| |

বাংলাভাষা আন্দোলন (পর্ব-০১)

আপডেটঃ ৪:৪৮ অপরাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২০

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ বাংলাভাষা আন্দোলন ছিল ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত। তৎকালীন পূর্ব বাংলার তথা পূর্ব পাকিস্তানে সংগঠিত একটি সাংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলন। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির উর্দূ ভাষার পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদানের বাংলাভাষীদের গনদাবির বহিঃপ্রকাশ।

১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রয়ারী বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারন করলেও এর বীজ রূপিত হয়েছিল দ্বিজাতি তত্তে¡র ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির সৃষ্টির পরেই। অন্যদিকে এর প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল ছিল সূদুরপ্রসারী।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতী তত্তে¡র ভিত্তিতে বৃটিশ ভারত দুভাগে বিভক্ত হয়ে একটি পাকিস্তান ও অন্যটি ভারত নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ছিল দুই অংশে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। ২ হাজার কি.মি দূরত্বে অবস্থিত।

পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান নামক দুই অংশের সাংস্কৃতি, ভৌগলিক ও ভাষাগত পার্থক্য ছিল বিরাজমান। স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিতি পরে ১৯৪৮ সালে যখন পাকিস্তান সরকার উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহন করার স্বিদ্বান্ত নেয় তখন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী জনগনের মাঝে সৃষ্টি হয় গভির ক্ষোভ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী মানুস আকস্মিক ও অন্যায্য এই স্বিধান্তকে মানষিকভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলনা। ফলসরূপ বাংলা ভাষার সমমর্যাদার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনের দানা বেধে উঠে। আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে।

ঢাকা শহরে মিছিল সমাবেশ বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রয়ারী (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ সন) এ আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি মিছিলটি এসে পৌছলে ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে পুলিশ আন্দোলনকারীদের উপর গুলিবর্ষন করে। গুলিতে বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে রফিক, সালাম, এম এ ক্লাসের ছাত্র বরকত ও আব্দুল জব্বারসহ আরও অনেকে নিহত হন।

আহত হয় ১৭জন ছাত্র যুবক। রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠে ঢাকার রাজপথ। এই ঘটনার প্রতিবাদে সমগ্র পূর্ব বাংলায় (পূর্ব পাকিস্তান) তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পরে। ২১শে ফেব্রয়ারীর ভাষার দাবিতে প্রতিবাদকারী ছাত্রদের হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। ২২ ও ২৩ ফেব্রয়ারী ছাত্র, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক ও সাধারন জনতা হরতাল পালন করে এবং সভা শুভাযাত্রা সহকারে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে।

২২ শে ফেব্রয়ারী পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শফিউর রহমান শফিক, রিক্সা চালক আওয়াল এবং এক কিশোর। ২৩ ফেব্রæয়ারী ফুলবাড়িয়ায় ছাত্র জনতার প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ আবারও অত্যাচার নিপিড়ন চালায়। ভাষা আন্দোলনের শহীদ স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে ছাত্ররা রাতারাতি গড়ে তুলে শহিদ মিনার যা ২৪ ফেব্রয়ারী উদ্ধোধন করেন শহীদ শফিউর রহমানের পিতা।

২৬শে ফেব্রয়ারী আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্ধোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দিন। ক্রমবর্ধমান গন আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৪ সালের ৭ই মে পাকিস্তান গনপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহিত হয়।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণিত হলে ২০১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দূকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহন করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা প্রবর্তিত হয়। সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৭ সালে বাংলাভাষা প্রচলন আইন জারি করে।

১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন মানুষের ভাষা ও কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে একুশে ফেব্রæয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে ঘোষনা করে। যা আজ বিশ্বের অপরাপর দেশেও গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সাথে উদযাপন করা হয়।

ব্রেকিং নিউজঃ