| |

অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

আপডেটঃ 5:07 pm | February 18, 2020

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ আগামী ১৭ই মার্চ ২০২০ থেকে ১৭ই মার্চ  ২০২১ সাল পর্যন্ত বর্ষব্যাপী উদযাপিত হবে মুজীব শতবার্ষিকী উৎসব। বাঙ্গালী ভাষাভাষী অসাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠীর সর্বাধিক আস্থা ছিল যে নেতার উপর তিনি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৪২ সালে ফরিদপুর থেকে মেট্রিকোলেশন পাশের পর কলকাতায় ইসলামীয়া কলেজে ভর্তী হন শেখ মুজিব। সেই সময়ে তরুণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তার পরিচয় গভীর থেকে গভীরতর হয় হুসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে।

উনি থাকতেন কলকাতার বেকার হোস্টেলে। হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন অভিবক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। শেখ মুজিবুর রহমান সে সময় হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সার্বক্ষনিক রাজনৈতিক সঙ্গী ছিলেন। দেশ বিভক্তিকে কেন্দ্র করে ১৯৪৬ সালে হিন্দু, মুসলীমের মধ্যে এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত হয়।

কলকাতা, ঢাকাসহ ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় দাঙ্গা ছড়িয়ে পরে। বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্বজীবনীতে সেই দাঙ্গার কথা এইভাবে তুলে ধরেছেন যে, “কলকাতা শহরে শুধু মরা মানুষের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পরে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ছে এক ভয়াবহ দৃশ্য, মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে চিন্তা করতেও ভয় হয়”।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার এই ভয়াবহতা বঙ্গবন্ধু প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছ থেকে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের ছয় ভাই বোন তখন কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। নিয়মিত তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হত না। তাই তিনি তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্ধিগ্ন থাকতেন।

কখন কি হয় এই চিন্তা উনার মধ্যে কাজ করত। যা দাঙ্গা কবলিত মানুষের অনুভূতিগুলি তাকে উপলব্ধী করতে সহায়তা করেছে। দাঙ্গা কলকাতা, ঢাকা ও বিহারে ছড়িয়ে পরে ব্যাপকভাবে। শেখ মুজিব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিয়ে পাটনায় যান ত্রান শিবির পরিচালনা ও আহত নির্যাতিত মানুষকে সাহায্য করার জন্য।

সে সময় তিনি উপলব্ধী করেন মানুষের মানবিক বিপর্যয় কত ভয়াবহ এবং কষ্টের। খুব কাছ থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের দুঃখ,বেদনাকে উপলব্ধী করেছেন প্রত্যক্ষভাবে।

তারি প্রতিক্রিয়ায় এভাবেই একজন মানবিক গুন সম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক মুজীব হিসেবে গড়ে উঠেন তিনি। দেশ বিভক্তির পর পূর্ব পাকিস্তানের জনগন যখন বুঝতে পারে তাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে তখন শেখ মুজীব ও মাওলানা ভাসানীসহ অপরাপর বাঙ্গালী নেতৃবৃন্দ মুসলীম লীগ থেকে বিভক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম গঠন করে।

১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলীম লীগকে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নামাকরণ করা হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগ থেকেও তৎকালীন সময়ে মুসলীম শব্দটি পরিত্যাগ করা হয়।

যার নেপথ্যে ছিলেন শেখ মুজিব সহ অপরাপর অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী নেতৃবৃন্দ। এই ভাবেই তরুণ শেখ মুজিব ও তার সহকর্মীদের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ড শুরু হয়। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে তৎকালীন মুসলীম লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয় ভয়াবহ দাঙ্গা। এক তরফাভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘর পুড়ে দেওয়া হয়। হত্যা করা হয় অসংখ্য শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ নিরীহ হিন্দুদের।

নির্যাতিত হয় শত শত হিন্দু নারী। খুলনা, নারায়নগঞ্জ, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ সারা পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পরে। যে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা ছড়ানো হয় তাহল কাশ্মিরের হযরতবাল মসজিদ থেকে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর পবিত্র চুল উধাও হয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে।

তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এই কাজটি হিন্দু কাফেরদের বলে দায়ী করে প্রচারনা চালায়। যার ফলশ্রুতিতে হাজার হাজার মাইল দূরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সংখ্যালঘু অধ্যূষিত এলাকায় হিন্দুদের উপর আক্রমন চালানো হয়। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও সংখ্যালঘু নারীরা ধর্ষনের শিকার হয়।

খুলনায় অবাঙ্গালী শ্রমিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলসমূহের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম এই দাঙ্গার সূত্রপাত হয় এবং ক্রমশ তা গোটাপূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পরে। পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের জীবন নিরাপত্তাহীনতায় নিপতিত হয়। ৭ই জানুয়ারী এই ভয়াবহ দাঙ্গাটি নারায়নগঞ্জসহ ঢাকায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পরে।

নারায়নগঞ্জের আদমজী জুট মিলে অবাঙ্গালীরা সংখ্যালঘু হিন্দু শ্রমিকদের নির্মমভাবে হত্যা ও তাদের পরিবার পরিজনদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। ১৪ই জানুয়ারী নারায়নগঞ্জের দাঙ্গা ভয়াবহ আকার ধারন করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর থেকে লন্সে করে লাঠিয়াল ও দলীয় ভলান্টিয়ার নিয়ে নারায়নগঞ্জে উপস্থিত হন এবং “রুখে দাড়াও দাঙ্গাবাজদের”বিরুদ্ধে এই আবেদন নিয়ে দাঙ্গা বন্ধ করতে বলেন।

পাশাপাশি তিনি দাঙ্গাকারীদের হুশিয়ার করে বলেন দাঙ্গা বন্ধ না করলে তাদের বিরুদ্ধে তিনি সশ্বস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। তার এই হুশিয়ার বানীতে দাঙ্গাবাজরা পিছু হটে ও দাঙ্গা বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে আহত হিন্দু শ্রমিক ও তাদের পরিবারবর্গকে দেখতে যান এবং নিহত শ্রমিকদের পরিবারবর্গকে সাহায্য ও শান্তনা প্রদান করেন। ১৫ই জানুয়ারী থেকে সংখ্যালঘুদের দাঙ্গাপিরিত এলাকা থেকে সরিয়ে ঢাকার ওয়ারীতে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করার কাজ শুরু করেন শেখ মুজিব। এসময় দাঙ্গাবাজ দূর্বৃত্তরা শেখ মুজিবুর রহমানের উপর আক্রমান চালায়।

তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। সাম্প্রদায়িতকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমৃদ্ধ একজন “মুজীবের” সৃষ্টি হয়। যার বহিপ্রকাশ পরবর্তীতে উনার রাজনৈতিক জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ধর্ম নিরপেক্ষতার সংযোজন তারি বহিপ্রকাশ। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বাঙ্গালীর সাংস্কৃতি ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের পথ চলার প্রধান নীতি। তাই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে একজন হিন্দু কবি, কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” কবিতাটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহন করেন।

বাংলা ও বাঙ্গালীর প্রশ্নে উনার কাছে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে কোন বিভেদ ছিলনা। পাকিস্তান আমলের ধারাবাহিকতাকে পরিত্যাগ করে স্বাধীন বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা বঙ্গবন্ধুকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য করেছে।

আমরা আমাদের জীবদ্দশায় এমন একজন সর্বশ্রেষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক নেতার জন্মশতবার্ষিকী পালন করার সুযোগ পেয়ে গর্বীত। স্বশ্রদ্ধ সালাম জানাই আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার জন্মশতবার্ষিকীতে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু

ব্রেকিং নিউজঃ