| |

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অতীত ও বর্তমান

আপডেটঃ 9:49 pm | January 08, 2020

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা করেন। এদেশের প্রতিটি গৌরবজ্জ্বল ইতিহাসের সাথে সংযুক্ত আছে ছাত্রলীগের ইতিহাস। প্রতিটি প্রগতিশীল গনতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত লড়াই সংগ্রামে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রলীগ।

পৃথিবীর ইতিহাসে ছাত্রলীগের মত ত্যাগ ও গৌরবময় ইতিহাস আর কোন ছাত্র সংগঠনের মাঝে পরিলক্ষিত হয় না। ছাত্রলীগ একমাত্র সংগঠন লড়াই সংগ্রামে অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে একটি দেশের মুক্তি আন্দোলনে অগ্রসৈনিকের দায়িত্ব পালন করেছে। শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির আদর্শে বিশ্বাসী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত, ৫২এর ভাষা আন্দোলন, ৬২ শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ ছয়দফা ও ১১ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গন অভ্যূত্থান, ৭০ এর নির্বাচন ও ৭১ জানুয়ারী থেকে মার্চ পর্যন্ত সারাদেশব্যাপী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে অবিস্বরনীয় ভূমিকা পালন করেছে।

ছাত্রলীগ ১১ এ মুক্তিযোদ্ধে গ্রাম-গঞ্জের ছাত্রলীগের আদর্শে বিশ্বাসী কৃষক, শ্রমিকের সন্তানেরা সর্বাধিক সংখ্যায় মুক্তিযোদ্ধে অংশগ্রহন করেছে। মুক্তিযোদ্ধে অংশগ্রহনকারী যুবকরা অধিকাংশই ছিল ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। মুক্তিযোদ্ধ ও যুদ্ধ পরিবর্তী সময়ে দেশের পূণগঠনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর এদেশের স্বাধীনতার মূল্যবোধকে ধ্বংস করে সাম্প্রদায়িক ভাবধারায় বিশ্বাসীরা বাংলাদেশকে পরিণত করতে চেয়েছিল একটি সাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যার বিচারসহ অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে রাজপথে লড়াই সংগ্রাম করেছে। সেই দুঃসময়ে এদেশের প্রতিটি প্রতিবাদ ও প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ৬৯ এ ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে যোগ দিয়ে নিজেকে গর্বিত মনে করতাম এই জন্য অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে আমরা ছিলাম সোচ্চার।

সেই দূরন্ত কৈশোরে একজন ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে এদেশের মানুষের যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস আমরা পেয়েছি তা মনে হলে আজও গর্বে বুক ভরে উঠে। কিন্তু আজ বাংলাদেশে ছাত্রলীগের সেই ঐতিহ্য কোথায় জানি বিলিন হয়ে গেছে। আজ কষ্ট পাই যখন এদেশের মানুষ ছাত্রলীগের নামে সমালোচনা করে। অতীতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ব্যক্তিগত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে রাজপথে দেশের মানুষের জন্য লড়াই সংগ্রাম করত। এদেশের মানুষের জন্য নিজেদের ভবিষ্যত পারিবারিক স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

অতীতের সেই সময়কার ছাত্রলীগের কর্মীদের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় সততা ও নিষ্ঠারসহিত জীবনযাপনের ফলে তারা আজ অর্থাভাবে, খাদ্যাভাবে, বিনাচিকিৎসায় তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ছাত্রলীগের সেই ঐতিহ্য ও সম্মান কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এখন সর্বত্র শোনা যায় বর্তমান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সমালোচনা, দূর্নীতি ও অপকর্মের ফিরিস্তি যা আমাদেরমত অতীতের ছাত্রলীগ কর্মীদের কষ্ট দেয়। কেন এমন হলো এমন একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের।

ছাত্রলীগের বর্তমান কর্মকান্ড বিশ্লেষন করলে দেখা যায় সংগঠনটি অতীতের মত বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনা ধারন করে চলতে পারছেনা বলেই আজ এই অবস্থা। মুক্তিযোদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বিরোধীরা ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করেছে। দলের নাম ভাঙ্গিয়ে তারা চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী, দখলবাজী, টেন্ডারবাজী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তী বাণিজ্যের মত অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পরেছে। আদর্শ তাদের কাছে মূল্যহীন।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আদর্শের পরিবর্তে অর্থ, ভিত্ত বৈভবের দিকে ঝুকে গেছে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে বিভুর তারা। অনেকেই এই সংগঠনটিকে ব্যবহার করছে দামী গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ীর অধিকারী হওয়ার জন্য। আদর্শের চাইতে তাদের কাছে অর্থ ও ক্ষমতাই বড়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কোথাও সংগঠনের কাজে গেলে আজকে দামী গাড়ী ও প্লেনে যায়, বিলাস বহুল হোটেলে থাকে কিন্তু অতীতে তারা বাসে, নৌকায় কিংবা বাইসাইকেলে করে যেত।

কলেজ হোষ্টেলে কিংবা কর্মীদের বাড়িতে এক বিছানায় নেতাকর্মীরা রাত্রী যাপন করে সংগঠনে কাজ করত। তাতে করে নেতাকর্মীদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও পারস্পারিক সম্পর্ক গভীর থেকে গভীর হত। আজকে ছাত্রলীগের নেতাদের কর্মকান্ড, অর্থের মোহ গ্রাস করেছে নীতি ও আদর্শেকে। ব্যক্তিস্বার্থ দেশপ্রেমের পরিবর্তে আজ তাদের প্রধান লক্ষ্য।

ছাত্রলীগকে পূর্বের আদর্শ ও ঐতিহ্যে ফিরে আসতে হলে এই ধারা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে অর্থাৎ অর্থ ও ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে সততা ও নিষ্ঠার সহিত সংগঠনের কাজ করতে হবে। যদি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মীরা এই কাজটি করতে পারে তাহলে ছাত্রলীগ ফিরে পাবে তার পূর্বের ঐতিহ্য ও সম্মান।

ব্রেকিং নিউজঃ