| |

‘বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখা’ বীর মুক্তিযোদ্ধা এড.আনিসুর রহমান খান (পর্ব-১)

আপডেটঃ 8:50 pm | January 01, 2020

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ কিছুদিন পূর্বে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের সাথে স্থানীয় সাংবাদিকদের মতবিনিময়কালে তিনি সাংবাদিকদেরকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর উপর কারো কোন ঘটনা জানা থাকলে তা সংবাদপত্রে প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আজ বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকীর প্রথম দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. মোঃ আনিসুর রহমান খানের ‘বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখা’ লেখাটির আলোকে আজকের এই লেখাটির প্রথম পর্ব তুলে ধরলাম। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পূণ্য স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটি শুরু করেছেন।

১৯৫৪ সনে তিনি যখন নেত্রকোনা কলেজে ইন্টারমেডিয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে উনার প্রথম পরিচয় হয়। সময়টা ছিল ১৯৫৪ সালের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন কালীন সময়। সেই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্য মন্ত্রী নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের তরুণ নেতা খালেক নেওয়াজ খান নির্বাচনে নান্দাইল আসন থেকে প্রতিদ্বন্ধিতা করছিলেন।

খালেক নেওয়াজ খান আত্মীয়তার সূত্রে এড. আনিসুর রহমান খানের মামা। খালেক নেওয়াজ খান আনিসুর রহমান খানকে ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে নির্বাচন উপলক্ষে নান্দাইলে আগত নেতৃবৃন্দকে দেখবাল করার জন্য নির্দেশ দেন। সেই সময়ে তিনি ৩ সপ্তাহ খালেক নেওয়াজ খানের বাড়িতে অবস্থান করেন। সম্ভবত মার্চ মাসে সেই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচনের কয়েকদিন পূর্বে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তথা নৌকার প্রার্থী খালেক নেওয়াজ খানের জনসভা উপলক্ষে যুক্তফ্রন্টের নেতা হুসাইন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলীগ লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরও কয়েকজন নান্দাইল আগমন করেন। দুপুরে খালেক নেওয়াজ সাহেবের বাড়িতে খাবারের আয়োজন করা হয়। সেই সময় এড. আনিসুর রহমান সাহেবের সাথে সর্বপ্রথম হুসাইন শহিদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের সাথে উনার সাক্ষাৎ হয়।

সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী খালেক নেওয়াজ খান ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগের প্রার্থী ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন। নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র মুসলীম লীগের ভরাডুবি হয়েছিল। এরপর ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগ করা হয়।

সেই সময় থেকেই আওয়ামীলীগ একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। আর এব্যাপারে যিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৩ সনের ডিসেম্বর মাসে হুসাইন শহিদ সোহরাওয়ার্দী পরলোক গমন করার পর ১৯৬৪ সনের জানুয়ারী মাসে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামীলীগকে পুনরজ্জবীত করেন। তৎকালীন সময়ে আনিসুর রহমান খানসহ ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবি সমিতির প্রায় ৮২ জন আইনজীবি আওয়ামীলীগের যোগদান করে।

১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহে আওয়ামীলীগের এক কর্মী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে শেখ মুজিবুর রহমান ভাষন প্রদান করেন। উক্ত কর্মী সভায় এড. আনিসুর রহমান সাহেব উপস্থিত ছিলেন বলে লিখেছেন। পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সীমাহীন বৈষম্য রোধে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়িত্বশাসনের দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা কর্মসূচী ঘোষনা করেন। জনগন ৬ দফাকে বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহন করে।

১৯৬৬ সনে ময়মনসিংহে সার্কিট হাউস ময়দানে তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহের আওয়ামীলীগের সভাপতি সৈয়দ নজরুল ্ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সাধারন সম্পাদক রফিকউদ্দিন ভূইয়ার পরিচালনায় সভায় শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার সমর্থনে এক বিশাল জনসভায় ভাষন দেন। ঐ সভায় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন এড. আনিসুর রহমান খান। সেই সময় বিভিণ্ন জেলায় শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নিরাপত্তা আ্ইনে মামলা হয়। ময়মনসিংহেও এমন একটি মামলা দায়ের করা হয়।

১৯৬৬ সালের জুলাই কি আগষ্ট মাসে শেখ সাহেবকে সিলেটে গ্রেফতার করা হয় এবং গ্রেফতার অবস্থায় সিলেট থেকে ময়মনসিংহের একটি কেইসে তৎকালীন ময়মনসিংহ মহকুমা হাকিম (দক্ষিন) এর আদালতে হাজির করা হবে জেনে রাত দেড়টার মধ্যে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও রফিকউদ্দিন ভূইয়ার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের হাজারো নেতাকর্মী রেলস্টেষনে হাজির হন। আওয়ামীলীগের একজন কর্মী হিসেবে এড. আনিসুর রহমান খানও সেদিন রেলস্টেষনে উপস্থিত হয়েছিলেন।

সেই সময়ে রাত্রি ২টার মেইলট্রেনে সিলেট থেকে পুলিশ পহরায় ময়মনসিংহ রেলষ্টেষনে শেখ মুজিবকে আনা হয়। রেলষ্টেষন থেকে শেখ মুজিবকে সরাসরি জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন সকাল ১০টায় তৎকালীন মহকুমা হাকিম (দক্ষিণ) এর মহারাজা রোডের বাসভবনে শেখ সাহেবকে হাজির করা হলে সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে এড. আনোয়ারুল কাদির, আনিসুর রহমানসহ বহু আইনজীবি মহকুমা হাকিমের বাসভবনে শেখ সাহেবের জামিনের আবেদন করে।

কিন্তু জামিন আবেদন অগ্রাহ্য হয় এবং বন্দী অবস্থায় শেখ সাহেবকে টাঙ্গাইলের আর একটি মামলায় টাঙ্গাইল নেওয়া হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ থাকে যে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব ফৌজদারী মামলায় প্রখ্যাত আইনজীবি ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে উপস্থাপিত ৬ দফা দাবিকে চিরতরে নস্যাৎ করার অভিপ্রায়ে পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী শেখ সাহেবকে দীর্ঘদিন কারার অন্তরালে আবদ্ধ রাখেন এবং তাকে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ১ নং আসামী করা হয়। সারাদেশব্যাপী প্রচন্ড গন অভ্যুত্থানের পরিনতিতে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবসহ ঐ মামলায় সকল আসামীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

১৯৬৯ সনের ২২ ফেব্রুয়ারী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় নেতাদের মাজারে যান এবং সেখানে তিনি বলেন “অতঃপর ইহার নাম বাংলাদেশ” ২৩ ফেব্রুয়ারী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে রেসকোর্সের বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধীতে ভূষিত করা হয়।

সেই থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেন বাঙ্গালীর অবিসম্বাদিত নেতা ও মুক্তির দিশারী। জেনারেল আইয়ুব খানের পতনের পর জেনারেই ইয়াহিয়া পাকিস্তানের মসনদে আসিন হন। ১৯৭০ সনের ডিসেম্বর মাসের ৭ তারিখে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সাধারন নির্বাচন এবং ঐ মাসের ১৭ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সাধারন নির্বাচনের ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবির উপর জনগনের মেন্ডেন্ট লাভের জন্য সেই নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন।

যদিও মাওলানা ভাষানীসহ অনেকেই সেই নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। ময়মনসিংহ জেলা সদরসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার প্রতিটি মহকুমা ও থানা সদরে অনুষ্ঠিত জনসভা সমূহে তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা আঃলীগের কোষাধক্ষ্য এড. আনিসুর রহমান জেলা আঃলীগের সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও সাধারন সম্পাদক রফিক উদ্দিন ভূইয়াসহ বঙ্গবন্ধুর সফর সঙ্গী হওয়ার সুযোগ লাভ করে। বঙ্গবন্ধুকে তখন তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন ও উনার বক্তব্য শুনেছেন। প্রতিটি জনসভায় বঙ্গবন্ধুর শেষ বাক্য ছিল “তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা যমুনা – জয় বাংলা” বলে বক্তব্য শেষ করতেন লিখেছেন এড. আনিসুর রহমান খান।

ব্রেকিং নিউজঃ