| |

কৃষক লীগের নেতৃত্বে আসছে নতুন মুখ

আপডেটঃ ৭:৫২ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ২৬, ২০১৯

Ad

কৃষক লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে এবার বড় পরিবর্তন আসছে। আগামী ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে বাদ পড়তে যাচ্ছেন বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাঁদের বিরুদ্ধে রয়েছে কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগ। তাই বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে এবার কৃষিবিদদের হাতে এই সংগঠনের নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কৃষিবিদদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনা করছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। আওয়ামী লীগ ও কৃষক লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

কৃষক লীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। সম্মেলনে মোতাহার হোসেন মোল্লাকে সভাপতি ও খোন্দকার শামসুল হক রেজাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। তাঁদের একজন ঠিকাদার ও আরেকজন আইনজীবী। সংগঠনের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, কৃষক সমাজকে সংগঠিত ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের এই সহযোগী সংগঠনের জন্ম হয়েছে। কিন্তু বর্তমান কমিটির নেতৃত্বে যেমন রয়েছেন অন্য পেশার মানুষ, তেমনি কৃষকের স্বার্থে গত সাত বছরে তাদের কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।

সূত্র জানিয়েছে, কৃষক লীগের সামনের সারির নেতাদের মধ্যে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও ঠিকাদারদের প্রাধান্য রয়েছে। একটি হাউজিং কম্পানির এমডি, একটি শিল্পগোষ্ঠীর চেয়ারম্যান (পরে বহিষ্কৃত) ও জুয়েলারি ব্যবসায়ীকে এই সংগঠনের সহসভাপতি করা হয়। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি শফিকুল ইসলাম ফিরোজ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ফিরোজসহ অনেকের নামই কৃষক লীগের সাংগঠনিক নেত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অনুমোদিত ১১১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিল না। পরে তাঁদের কেন্দ্রীয় নেতা করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অনুমোদন ছাড়াই তিন শতাধিক ব্যক্তিকে চিঠি দিয়ে সংগঠনের বিভিন্ন পদে বসিয়েছেন। শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত ১১১ সদস্যের চূড়ান্ত কমিটি ভেঙে ইচ্ছামতো পদ বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে দুই নেতার বিরুদ্ধে। তাঁরা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটি বারবার ভেঙে নতুন কমিটি করেন। এর মধ্যে ময়মনসিংহ ও সুনামগঞ্জের কমিটি এক বছরে তিনবার গঠন করা হয়। সম্মেলন ছাড়াই ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার থানা ও উপজেলা কমিটি রাজধানীতে বসে অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন জেলা কমিটি ভাঙার চিঠি দিয়ে আবার পুনর্বহাল ও নতুন কমিটি দেওয়ার ঘটনা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষক লীগের একজন সহসভাপতি কালের কণ্ঠকে জানান, কমিটি পরিবর্তন ও বাণিজ্যের বিষয়টি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অবহিত। এ নিয়ে তিনি একাধিকবার অসন্তোষ প্রকাশ করে দুই নেতাকে হুঁশিয়ার করেন।

কৃষক লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি প্রায় সাত বছর অতিক্রান্ত করলেও এ সময়ে কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির মাত্র একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কৃষকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম, সাংগঠনিক সফর কিংবা জেলা-উপজেলায় সংগঠন গড়ে তোলার জন্য কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি। শুধু দিবসভিত্তিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে কার্যক্রম।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত কোনো অভিযোগই সত্য নয়। কমিটি বাণিজ্যের সঙ্গে তিনি কখনই জড়িত ছিলেন না। অনুমোদিত কমিটি ১১১ সদস্যের নয়, ১১৬ সদস্যের বলে জানান তিনি। শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে একজন ব্যবসায়ীকে বর্তমান কমিটিতে সহসভাপতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোন্দকার শামসুল হক রেজা কালের কণ্ঠকে বলেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কৃষক লীগ এখন অনেক শক্তিশালী। সাত বছরে কৃষক লীগ কার্যনির্বাহী কমিটির মাত্র একটি সভা কেন হলো প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক সভা করেছি।’ ১১১ সদস্যের কমিটি পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, যাঁরা মারা গেছেন কেবল তাঁদের স্থলে নতুন নেতা অন্তর্ভুক্ত করেছি। কমিটি বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমাকে কেউ এক কাপ চাও খাওয়াতে পারিনি। অন্য কেউ যদি কমিটি বাণিজ্য করে থাকে তা আমি বলতে পারব না।’

এদিকে সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পর কৃষক লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। তাঁদের প্রত্যাশা জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষক সংগঠকের হাতে কৃষক লীগের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হবে। সংগঠনের ত্যাগী নেতারা সে আশায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলে যোগাযোগ রাখছেন।

নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার কৃষক লীগের সভাপতি পদে আলোচনায় থাকাদের মধ্যে রয়েছে কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশার নাম। তিনি শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। ছাত্রলীগ নালিতাবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়ে পর্যায়ক্রমে সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বদিউজ্জামান বাদশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নেতাকর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে দেখে আসছেন এই সংগঠনের নেতৃত্বের জন্য কারা যোগ্য এবং পরীক্ষিত। সেই বিবেচনা থেকেই হয়তো সভাপতি হিসেবে তাঁরা আমাকে প্রত্যাশা করছেন।’

সভাপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছে প্রতিষ্ঠাকালীন ১১ সদস্যের মধ্যে একমাত্র জীবিত অ্যাডভোকেট খান আলতাফ হোসেন ভুলুর নামও। তিনি বর্তমান কমিটির এক নম্বর সহসভাপতি। বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা খান আলতাফ হোসেন ভুলু বিএম কলেজ ছাত্রসংসদের এজিএস, জিএস, ভিপি ও বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক ছিলেন।

আলতাফ হোসেন ভুলু কালের কণ্ঠকে বলেন, পার্টিতে (কৃষক লীগ) যাঁরা পদ কেনাবেচা করেছেন তাঁদের বাদ দিয়ে আগামী ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ক্লিন ইমেজের নেতা নির্বাচিত হবে, সেই প্রত্যাশা তাঁর।

সভাপতি হিসেবে আরো আলোচনায় রয়েছেন, সহসভাপতি শরীফ আশরাফ আলী, সহসভাপতি ওমর ফারুক এবং উপদেষ্টা মুক্তিযোদ্ধা মিয়া আবদুল ওয়াদুদ।

সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন কৃষিবিদ সমীর চন্দ। তিনি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। কৃষক লীগের কৃষি উপকরণ বিষয়ক সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে এই সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তিনি।

সমীর চন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কৃষক লীগের সাংগঠনিক নেত্রীর প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যে দায়িত্ব দেবেন তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব।’

সাধারণ সম্পাদক পদে বিশ্বনাথ সরকার বিটুর নামও আলোচনায় রয়েছে। তিনি বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। বিটু ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। তিনি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বিটু কালের কণ্ঠকে বলেন, কৃষক লীগের সাংগঠনিক নেত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে সব সময় সততা, ত্যাগের মূল্যায়ন করেন। তিনি যাঁকেই দায়িত্ব দেবেন তাঁর সঙ্গেই কাজ করব।

সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আরো আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আতিকুল হক আতিক। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। আতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি কৃষক লীগের সাংগঠনিক নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সম্পূর্ণ আস্থাশীল। তিনি যে দায়িত্ব দেবেন, তা যথাযথভাবে পালন করবেন।

সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আরো আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কৃষিবিদ সাখাওয়াত হোসেন সুইট ও আসাদুজ্জামান বিপ্লব।

ব্রেকিং নিউজঃ