| |

‘৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালী জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য’

আপডেটঃ ২:১৯ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ০৭, ২০২০

Ad

বাংলা ভাষায় সর্বকালের সেরা ভাষণ। ৪৬ বছর ধরে বিশ্বের কোটি মানুষ হয়ত শহস্র কোটিবার শুনেছেন, দেখেছেন সেই ভাষণ৷ রক্তঝরা একাত্তরের ৭ই মার্চের সেই ভাষণ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালির মানসে। আজ ৭ই মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) ঐতিহাসিক সেই ভাষণ দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৮ মিনিটের সেই ভাষণ নিয়ে অনেক গান, কবিতা, গল্প লেখা হয়েছে। তবে সত্যিকারের অমূল্য স্মৃতি যে বাঙালি সম্পদ হিসেবে যে আঁকড়ে থাকতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ।

এ ভাষণ কোনো নির্দিষ্ট দলের একক সম্পদ নয়। তাই তো ঘরে ঘরে আজও শোনা যায় দরাজ কণ্ঠের সেই ‘ভাইয়েরা আমার’। বঙ্গবন্ধুর মতো করে বলতে অনেকেই ভালোবাসে, ‘‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো৷ রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো৷ এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ৷” ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালী জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য।

১৯৭১ সালের এই দিনেও ছাত্র রাজনীতির ছিলো গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বাংলাদেশের ভূখণ্ডের জন্মের সঙ্গে মিশে আছে ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-র শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ’৬৬-র ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ১১ দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি ও আন্দোলন সফল করায় তৎকালীন ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা ছিলো অপরিসীম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো।ফ্রান্সের প্যারিসে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা এক ঘোষণায় একথা জানান। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশ বহুদূর এগিয়ে গেল। এটা শুধু বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি নয়, দেশের জন্যও এক বড় স্বীকৃতি।

কি ছিল সেই ভাষণের প্রক্ষাপট, কি তার তাৎপর্য আসুন আপনাতে আমাতে মিলে একসঙ্গে একটু পর্যালোচনা করি।

১৯৭১ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ বাঙালীর জাতীয় সত্তা পাকিস্তানের ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসার জন্য যে প্রচন্ড আবাগে উম্মথিত হচ্ছি, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি গোড়া থেকেই তার প্রতিবিধান কিভাবে করতে হবে তা ঠিক করে রেখেছিল।

৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে আইউব সরকারের পতনের পর ‘৭০ এর সাধারন নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। সি.এম.এল.এ ইয়াহিয়া বহুবার সময় পরিবর্তনের পর মার্চ ২৫ এ সাধারন পরিষদের অধিবেশনের ঘোষণা দেয়। কিন্তু পূর্ব পরিকল্পনা মত ১লা মার্চ তা স্থগিত করে,ফেটে পরে সমগ্র বাঙলা,জাতির দিগনির্দেশনায় মুজিব ৩ মার্চ আসহযোগ-হরতাল ঘোষনা করলেন।

৬ই মার্চ রাতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দিন আহমেদসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতার সাথে আলোচনা করেছিলেন।

সামরিক শাসন তুলে নেয়া এবং সৈন্যদের ব্যারাকে ফেরত নেয়াসহ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি চারটি শর্তের ব্যাপারেই শুধু বঙ্গবন্ধু তাঁর সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করেছিলেন। ভাষণ দিতে বাসা থেকে বেরোনোর সময় শেখ মুজিবকে তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বলেছিলেন, তুমি যা বিশ্বাস করো, তাই বলবে। ৭ই মার্চের সেই ভাষণ তিনি নিজের চিন্তা থেকেই দিয়েছিলেন। ভাষণটি লিখিত ছিলো না।

১৯৭১ সালের এই দিনে সকাল থেকেই ঢাকায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং ছাত্র নেতাদের ভিড়। দুপুর দু‌’টার দিকে আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদসহ তরুণ নেতাকমীদের সাথে নিয়ে শেখ মুজিব তাঁর বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিলেন জনসভার উদ্দেশ্যে।

এদিকে সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সে সময় রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল। সেই রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের অপেক্ষার পালা শেষ করে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী এবং হাতাকাটা কালো কোট পড়ে শেখ মুজিব উপস্থিত হয়েছিলেন। আগের নির্ধারিত রাস্তা বাদ দিয়ে ভিন্নপথে তাঁকে সেখানে নেয়া হয়েছিল। মঞ্চে সকাল থেকেই গণসঙ্গীত চলছিল। সেদিন শেখ মুজিব সেই মঞ্চে একাই ভাষণ দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এই একটি ভাষণের মাধ্যমে তিনি একটি জাতিকে সশস্ত্র বাঙ্গালী জাতিতে রূপান্তর করেছিলেন। স্বাধীনতার বিজ তিনি রুপন করেছিলেন, আর ৭ মার্চ রেসকোর্সে তার স্বরচিত অনবদ্য কাব্য পাঠ করলেন।

শেখ মুজিব যখন বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাইনা। দেশের মানুষের অধিকার চাই। তখন তিনিই হয়ে উঠেন দেশের অঘোষিত প্রধানমন্ত্রী। তার এক কথায় বন্ধ হয়ে গেল সারা দেশ। কবি বললেন ‘গরীবের যাতে কষ্ট না হয়’ তেমন সবকিছু এ-হরতালের আওতা মুক্ত।

দ্রষ্টা কবি প্রস্তুতি নিতে বললেন, যার যাকিছু আছে তাই নিয়ে, তবে হিংসা নয়, আত্মরক্ষা, ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরি করে। এই ক্রান্তি কালে দিলেন জাতির সকল শ্রেণির প্রতি দিকনির্দেশনা, সামরিক বেসামরিক সবার প্রতি। প্রবীণ জ্ঞানির মত বললেন, এ-দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা চলছে-বাঙালীরা বুঝে সুঝে কাজ কর।

আর তারপর সেই ঘোষনা, যেন জিব্রায়েলের কন্ঠ থেকে নিসৃত সুসমাচার, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষ কে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
জয় বাংলা…

মোঃ মাহমুদুল হাসান সবুজ আহ্বায়ক আনন্দ মোহন কলেজ শাখা ছাত্রলীগ

ব্রেকিং নিউজঃ