| |

আসামে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন

আপডেটঃ 7:00 pm | February 04, 2020

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বায়ান্নের পথ ধরে আমাদের পূর্বসূরী বাংলা ভাষা প্রেমিক বাঙ্গালীরা মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতের আসামে। তারাও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বুলেটবিদ্ধ হয়ে আত্মহতি দিয়েছিল।

১৯৬১ সালের ১৯মে আসামের শিলচর রেলস্টেশনে মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে অহিংস আন্দোলনে যোগ দেয় হাজার হাজার প্রতিবাদি মানুষ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে উজ্জেবিত হয়ে অসমিয়া ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষার মর্যাদার দাবিতে আন্দোলনে অংশগ্রহন করে আসামের বাঙ্গালীরা। দেশ বিভাগের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে বাঙ্গালীদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সাহিত্য সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। আসামের শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে গড়ে উঠে বাঙ্গালী জনপদ।

যাদের ভাষা এবং সাহিত্য, সংস্কৃতির বাহন হিসেবে বাংলা ভাষা আসামের সমাজ ও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এমতবস্থায় ১৯৫০ সালে আসামে একসময় গড়ে উঠে “বাঙ্গাল খেদাও” আন্দোলন। যার নেতৃত্বে ছিল উগ্রবাদি অসমিয়া সম্প্রদায়। তারা অসমিয়া ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম ও সরকারি ভাষারূপে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সচেষ্ঠ হয়।

১৯৪৮ সালের মে মাসে গোহাটি শহরে তারা বাঙ্গালীদের উপর আক্রমন চালায়। ১৯৬০ সালে ৩ মার্চ আসামের তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা বিধানসভায় অসমিয়াকে আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষারূপে ঘোষনা করা হবে বলে জানায়। উক্ত ঘোষনার প্রতিবাদে ১৯৬০ সালে ১৬ এপ্রিল শিলচরে বাংলা ভাষাভাষি বাঙ্গালীরা এক প্রতিবাদ সমাবেশের আহ্বান করে।

উক্ত সভা থেকে অসমিয়া ভাষা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলার জন্য প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন অধ্যাপক শরৎ চন্দ্র নাথ। শিলচরে ২ ও ৩ জুলাই চপলাকান্তের সভাপতিত্বে নিখিল আসাম বাংলা ভাষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবি জানানো হয় এবং কাজি নজরুল ইসলামের “দূর্গমগিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার” গানটি গেয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়।

এইভাবে বাংলা ভাষার স্বপক্ষে আসামে চলতে থাকে নানা কর্মসূচি। ১৯৬০ সালে ১০ অক্টোবর আসাম রাজ্যের সর্বত্র অসমিয়া ভাষা প্রয়োগের জন্য সভায় ভাষা বিল উত্থাপন ও পাশ হয়। আসামের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী অধিবাসিদের বাংলাকে সরকারি ভাষা করার মৌলিক অধিকারের দাবি অগ্রাহ্য করা হয়।

বাংলা ভাষার দাবিতে বাংলা ভাষার স্বপক্ষের শক্তি সমূহ সংগঠিত হয়ে গঠন করে সংগ্রাম পরিষদ। পন্ডিত রাজমোহন নাথের সভাপতিত্বে ১৮, ১৯ ও ২০ নভেম্বর শিলচরে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল সম্মেলন। সেই সম্মেলনে স্বিদ্ধান্ত গ্রহন হয় যদি বাংলা ভাষাকে অসমিয়া ভাষার সমমর্যাদা দেওয়া না হয় তাহলে বাংলা অধ্যূষিত অঞ্চলগুলো বৃহত্তর আসাম হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরবে।

পরে শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দির গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিদের নিয়ে কাছাড় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হয় ১৩৬৭ বঙ্গাব্দের ৩০ শে চৈত্রের মধ্যে ভাষা আইন সংশোধন করে বাংলাকে পূর্ণ মর্যাদা না দেওয়া হলে ১৩৬৮ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ থেকে অহিংস গন আন্দোলন শুরু করা হবে। পূর্ব ঘোষনা অনুযায়ী ১৯৬১ সালের ১৮মে রাত ১২টার পর থেকে প্রায় ১০ হাজার তরুন তরুণী শিলচর রেলষ্টেশনে অবস্থান ধর্মঘট করার জন্য সমবেত হয়। ১৯মে শুরু হয় তুমুল আন্দোলন।

জনতার প্রতিরোধে সরকার ট্রেন চালাতে ব্যার্থ হয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে অংশগ্রহন কারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। পুলিশ এদের অনেক কেই গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাসের পাশাপাশি পুলিশের সাহায্যে এগিয়ে আসে অনেক অসমিয়া রেলকর্মচারী। বেলা আড়াইটার দিকে রেলস্টেষনে কর্তব্যরত বিএসএফ এর সদস্যরা শুরু করে গুলি বর্ষণ।

সাথে সাথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে ৯ জন বাঙ্গালী। তারা হলেন সুনিল সরকার, সুকোমল পুরকায়স্ত, কুমুদ দাস, চন্ডীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, হিতেশ বিশ্বাস, শচীন্দ্র পাল, কানাই নিয়োগী ও কমলা ভট্টাচার্য। পরের দিন রেলষ্টেষনের পুকুর থেকে সত্যেন্দ্রকুমার দেবের বুলেটবিক্ষত দেহ উদ্ধার করা হয়। রাতে হাসপাতালে মারা যায় বীরেন্দ্র সূত্রধর। বাংলা ভাষার জন্য জীবন দান কারীদের সংখ্যা মোট ১১জনে দাড়ায়। উত্তাল ও ঘটনাবহুল দিন ছিল ১৯মে।

আসাম প্রশাসন কারফিউ জারি করে। গ্রেফতার করা হয় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষকে। এত অত্যাচার ও নিপিড়নের পরেও খান্ত হয়নি আন্দোলন কারীরা। তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রশাসনিক স্বীকৃতি দিতে আসাম কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়। ১১জন ভাষা শহিদের রক্তের বিনিময়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রি সংশোধণী আইনে কাছাড় জেলায় বাংলা ভাষার অধিকারকে স্বীকার করে নেয়। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হলো বাংলা ভাষার। প্রতি বছর ১৯মে ভাষা শহীদদের স্বরণে আসামে ভাষা দিবস পালন করা হয়।

ব্রেকিং নিউজঃ