে।

মো. করিম নামের একজন রপ্তানিকারক ট্যানারি ভাড়া নিয়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করেন। তিনি বলেন, চীনা ক্রেতারা সিন্ডিকেট করে নিয়েছেন। শুরুতে তাঁরা প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ৬০-৬৫ সেন্ট দেওয়ার কথা বলে ক্রয়াদেশ দেন। পরে আবার নানা অজুহাত দেখিয়ে ২-৫ সেন্ট মূল্যছাড় চান।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীনা চামড়াজাত পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। সেটি আমাদের কাছ থেকে আদায় করতে চান চীনারা। সে জন্য প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ৫৫ থেকে ৭০ সেন্ট বলছেন তাঁরা। ইউরোপের ক্রেতাদের ধরতে পারলে চীনের ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হতো না।’

গত শনিবার চামড়াশিল্প নগরে ঘুরে দেখা যায়, সিইটিপির ক্রোম রিকোভারি ইউনিট চালু হয়নি। কঠিন বর্জ্য সিইটিপির পাশের পুকুরে ফেলা হচ্ছে। এ কারণে পরিবেশের দূষণ আগের মতোই হচ্ছে। অন্যদিকে ড্রেনের সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় ট্যানারিগুলো পুরোদমে উৎপাদন শুরু করলে সড়কগুলো বর্জ্যে সয়লাব হওয়ার আশঙ্কা আছে।

বিসিক চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে সিইটিপির কাজ শেষ হবে। তার পরই লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সনদের জন্য আবেদন করা হবে। সেটি হলে এক ডলারের চামড়া তিন-চার ডলারে ইউরোপের ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে পারবেন ট্যানারির মালিকেরা।

ব্রেকিং নিউজঃ