| |

বাংলাভাষা আন্দোলনের পটভূমি (পর্বঃ ০১)

আপডেটঃ 4:57 pm | February 08, 2020

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র দুটি ব্রিটিশ শাসনাধীন অভিভক্ত ভারতবর্ষের অন্তর্ভোক্ত ছিল। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি উর্দু ভাষাটি কিছু সংখ্যক মুসলীম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ধর্মীয় নেতা যেমন: স্যার খাজা সলিমুল্লাহ, স্যার সৈয়দ আহমেদ খান, নবাব ওয়াকার উল মুলক এবং মৌলবী আব্দুল হক প্রমুখের প্রচেষ্ঠায় ভারতীয় মুসলমানরা একটি বিশেষ মাত্রায় উপনিত করে।

পার্র্সিক আরবি লিপির কারণে উর্দুকে ভারতীয় মুসলমানদের ইসলামী সাংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে তৎকালীন মুসলীম জনগোষ্ঠী বিবেচনা করত ব্যতিক্রম ছিল বাংলাভাষাভাষী মুসলীম জনগোষ্ঠী।

উত্তর ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে উর্দুর ব্যবহার ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভ করে। শুধুমাত্র পূর্বাঞ্চলের একটি প্রদেশের মুসলমানরা বাংলাভাষাকে তাদের প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল।

বাংলা ভাষার সমর্থকরা ভারত ভাগের পূর্বেই উর্দুর বিরোধীতা শুরু করে। ১৯০৭ সালে মুসলীম লীগের লকেèৗ অধিবেশনে বাংলা সভ্যরা উর্দুকে ভারতের মুসলীমদের ক্ষেত্রে একমাত্র ভাষা হিসেবে মনোনয়নের প্রস্তাবটি প্রত্যাখান করে।

মুসলিমলীগ ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি রাজনৈতিক দল। যা ভারত বিভাজনের সময় পাকিস্তানকে একটি মুসলীম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রস্তাব করেন আর শেরে বাংলা এ কে এম ফজলুল হক এর বিরোধীতা করেন। উর্দু নিয়ে বিরোধীতা আবার শুরু হয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম নিশ্চিত হওয়ার পর ১৯৪৭ সালের ৭ই মে তারিখে খলিকুজ্জামান ও জুলাই মাসে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করেন ড. মো: শহিদুল্লাহ ও মো: এনামুল হক সহ বেশ কজন বুদ্ধিজীবি। প্রবন্ধ লিখে এর প্রতিবাদ জানান।

১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এই সিদ্ধানের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান গনপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গনপরিষদে উর্দু ও ইংরেজীর পাশাপাশি বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি জানায়।

সংসদ সদস্য প্রেমহরি বর্মন, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ চট্টপাধ্যায় এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানায়। তারা পূর্বপাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। তাদের এ সমর্থনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী জনগনের মতামত প্রতিফলিত হয়েছিল।

তমিজউদ্দিন খানের নেতৃত্বে পরিষদের সকল মুসলমান সদস্য যারা সবাই মুসলীম লীগের ছিল তারা একযোগে এ প্রস্তাবের বিরোধীতা করে। খাজা নাজিম উদ্দিন এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করে বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন, “পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চায় রাষ্ট্রভাষা উর্দু হউক”।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এ প্রস্তাবটিকে পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্ঠা বলে উল্লেখ করেন। উর্দুকে লক্ষ্য কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে তিনি বলেন “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবলমাত্র উর্দুই হতে পারে” অনেক বিতর্কের পর সংশোধনীটি ভোটে বাতিল হয়ে যায়।

সংসদীয় দলের আপত্তির কারণে অনেক বাঙ্গালী মুসলমান সদস্যরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উপস্থাপিত সংশোধনীটিকে সমর্থন করতে পারেনি। গণপরিষদের ঘটনায় প্রথম প্রতিক্রিয়া শুরু হয় ঢাকায়। ২৬ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও জগন্যাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন ছাত্রদের উদ্যোগে ঢাকা শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করেন।

২৯ ফেব্রুয়ারী তারিখেও ধর্মঘট ঘোষিত হয়। এবং ঐ দিন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদ দিবস ও ধর্মঘট পালন করা হয়। সরকারের প্ররোচনায় পুলিশ মিছিলে লাঠি চার্জ করে এবং অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে। তমুদ্দুন মজলিস ঐ সময়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফজলুল হক হলে ছাত্র বুদ্ধিজীবিদের এক সমাবেশ ঘটে।

ঐ সভায় দ্বিতীয় বারের মত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। শামসুল আলম আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়। এই পরিষদে অন্যান্য সংগঠনের ২জন করে প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সেখান থেকে ছাত্ররা ১১ই মার্চ ধর্মঘট আহ্বান করে এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তার সাহসী ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানান।

১১ মার্চের কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য ১০ মার্চ ফজলুল হক হলে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ মার্চ ভোরে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছাত্ররা বের হয়ে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট পালিত হয়। সকালে ছাত্রদের একটি দল রমনার ডাক ঘরে গেলে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

ছাত্রদের আর একটি দল রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সচিবালয়ের সামনে নবাব আব্দুল গণি রোডে পিকেটিংএ অংশ নেন। তারা গনপরিষদ ভবন (ভেঙ্গে পরা জগন্নাথ হলের মিলনায়ত) প্রধান মন্ত্রীর বাসভবন, বর্ধমান হাউস (বর্তমান বাংলা একাডেমী), হাইকোর্ট ও সচিবালয়ের সামনে দাড়িয়ে অফিস বর্জনের জন্য সবাইকে চাপ দিতে থাকেন।

ফলে বিভিন্ন স্থানে তাদের পুলিশের লাঠি চার্জের সম্মুখিন হতে হয়। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা খাদ্যমন্ত্রী সৈয়দ মোঃ আফজাল ও শিক্ষামন্ত্রী আব্দুল হামিদকে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। বিক্ষোভ দমনের জন্য সরকার সেনাবাহিনী তলব করেন। পূর্ব পাকিস্তানের জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং বিগ্রেডিয়ার আইয়ুব খান (পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি) মেজর পীরজাদার অধীনে একদল পদাতিক সৈন্য নিয়োগ করেন এবং স্বয়ং গণপরিষদে গিয়ে খাজা নাজিমউদ্দিনকে বাবুর্চিখানার মধ্যে থেকে বের করে আনেন।

বিকেলে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হলে পুলিশ সভা পন্ড করে দেয় এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, শওকত আলী, কাজি গোলাম মাহবুব, রওশন আলম, রফিকুল আলম, আব্দুল লতিফ তালুকদার, শাহ মোঃ নাসির উদ্দিন, নুরুল ইসলাম প্রমুখ। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন নইমুদ্দিন আহমেদ।

ব্রেকিং নিউজঃ