| |

ইপিবির বাণিজ্য মেলা: আন্তর্জাতিক মেলার নামে দোকানদারি

আপডেটঃ 2:22 pm | January 25, 2020

Ad

গত ২৫ বছরে প্রায় ৭৫০টি আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নিয়েছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। সেই হিসাবে প্রতিবছর গড়ে বিভিন্ন দেশের ৩০টি মেলায় অংশ নিয়েছে সংস্থাটি। অথচ এ সংস্থাটি দেশে যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা বা ডিআইটিএফ আয়োজন করছে, তার চেহারা বছর বছর খারাপই হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রূপ তো নেই-ই, দেশের মধ্যে এ আয়োজন এখন বিশৃঙ্খল এক মেলায় রূপ নিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাণিজ্য মেলা এখন রূপ নিয়েছে দোকানদারিতে।

এ কারণে রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতান ও দোকানদারদের মধ্যে বাণিজ্য মেলাকে ঘিরে ক্ষোভ বাড়ছে ক্রমেই। তাঁরা বলছেন, বাণিজ্য মেলার নামে যে দোকানদারি চলছে, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাঁদের ব্যবসা। দুই যুগ পার করেও মেলাটি আন্তর্জাতিক তো নয়ই, পরিণত একটি বাণিজ্য মেলা হিসেবেও রূপ পায়নি। বিশ্বজুড়েই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার চরিত্র হচ্ছে এতে বিদেশি ক্রেতারা আসবেন, পণ্যের দরদাম করবেন, গুণগত মান যাচাই করবেন এবং নিজ দেশে ফেরার আগে পছন্দের পণ্যের ক্রয়াদেশ দিয়ে যাবেন। উল্টো দিক থেকে বিদেশি নানা পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটবে দেশীয় আমদানিকারকদের। অর্থাৎ এ দেশের আমদানিকারকেরা আমদানি পণ্য খুঁজতে বিদেশ না গিয়ে মেলার মাধ্যমে কাজটি করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় এ দুটি চরিত্রের কোনোটির প্রতিফলন কি আছে? যদিও হাতে গোনা কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ও খুচরা বিক্রির উদাহরণ দেখিয়ে আয়োজকেরাও বলে থাকেন দেশি-বিদেশি পণ্য প্রদর্শন, রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান এবং দেশি-বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনই এ মেলার উদ্দেশ্য।

মেলার রূপ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘রপ্তানি উন্নয়নে এ মেলা কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। কারণ, বিদেশি ক্রেতারা এখানে তেমন আসেন না। এ মেলা থেকে ক্রয়াদেশও তেমন আসে না। তাই এই বাণিজ্য মেলা আয়োজনের আদৌ প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সেটিই এখন ভাবার বিষয়। মেলা শেষে প্রতিবছর ইপিবির পক্ষ থেকে পণ্যের ক্রয়াদেশ পাওয়ার একটা হিসাব দেওয়া হয়, তা–ও প্রশ্নসাপেক্ষ। তাই এ মেলাকে বলা যেতে পারে টুকিটাকি পণ্যের কেনাকাটার বাজার।’

১৯৯৫ সাল থেকে ইপিবির উদ্যোগে বাণিজ্য মেলার আয়োজন শুরু।
বছরে গড়ে বিভিন্ন দেশের ৩০টি করে আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নিচ্ছে ইপিবি।
স্টল বরাদ্দ ও টিকিট বিক্রি থেকে বছরে ইপিবির আয় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা।

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা বা ডিআইটিএফ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। এ মেলার আয়োজক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত দপ্তর ইপিবি। নিজেরা দেশের মেলা আয়োজনের পাশাপাশি প্রতিবছর বিদেশের মেলায় অংশ নেন দপ্তরটির কর্মকর্তারা। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরেও যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, ব্রাজিল, রাশিয়াসহ বিশ্বের ২৫টি দেশে ৫৪টি আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করে রেখেছে ইপিবি। এর মধ্যে গত ছয় মাসে ৩৮টি মেলায় অংশ নিয়েছে দপ্তরটি।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রতিবছর মাসব্যাপী যে মেলাটি হয়ে আসছে, তাতে বিদেশি ক্রেতা কি চোখে পড়ছে? আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার যে আন্তর্জাতিক চরিত্র থাকে, সেটি কি ডিআইটিএফের আছে? মেলা ঘুরে ২০ জন বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও দর্শনার্থীকে এসব প্রশ্ন করে জানা গেছে, এটি আসলে বড় পরিসরে দোকানদারি ছাড়া কিছুই নয়। বরং এ দোকানদারির কারণে ঢাকায় সারা বছর যাঁরা দোকানদারি করেন, তাঁরা খুব অসুবিধায় থাকেন।

সৌদিপ্রবাসী সাইফুল ইসলাম ওরফে শাওনের সঙ্গে কথা হয় মেলা প্রাঙ্গণে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলায় আসেন তিনি। বলেন, গাউছিয়া, নিউমার্কেট ও চকবাজারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার তো পার্থক্য থাকা উচিত। অনেক দেশের মেলায় গিয়েছেন তিনি, কিন্তু এত বিশৃঙ্খল মেলা কোথাও দেখেননি। মেলায় বিদেশি স্টল কম বলেও অভিযোগ তাঁর।

মেলা ঘুরে দেখা যায়, এতে প্রসাধনসামগ্রী, খাদ্যসামগ্রী, হস্তশিল্প, গৃহস্থালি পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, খেলনা, স্যানিটারি পণ্য, বস্ত্র ও তৈরি পোশাক, স্টেশনারি দ্রব্যাদি কেনাবেচা হচ্ছে। দেশি স্টলে পোস্টার টাঙিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে আমদানি করা পণ্য। ঘুরতে ঘুরতে শোনা যায়, মাইকে ঘোষণা চলছে, ‘মাত্র পাঁচ মিনিটেই সাদা চুল কালো করা যায়।’ আরেকটু এগোতেই দেখা যায় হাতমাইকে ডাকাডাকি। ‘বড়-ছোট যেকোনো পণ্য মাত্র ১৩০ টাকা।’ ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাজিদ নিজেই জানান, বিভিন্ন কারখানা থেকে পণ্য কিনে বিক্রির জন্য তাঁরা মেলায় এনেছেন।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগ দেশি স্টলে রপ্তানিমুখী পণ্য নেই। বরং রপ্তানিমুখী পণ্যের যেগুলোর গুণগত মান ভালো নয় অর্থাৎ রপ্তানিযোগ্য নয়, সেগুলো মেলায় প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে যেসব পণ্য রপ্তানি হয়, সেসব পণ্যের হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। মেলায় ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি ব্যবহার্য পণ্য, নারীদের পোশাক এবং বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী বিক্রি হচ্ছে বেশি। আর বিদেশি যে কয়েকটি স্টল বসেছে, তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে যেসব পণ্য তারা নিয়ে এসেছে, সেগুলো বিক্রি করে যাওয়া।

দর্শনার্থীরা বিরক্ত

প্রতিবছরের মতো এবারও মেলায় আসা চিকিৎসক শারমিন জোয়ারদার বলেন, মাইকের শব্দদূষণে মেলায় টেকা কষ্টকর। তাই আগামী মেলায় অন্তত এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান তিনি।

মেলায় কোনো সভা-সেমিনারের আয়োজন নেই। আবার পণ্য প্রদর্শনের নীতিমালাও মানা হচ্ছে না। যেমন স্থানীয় স্টলে প্রদর্শিত হচ্ছে বিদেশি পণ্য। আবার ফুটপাতের মতো ডাকা হচ্ছে ‘দেইখ্যা লন, বাইছা লন। এক দাম ১৩০’। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি অবশ্য এবারের মেলার উদ্বোধনীর আগে বলেছিলেন, নিম্নমানের পণ্য বিক্রি হওয়ায় জৌলুশ হারিয়েছে ডিআইটিএফ।

বাণিজ্যসচিব মো. জাফরউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, আগামী বছর মেলা হবে পূর্বাচলে। তখন মেলা আয়োজনে যথেষ্ট যত্ন নেওয়া সম্ভব হবে। আগামী বছর শব্দদূষণসহ সমস্যাগুলোও থাকবে না।

তবে বাণিজ্যসচিবের আশ্বাসের প্রতি আস্থা রাখতে চান না মেলায় আগত ঢাকা লিবার্টি কলেজের অধ্যক্ষ আশরাফুল আযম খান। তিনি বলেন, জন্মের বেঁটেকে টেনে লম্বা করা যায় না। ২৫ বছরে যা হয়নি, তা হবে এক বছরে—এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। মেলার চেহারার আমূল পরিবর্তন করতে হলে সুষ্ঠু পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।

মেলা থেকে ইপিবির আয়

ব্যবসায়ীরা বলছেন, রপ্তানিবাজার অনুসন্ধানের চেয়ে বাণিজ্যই এখন ইপিবির অন্যতম উদ্দেশ্য। ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মেলার আয়োজন করে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা নিট আয় করে ইপিবি। তাই ব্যবসায়ীদের দাবি, বাণিজ্যের বদলে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখা উচিত ইপিবির।

ব্রেকিং নিউজঃ