| |

চারশিশুকে একসাথে হত্যার নেপথ্যে যে ঘটনা

আপডেটঃ 8:13 pm | February 18, 2016

Ad
হত্যাকারীদের ধরিয়ে দিতে লাখ টাকার ঘোষণা

 

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: হবিগঞ্জের বাহুবলে চার শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় প্রতিবেশী আব্দুল আলী ও তার ছেলে জুয়েলকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত শিশু মনিরের বাবা আফজাল মিয়া তালুকদারের সাধারণ ডায়রির প্রেক্ষিতে বুধবার তাদের আটক করা হয়েছে ।

নিহত শিশুরা হলেন- স্থানীয় আবদাল মিয়া তালুকদারের ছেলে মনির মিয়া (৭), ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে জাকারিয়া আহমেদ শুভ (৮), আব্দুল আজিজের ছেলে তাজেল মিয়া (১০) এবং আব্দুল কাদিরের ছেলে ইসমাইল হোসেন (১০)।

মনির সুন্দ্রাটেকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে এবং তার দুই চাচাত ভাই শুভ ও তাজেল একই স্কুলে দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। আর তাদের প্রতিবেশী ইসমাইল ছিল সুন্দ্রাটেকি মাদ্রাসার ছাত্র।

গত শুক্রবার বাড়ির পাশের মাঠে খেলতে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয় এই চার শিশু। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাদের সন্ধান না পেয়ে রাতে উপজেলার সব এলাকায় মাইকিং করেন স্বজনরা। শনিবার দুপুরে শুভর বাবা ওয়াহিদ মিয়া বাহুবল মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

বুধবার সকালে ওই গ্রামের ঈসা বিল এলাকায় তাদের বালিচাপা দেওয়া মরদেহ পাওয়া যায়।

নেপথ্যের ঘটনা

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাদিঘী গ্রামে আটটি পঞ্চায়েত রয়েছে। মাসখানেক আগে একটি বড়ই গাছ কাটা নিয়ে বাঘাল পঞ্চায়েত ও তালুকদার পঞ্চায়েতের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে দুই পঞ্চায়েতের মধ্যে কয়েকবার ঝগড়াও হয়।

এসব ঘটনা ও ঝগড়ার মধ্যেই গত শুক্রবার বাড়ির পাশের খেলার মাঠ থেকে নিখোঁজ হয় সুন্দ্রাদীঘি গ্রামের পাঁচ শিশু। এরা হলো- ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে সুন্দ্রাদিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র জাকারিয়া আহমেদ শুভ (৮), ওয়াহিদের চাচাত ভাই আব্দুল আজিজের ছেলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র তাজেল মিয়া (১০), আবদাল মিয়ার ছেলে প্রথম শ্রেণির ছাত্র মনির মিয়া (৭) এবং প্রতিবেশী আব্দুল কাদিরের ছেলে সুন্দ্রাদিঘী মাদ্রাসার ছাত্র ইসমাইল হোসেন (১০)।

গত বুধবার সকালে নিহতদের বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে কামাইছড়া নদীর ইছাবিলে বালুর নিচ থেকে এ চার শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

এসপি জয়দেব কুমার ভদ্র মিডিয়া কর্মীদের জানান, ৫ দিন আগে গ্রাম থেকে এই চার স্কুলছাত্র নিখোঁজের পর তাদের জীবিত উদ্ধারে পুলিশ মরিয়া হয়ে ওঠে। এই বিভাগের গোয়েন্দা সদস্যদেরও মাঠে নামানো হয়। এরই মধ্যে ওই গ্রামের নিকটবর্তী ইসাবিল নামক স্থান থেকে স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে গোপন সংবাদ আসে একাধিক শিশুর মৃতদেহ সন্ধ্যাদিঘীর পশ্চিম পাড়ের বালির স্তূপের গর্তে দেখা গেছে। এরই প্রেক্ষিতে হবিগঞ্জ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইন ও সংশিষ্ট থানার ইউএনও, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশারফ হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

পরবর্তীতে বালু সরালে একের পর এক উঠে আসে নিখোঁজ ওই চার স্কুলছাত্রের ক্ষতবিক্ষত গলাকাটা মৃতদেহ। এসপি জয়দেব আরও জানান, প্রাথমিকভাবে এটি পরিকল্পিত হত্যা মনে হলেও তদন্ত সাপেক্ষে কারা, কেন এমন নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছে তা উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে। হত্যাকারীদেরও দ্রুত সময়ের মধ্যে আটকের চেষ্টা চলবে। ওসি মোশারফ জানান, এই সকল মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দুপুরের পর হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদিকে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ মিজানুর রহমান এমন নির্মম ঘটনাটিকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হত্যাকা- হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি নিষ্পাপ শিশু হত্যার মতো জঘন্য অপকর্মে জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়ে বলেন, এই হত্যাকারীদের ধরিয়ে দিতে পারলে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। এ সময় তার সাথে ছিলেন এসপি জয়দেব কুমার ভদ্র, এএসপি হেডকোয়ার্টার মাসুদুর রহমান মনিরসহ পুলিশ ও শ্রীমঙ্গল র‌্যাব-৯ এর কর্মকর্তারা।

গ্রামবাসী আব্দুর রউফ জানান,  ইছাবিলে বুধবার সকালে এক শ্রমিক বালুর গর্তের মধ্যে পড়ে থাকা অবস্থায় লাশগুলো প্রথমে দেখতে পান। এ খবরে মুহূর্তের মধ্যে শত শত গ্রামবাসী ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে বাহুবল থানা পুলিশ খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করতে ঘটনাস্থলে এসে গর্ত থেকে লাশগুলো উত্তোলন করে।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন সিলেটের ডিআইজি মিজানুর রহমান, হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র, সিআইডি, ডিবি ও র‌্যাব সদস্যরা।

চার শিশু খুন হওয়ার পেছনে পঞ্চায়েতের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে দায়ী করছেন গ্রামবাসী।গ্রামবাসী  জানান, গ্রামের আট পঞ্চায়েতের মধ্যে তালুকদার পঞ্চায়েতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাজি মাস্টার আব্দুল খালেক। অপরদিকে বাঘাল পঞ্চায়েতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আব্দুল আলী বাঘাল চৌকিদার। এ ঘটনার পর থেকে বাঘাল পঞ্চায়েতের নেতৃত্বদানকারী আব্দুল আলী বাঘাল চৌকিদারসহ তার লোকেরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে।

নিহতের চাচাতো বোন আসফিয়া আক্তার বিলাপ করে বলেন, ‘ওরা আমার ভাইদের মেরে পালিয়ে গেছে। তাদের ধরে নিয়ে আসুন। বিচার করুন। আমরা র‌্যাবের কাছে তাদের ব্যাপারে বলেছি।’ এ সময় নিহতদের বাড়ির আশপাশে সিআইডি, ডিবি, র‌্যাব সদস্যরা অবস্থান করছিল।

এদিকে, হত্যাকারীদের ধরিয়ে দিলে লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে পুলিশের সিলেট বিভাগের ডিআইজি মিজানুর রহমান বলেন, প্রকৃত ঘটনা বের করতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে রয়েছে। অবশ্যই হত্যাকারীদের বের করে আইনের আওতায় আনা হবে।

বাহুবল মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোশারফ হোসেন জানান, মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিহত মনিরের বাবা আবদাল মিয়া জানান, মাসখানেক আগে বড়ই গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী আব্দুল হাই বাঘালের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এর জের ধরে শুক্রবার তার ছেলেসহ ওই চার শিশুকে বাচ্চু মিয়া নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তুলে নিয়ে যান আব্দুল আলী বাঘাল। টের পেয়ে তিনি ওই দিনই বিষয়টি পুলিশকে জানান। কিন্তু পুলিশ তাদের উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অবশেষে বাড়ির প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বালুগর্তে চার শিশুর মৃতদেহ পাওয়া গেল। নিহতদের শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

ভাদেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মদ্দছির মিয়া জানান, যারাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের গ্রেফতার করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে জোর দাবি রাখছি

ব্রেকিং নিউজঃ