| |

গেজেটভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষা সৈনিকের নাম রাজাকারদের তালিকায় : প্রকাশিত তালিকা নিয়ে বিতর্ক ও নানামুখী প্রতিক্রিয়া

আপডেটঃ 2:44 pm | December 17, 2019

Ad

মহান বিজয় দিবসের আগের দিন গত রবিবার স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করেছে সরকার। এই তালিকা কতটুকু সঠিক তা নিয়ে নানামুখী প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

প্রকাশিত কথিত ‘রাজাকারদের তালিকা’ নিয়ে দেশে ব্যাপক অষন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়েছে এই তালিকা। এই কথিত তালিকায় ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এমনকী ভাষাসৈনিকদের নাম তুলে দেওয়া হয়েছে! বাদ পড়েছেন চিহ্ণিত রাজাকারেরা।

 

আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি এডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু, বরিশালের প্রয়াত ভাষা সৈনিক ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মিহির লাল দত্ত, গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধার নাম! বরিশালের বামপন্থী রাজনৈতিক দল বাসদের জনপ্রিয় নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তীর বাবা এড. তপন কুমার চক্রবর্তী এবং ঠাকুমা উষা রানি চক্রবর্তীর নাম এই তালিকায় উঠে এসেছে রাজাকার হিসেবে।

 

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এই তালিকায় ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সরকারের হেফাজতে যেসব দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যাবে তাই প্রকাশ করা যায়’।

 

রাজাকারের তালিকায় নাম প্রসঙ্গে গোলাম আরিফ টিপু:

 

আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি এডভোকেট গোলাম আরিফ টিপুর নাম এই তালিকায় উঠে এসেছে রাজাকার হিসেবে। রাজশাহী বিভাগের তালিকায় গোলাম আরিফের নাম রয়েছে ৬০৬ নম্বরে। ভাষা সৈনিক ও যুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক গোলাম আরিফের নাম কি করে এই তালিকায় এলো তা নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে।

 

এক প্রতিক্রিয়ায় গোলাম আরিফ টিপু বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে আমি লজ্জিত, বিস্মিত, হতবাক। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় কতটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মধ্যে এই কাজটি করেছে তালিকা দেখলেই বুঝা যায়। এর থেকে প্রমাণিত হয় মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম যথাযথভাবে হচ্ছে না। যে কারণে এই ঘটনাটি ঘটেছে। যেভাবে আমার নাম দেওয়া হয়েছে, সেভাবে তো আমাকে পাওয়ার কথা না কোনোভাবেই।’

 

ভাষা সৈনিক মিহির লাল দত্তের নাম রাজাকারের তালিকায়!

 

বরিশালের প্রয়াত ভাষা সৈনিক ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মিহির লাল দত্তের নামও এসেছে রাজাকারের তালিকায়!

 

গত রবিবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত রাজাকারের তালিকার বরিশাল বিভাগের ২২নং পাতার ৯৪ নম্বর রাজাকার হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা মিহির লাল দত্তের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তার পিতার নাম জীতেন্দ্র দত্ত এবং আগরপুর রোডের বাসিন্দা উল্লেখ করা হয়। বরিশালের সুপরিচিত সাংবাদিক মিহির লাল দত্ত একাধারে কবি, নাট্যকার, গীতিকার, ছোট গল্পকার ও ভাষাবিদ। মিহির লাল দত্ত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। পিতা জিতেন্দ্র লাল দত্ত এবং মেজ ভাই সুবীর দত্ত পান্থ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন।

 

রাজাকারের তালিকায় পিতার নাম আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মিহির লাল দত্তের ছেলে শুভব্রত দত্ত। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘আমার বাবা একজন ভাষা সৈনিক এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। তার মুক্তিযোদ্ধা গেজেট নং- ২৮৯ ২১/০৫/২০০৫ এবং মুক্তিবার্তা নং- ০৬০১০১১০৬০। এছাড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত সাময়িক সনদ নং- ম২৮৬১৬। তার নাম কীভাবে রাজাকারের তালিকায় এসেছে সেটা আমার বোধগম্য নয়। যারা এই তালিকার সঙ্গে জড়িত তাদের শাস্তি দাবি করছি। এটা জাতির জন্য অপমানের।’

 

গেজেটভূক্ত মুক্তিযোদ্ধার এড. তপন কুমার চক্রবর্তী এবং মা উষা রানি চক্রবর্তীর নাম  তালিকায় উঠে এসেছে রাজাকার হিসেবে।

 

গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধার নাম! বরিশালের বামপন্থী রাজনৈতিক দল বাসদের জনপ্রিয় নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তীর বাবা এড. তপন কুমার চক্রবর্তী এবং ঠাকুমা উষা রানি চক্রবর্তীর নাম ঢুকানো হয়েছে রাজাকারের তালিকায়! যেখানে তপন কুমার ৬৫ নম্বর রাজাকার এবং উষা রানি ৪৫ নম্বর রাজাকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

যদিও তপন কুমার চক্রবর্তী একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা, ক্রমিক নং ১১২ পৃষ্টা ৪১১৩। তিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও পেয়ে থাকেন! এই মারাত্মক ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল সাইট ফেসবুকে ডা. মনীষা চক্রবর্তী একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার পর থেকে নিন্দার ঝড় উঠেছে। মানুষ প্রশ্ন করছেন, রাজাকারের তালিকার নামে আসলে কী হয়েছে?

 

ফেসবুকে ডা. মনীষা চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ কাজ করার পুরস্কার পেলাম আজ। ধন্যবাদ আওয়ামী লীগকে। সদ্য প্রকাশিত রাজাকারদের গেজেটে আমার বাবা এবং ঠাকুমার নাম প্রকাশিত হয়েছে। আমার বাবা এড. তপন কুমার চক্রবর্তী একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা,ক্রমিক নং ১১২ পৃষ্টা ৪১১৩। তিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও পেয়ে থাকেন! আজ রাজাকারের তালিকায় তিনি ৬৫ নাম্বার রাজাকার।’

 

‘আমার ঠাকুরদা এড সুধির কুমার চক্রবর্ত্তীকে পাকিস্থানি মিলিটারি বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তিনিও ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর সহধর্মিণী আমার ঠাকুমা উষা রানী চক্রবর্ত্তীকে রাজাকারের তালিকায় ৪৫ নম্বারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য আমার রাজনীতি করার খেসারত দিতে হচ্ছে আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে। ধন্যবাদ আওয়ামীলীগ সরকারকে।’

 

‘আমার দল বাসদ আমাকে শিখিয়েছে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করাকে। মিছিল থেকে গ্রেফতার করে থানায় নির্যাতন করে ওরা বলেছিল যে আন্দোলন যেন না করি, নির্বাচনে যেন অংশ না নিই। রাজী না হওয়ায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে অজামিনযোগ্য মামলা দিয়ে জেলে প্রেরণ করেছে। আমরা জেল খেটেছি, নির্যাতন সহ্য করেছি কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথানত করিনি।’

 

‘ভয় দেখিয়ে বা বিপদে ফেলে আমাদের কিছু করা যাবে না। অভুক্ত, অর্ধভুক্ত গরীব খেটে খাওয়া মানুষ আছে আমাদের দলের সাথে। আছে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী। অতীতের মতো আজ এবং আগামীতে আপনাদের পাশে পাবো সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।’

 

এদিকে বরিশাল বাসদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই ডা. মনীষার পরিবারবর্গের নাম রাজাকারের তালিকায় ঢোকানো হয়েছে। বাসদের নেতাকর্মীদের নানাভাবে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ডা. মনীষার পরিবারের সবাই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত। রাজাকারের তালিকায় দুই মুক্তিযোদ্ধার নাম চলে যাওয়ায় এই তালিকার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাসদের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় মানুষ।

 

বিএনপি এই তালিকা সঠিক কিনা প্রশ্ন তুলেছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একটি হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

 

লন্ডন প্রবাসী প্রবীণ সাংবাদিক ও ভাষা সৈনিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী এক অনুষ্ঠান বলেছেন, রাজাকারদের তালিকা তৈরি করার আগে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা তৈরি করতে হবে। কারণ, অনেক স্বাধীনতাবিরোধী আওয়ামী লীগের চারপাশ ঘিরে রেখেছে। তারা সরকারের বড় বড় পদে রয়েছে। তাদের কথা বললে হয়তো আমাকে আর দেশে আসতে দেবে না।

 

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, এই তালিকা তৈরিতে ৫০ বছর লাগল কেন? এই সরকার তো দশ বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতায় রয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত রোববার মুক্তিযোদ্ধা বিষয়কমন্ত্রী মোজাম্মেল হক ১০,৭৮৯ জন রাজাকারের প্রথম তালিকা প্রকাশ করেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তালিকা প্রকাশ করে বলেন, অনেক জেলা প্রশাসন এতে যথাযথ সহযোগিতা করেনি।

 

এসব বিষয়ে গতকাল সংবাদমাধ্যমকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা নিজেরা কোনো তালিকা প্রস্তুত করিনি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা যে তালিকা করেছে, আমরা শুধু তা প্রকাশ করেছি। সেখানে কার নাম আছে, আর কার নাম নেই সেটা আমরা বলতে পারব না। একই নামে তো অনেক মানুষ থাকতে পারে। আর একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের তালিকায় আসবে কেন, এটা হতে পারে না। আর যদি আসেও সেটা পাকিস্তানি বাহিনীর ভুল।’

ব্রেকিং নিউজঃ