| |

ময়মনসিংহের বিপিন পার্কে ভাষার দাবিতে প্রথম প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল

আপডেটঃ 7:52 pm | February 19, 2020

Ad

প্রদীপ ভৌমিকঃ ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের যে কয়টি মহকুমা ও জেলা শহর বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনমূখর ছিল তার মধ্যে ময়মনসিংহ জেলা অন্যতম। তৎকালীন মুসলিমলীগের প্রবল প্রতিদ্ধন্দিতার মুখেও ময়মনসিংহের ভাষা আন্দোলনের সমর্থক নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার দাবিতে সাহসী ও গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায় সদ্যপ্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগের ময়মনসিংহের আহ্বায়ক রফিক উদ্দিন ভূইয়া ময়মনসিংহ জেলায় ভাষা আন্দোলনে অগ্রসৈনিকের ভূমিকা পালন করেন।

তার সভাপতিত্বে ১৯৪৭ সালে ডিসেম্বর মাসে ময়মনসিংহ শহরের জুবলীঘাটস্থ বিপিন পার্কে রাষ্ট্রভাষার পক্ষে এক ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এটাই ছিল বাংলা ভাষা আন্দোলনের ময়মনসিংহ শহরে প্রথম প্রতিবাদ সভা। ১১ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি প্রদানের দাবিতে সারা পূর্ব পাকিস্তানেরমত ময়মনসিংহ জেলায় পূর্ণ হরতাল পালন করা হয়। ভাষার দাবিতে বিপিন পার্কে ছাত্র জনতার মিছিল শেষে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ২৫শে মার্চ আবারও বিপিন পার্কে ছাত্রজনতার একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন রফিক উদ্দিন ভূইয়া। সভা চলাকালে পাকিস্তানি পুলিশ লাঠি চার্জ ও কাদাঁনে গ্যাস ছুড়ে সভাটি ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্ঠা চালায়।

পাকিস্তানি পুলিশকে সহযোগিতা করে মুসলীম লীগের গুন্ডারা। হামলায় আহত হয় ভাষা আন্দোলনের কয়েকজন সৈনিক। বাংলা ভাষাকে উর্দূর সমমর্যাদার দাবিতে পূর্ব বাংলার সর্বত্র আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। এ অবস্থা সামাল দিতে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে পাকিস্তান প্রশাসন।

মিছিল সমাবেশ বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয় ঢাকা শহরে। কিন্তু ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ময়মনসিংহে সভা সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারী সরকারের ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বাংলা ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও প্রগতিশীল জনতা রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকে। এসময় পুলিশ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অপরাধে ছাত্র জনতার উপর গুলি বর্ষন করে।

গুলিতে নিহত হন ময়মনসিংহের গফরগাওয়ের আব্দুল জব্বার সহ রফিক, সালাম, বরকত। এ খবর ময়মনসিংহে এসে পৌছলে ময়মনসিংহ জেলা শহরসহ সব মহকুমা ও থানা সদরগুলিতে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠে। ঢাকায় ছাত্র হত্যার সংবাদে ক্ষুদ্ধ ময়মনসিংহ শহরসহ জেলার সর্বত্র প্রতিবাদমূখর হয়ে উঠে ছাত্রজনতা। ২২শে ফেব্রুয়ারী শহরের রাস্তায় নেমে আসে তারা। ইতিপূর্বে ময়মনসিংহে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়েছিল। যার আহ্বায়ক ছিলেন আনন্দমোহন কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক সৈয়দ বদরুদ্দিন হোসাইন ও সদস্য সচিব ছিলেন রফিক উদ্দিন ভূইয়া।

অপরাপর সদস্যরা ছিলেন ফুলপুরের সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক, আহামদ সালেক, সাবেক ন্যাপ নেতা কফিল উদ্দিন লাল মিয়া, রজব আলী ফকির যিনি পরবর্তীতে ফুলপুর থেকে পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতা করার দায়ে যুদ্ধ অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত, আব্দুর রহমান সিদ্দিক, আব্দুর রশিদ খান যিনি ভাষা আন্দোলন চলাকালীন সময়ে গ্রেফতার হয়ে জেল খাটেন।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কমিটিতে সংযুক্ত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক ঈশ্বরগঞ্জের গর্বীত সন্তান খালেক নেওয়াজ খান। বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযোদ্ধ চলাকালীন সময়ের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সলিমুল্লাহ মুসলীম হলের ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ভালুকার সাবেক এমপি তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা এম এ মতিন যিনি ভাষা আন্দোলন চলাকালীন সময়ে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন।

আমাদের জানা মতে যারা ভাষা আন্দোলনের সাথে ময়মনসিংহে জড়িত ছিল সেই সব নেতাদের অধিকাংশই আজ পরলোকে। তাই ময়মনসিংহ জেলার ভাষা আন্দোলনের পূর্নাঙ্গ ইতিহাস আমাদের জানা না থাকায় অনেক সংগ্রামী নেতাদের নাম প্রকাশা করা গেলনা। ময়মনসিংহের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের পক্ষে পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারীতে সভাসমাবেশগুলিতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি, গুলি বর্ষন নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি, নুরুল আমিন মন্ত্রী সভার পদত্যাগ, নিহিত পরিবারবর্গকে ক্ষতিপূরন প্রদানের দাবি ও আটক ছাত্রজনতার মুক্তির দাবিতে বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রতিটি মহকুমায় সংগ্রাম কমিটি গঠন করে আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকেন বদর উদ্দিন হুসাইন ও রফিক উদ্দিন ভূইয়ার নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি। ২৩ ফেব্রুয়ারী ময়মনসিংহ শহরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র সাধারন হরতাল পালিত হয়। দোকানপাট, যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে।

লক্ষনীয় বিষয় ছিল সেই সময় ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহন ছিল ব্যাপকহারে যা সেই সময়ে প্রশাসনের কাছে ছিল অকল্পনীয়। মুসলীম বালিকা বিদ্যালয়, বিদ্যাময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রাধাসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয় সমূহ থেকে ব্যাপকহারে ছাত্রীরা প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহন করে। সমগ্র ময়মনসিংহ শহর পরিণত হয় প্রতিবাদী শহরে। “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” “জিন্নার নির্দেশ মানি না মানবনা” “নুরুল আমিনের মাথা চাই রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” প্রভৃতি স্লোগানে স্লোগানে মূখরীত হয় ময়মনসিংহের রাজপথ।

পোষ্টারে পোষ্টারে ছেয়ে যায় শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ন স্থানসমূহ। অধিকাংশ পোষ্টার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা হাতে লিখে সরবরাহ করত আন্দোলনরত নেতৃবৃন্দের কাছে। ২৪ ফেব্রুয়ারী ছুটির দিন সত্ব্যেও চিরচেনা ময়মনসিংহ শহরের পথে পথে রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বীকৃতির দাবিতে স্লোগান আর প্রতিবাদ মিছিল করতে থাকে ছাত্রজনতা। সবার বুকে কালো ব্যাজ। প্রতিষ্ঠানগুলিতে কালো পতাকা।

রফিক উদ্দিন ভূইয়ার ভাষ্য মতে আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মুসলীম লীগ টাউনহল মাঠে এক সভার আয়োজন করে কিন্তু ময়মনসিংহের বিক্ষিপ্ত জনতার প্রতিবাদে সভার উদ্যোক্তারা সভাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়। এমনকি উদ্যোক্তাদের কয়েকজন বিক্ষোপ্ত জনতার হাতে লাঞ্চিত হয়। জেলা শহরে সৃষ্টি এই আন্দোলন মহকুমা থানা ছাড়িয়ে গ্রামে-গঞ্জে পৌছে যায়। গোটা ফেব্রুয়ারী মাসব্যাপী আন্দোলন চলতে থাকে।

এই অচল অবস্থা কাটাতে প্রশাসন ব্যাপক গ্রেফতারের পরিকল্পনা ও দমননীতির স্বিদ্ধান্ত নেয়। ২৮ ফেব্রুয়ারীনাগাত রফিক উদ্দিন ভূইয়াসহ সংগ্রাম কমিটির অধিকাংশ সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়। ভাষা আন্দোলনে ময়মনসিংহের ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও ১৯৫৩ সালে প্রথম শহীদ মিনার তৈরি হয় বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের সংলগ্ন বকুল তলায় কিন্তু পুলিশ সেই শহীদ মিনারটি পরবর্তীতে ভেঙ্গে দেয়।

একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ময়মনসিংহ টাউনহল প্রাঙ্গণে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মিত হয়। অতীতের সেই অস্থায়ী শহিদ মিনারের স্থানটি বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ইকরামুল হক টিটু দৃষ্টিনন্দন করে একটি স্থাপনা নির্মান করেছেন যা অতীতের সেই ভাষা আন্দোলনের কথাকে মনে করিয়ে দেয়। আর এক ভাষা সৈনিক শামসুল হক বলেন, ময়মনসিংহের প্রাচীন বিদ্যাপিঠ আনন্দমোহন কলেজের তৎকালীন বরেণ্য শিক্ষক তাদের উৎসাহ ও ছাত্রদের দেশপ্রেমের উপলব্ধী থেকেই বাংলা ভাষার আন্দোলন ময়মনসিংহে তীব্রভাবে সঞ্চালিত হয়েছিল।

ময়মনসিংহ এলাকার যে সকল ছাত্র রাজধানী ঢাকায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন তারা ভাষা আন্দোলনে সর্বাত্তক অংশগ্রহন করেছিলেন। জেলায় আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। কালের বিবর্তনে জুবলীঘাটের সেই আন্দোলনের পিঠস্থান বিপিন পার্কটি বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ইকরামুল হক টিটু মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরে বিপিন পার্কটিকে পূনসংস্কার করে আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ব্যাবস্থা করেছেন।

উনি ভাষা সৈনিকদের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য টাউনহল মাঠে “ভাষা সৈনিক শামসুল হক মঞ্চ”, টাউনহল মোড়ে “ভাষা সৈনিক সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্কয়ার”, জয়নুল আবেদিন পার্কে “ভাষা সৈনিক মোস্তফা মতিন স্মৃতি পাঠাগার”, “মুক্তিযোদ্ধা ভাষা সৈনিক রফিক উদ্দিন ভূইয়া স্টেডিয়াম” নির্মান করেছেন যাতে করে ময়মনসিংহের আগামী প্রজন্ম তাদের পূর্বসূরীদের ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ওয়াকেবহাল থাকে।

ব্রেকিং নিউজঃ