| |

বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখা বীরমুক্তিযোদ্ধা এড. আনিসুর রহমান খান (শেষ পর্ব)

আপডেটঃ 11:12 pm | January 05, 2020

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা এড.আনিসুর রহমান খানের “বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখা” প্রবন্ধটি থেকে এই লেখাটি প্রকাশ করা হলো। প্রতিটি জনসভায় বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্য শেষ করতেন “তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা, যমুনা- জয় বাংলা।

৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে “সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ পূর্ব পাকিস্তান কোঠায় ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে বিজয় লাভ করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়। যে ২টি আসনে আঃলীগ পরাজিত হয় তার একটি ময়মনসিংহের নান্দাইলে।

ময়মনসিংহ জেলা আঃলীগের সাধারন সম্পাদক রফিকউদ্দিন ভূইয়া, নূরুল আমিন সাহেবের কাছে হেরে যান। ১৯৭০ সনের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলা আঃলীগের অন্যতম সহ সভাপতি আয়কর আইনজীবি আব্দুস সাত্তার, সদর মহকুমা (দক্ষিণ) আঃলীগের সভাপতি ব্যবসায়ী মফিজ উদ্দিন আহমেদ, ময়মনসিংহ শহর আঃলীগের কমর উদ্দিন আহমেদ ওরফে কমির মিয়া এবং লেখক আনিসুর রহমানসহ এই ৪জন বঙ্গবন্ধুকে ঢাকায় গিয়ে দেখে আসার স্বিদান্ত নেন।

কমির মিয়া ছায়াবানী হলের সামনে একটি চায়ের দোকান করতেন তবে তিনি আঃলীগের একনিষ্ঠ ও নিবেদিত কর্মী ছিলেন। আব্দুস সাত্তার সাহেবের একটি ভক্স ওয়াগন গাড়ি ছিল। ময়মনসিংহ মহাসড়ক তখনও চালু হয়নি।

ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে টাঙ্গাইল হয়ে তারা ঢাকায় যান। বঙ্গবন্ধুর ৩২নম্বর বাড়িতে দুপুর ১টার দিকে গিয়ে পৌছে। বঙ্গবন্ধু তখন বাড়ির নীচ তলায় লোকজনের সাথে কথা বলছিলেন। এড. আনিসুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু উনাদেরকে ঘরের ভিতরে ঢেকে নিয়ে বসতে বলেন ও উনাদেরকে প্রশ্ন করেন এই অসময়ে তোমরা কেন এসেছ? আনিসুর রহমান বলেন, আপনাকে দেখতে এসেছি নেতা।

হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধু রাগতস্বরে বলেন নান্দাইলে এই পরাজয় কেন? উনারা কেউ উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকেন। অতঃপর বঙ্গবন্ধু আবার বলেন কিছু বলার থাকলে তারাতারি বল। আমি উপরে উঠে যাব গোসল করব খাওয়া দাওয়া করে বাহিরে যাব। ইতিমধ্যে উনাদের জন্য চা নাস্তা চলে এলো।

বঙ্গবন্ধু এড. আনিসুর রহমান ও ছাত্তার সাহেবকে জিঙ্গাসা করলেন তোমাদের উকালতি কেমন চলছে? মফিজ ভাইকে জিঙ্গাসা করলেন আপনার ব্যবসা কেমন চলছে? কমির মিয়া যে চায়ের দোকান করতেন বঙ্গবন্ধু তাও জানতেন। তাকে জিঙ্গাসা করলেন দোকান থেকে কেমন আয় হয়? সংসার চলে? কমির মিয়া জবাব দিলেন কোনরকম চলে।

এরপর পরিবার পরিজনদের কুশলাদী জিঙ্গাসা করে আবার বললেন কেন এসেছ বল? চা নাস্তা খাওয়া শেষ করে বঙ্গবন্ধকে সালাম জানিয়ে বিদায় নিয়ে রাস্তা পর্যন্ত চলে এলেন এরমধ্যে একটি ছেলে দৌড়ে এসে বলল “কমির মিয়া কার নাম নেতা ডেকেছেন”। কমির মিয়া ছেলেটির সাথে বঙ্গবন্ধুর নিকট ফিরে গেলেন বাকিরা গেইটে দাড়িয়ে ছিল।

একটু পরে কমির মিয়া হাস্যোজ্জ্বল চিত্তে ফিরে এলেন। ৩জনি তাকে প্রশ্ন করলেন নেতা কেন ডেকে নিয়েছিল। তিনি শুধু উত্তর দেন এটি বলা যাবেনা। অনেক পিড়াপীড়ির পর কমির মিয়া বললেন নেতা বলেছেন “আনিসুর রহমান ও আব্দুস সাত্তার এরা উকিল, মফিজউদ্দিন ব্যবসায়ী, তারা অবশ্যই ঢাকা থেকে ফেরার পথে কিছু ছেলে মেয়ের জন্য কেনাকাটা করবে তুমি গরিব মানুষ ছেলে মেয়েদের জন্য কিছু কিনে নিও” এই বলে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ১০০ টাকার ৩টি নোট দেখালেন।

এমনি একজন অনুভূতি সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্পন না করে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ বাঙ্গালী নিদন শুরু করে। ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে কারাগাড়ে বন্দি করেন।

পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ঢাকে সাড়া দিয়ে ময়মনসিংহের স্বাধীনতাকামী জনগন মুক্তিযোদ্ধে ঝাপিয়ে পরে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্যে দিয়ে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয় যার নাম বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাসের ১০তারিখে বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগাড় থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।

বাঙ্গালী জাতির দ্রুত অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষে সর্বপ্রকার শোষন, বৈষম্যের অবসানের জন্য বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিকদল ও ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠন করেন একটি মাত্র রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক দল যার নাম “বাংলাদেশ কৃষক, শ্রমিক আওয়ামীলীগ” সংক্ষেপে বাকশাল।

বাকশাল কোন গতানুগতিক রাজনৈতিক দল ছিলনা। জাতীয় সংসদ কর্তৃক পাশ করা আইন দ্বারা এই জাতীয় দলটি গঠিত হয়। ১৯৭৫ সনের প্রথম দিকে বাকশাল সিস্টেমে বাংলাদেশে দুইটি উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একটি কিশোরগঞ্জে অপরটি নেত্রকোনায়। ১৯৭৫ সনের জানুয়ারী মাসে বাকশালের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু এড. আনিসুর রহমানকে ঢাকা ডেকে পাঠান।

প্রথমে বুঝতে না পেরেও পরে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ করে জানতে পারেন এড. আনিসুর রহমানকে নেত্রকোন আসনে উপনির্বাচন করার জন্য ঢাকা হয়েছে। এই কথাটি শোনে এড. আনিসুর রহমান অভিভূত হয়ে যান। কিন্তু আইন পেশায় ক্ষতি হতে পারে এই কথা চিন্তা করে তিনি উপনির্বাচনে অংশগ্রহনের অপারগতা প্রকাশ করেন বলে উনার লেখায় প্রকাশ করেছেন ।

এড. আনিসুর রহমান জাতির পিতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর সামনে অবনত মস্তকে দাড়িয়ে থাকেন বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন তুমি নাকি নির্বাচন করতে চাওনা? আনিসুর রহমান অকপটে সত্য কথা বলেন যে হ্যা, বঙ্গবন্ধু কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলেন “যাও কিন্তু বড় উকিল হতে হবে”।

তারপর আমি চলে আসতে চাইলে তিনি বলেন “কাকে কাকে মনোনয়ন দেওয়া যায় তোমার কোন সাজেশন্স আছে” এড. আনিসুর রহমান দুটি নাম বলেন। একটি মদনবাড়ির এড. দেওয়ান শাহজাহান ইয়ার চৌধুরী ও আট পাড়ার এড. আব্দুল কুদ্দুছ। এড. আনিসুর রহমানের সাথে বঙ্গবন্ধুর এটাই ছিল শেষ সাক্ষাৎ বলে লিখেছেন আনিসুর রহমান। পরের ঘটনা নিদারুন দুঃখ, শোক ও কষ্টের। জাতি ১৫ই আগষ্ট কতিপয় বিপদগামী সেনাকর্মকর্তা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা রাতের আধাঁরে হত্যা করে বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

ব্রেকিং নিউজঃ