| |

কুড়িগ্রামের ডিসি প্রত্যাহার হচ্ছেন, আসছে বিভাগীয় ব্যবস্থা

আপডেটঃ ৪:৪০ অপরাহ্ণ | মার্চ ১৫, ২০২০

Ad

সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেয়ার ঘটনায় কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীনকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৫ মার্চ) সচিবালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান।

গত শুক্রবার ( ১৩ মার্চ) মধ্যরাতে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামের বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে এক বছরের কারাদণ্ড দেয় জেলা প্রশাসন। এই ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

শনিবার (১৪ মার্চ) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রংপুর বিভাগীয় কমিশনারকে এই ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়। রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার কে এম তারিকুল ইসলাম তদন্তের দায়িত্ব দেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আবু তাহের মো. মাসুদ রানাকে।

তদন্তের বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনের একটি খসড়া পেয়েছি। স্বাক্ষরিত মূল প্রতিবেদনটি কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পৌঁছাবে। আমরা কথা বলেছি, খসড়া প্রতিবেদনটিই মূল প্রতিবেদন।’

তিনি বলেন, ‘তদন্তের মধ্যে আমরা অনেকগুলো অনিয়ম দেখেছি। সেই অনিয়ম অনুযায়ী আমরা ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, তার (ডিসি সুলতানা পারভীন) বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিউর (বিভাগীয় ব্যবস্থা) অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব। ইতোমধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি।’

‘অহেতুক যে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে, যেটি আমাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়ম-কানুন আছে, নিয়ম-কানুন অনুযায়ী যে কাজগুলো হয়নি, যেটি নিয়ে বিভিন্ন মহলের প্রশ্ন উঠেছে। সেগুলোর অনেকগুলোর সত্যতা পেয়েছি বিধায় আমরা তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি এবং সেটি প্রক্রিয়াধীন। পুরোপুরি রিপোর্টটি পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারব।’

ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘ওখানকার যারা আছেন, কাজ করেছেন। আমাদের পুরোপুরি তদন্ত করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রত্যেকটি অনিয়মের জন্য কে কী রকম রোল প্লে করেছেন- সেই রোলটি যদি নিজের চিন্তা-ভাবনা মতে করে থাকেন আইনবহির্ভূতভাবে, অবশ্যই তিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন। সেই অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আমরা নেব।’

 

তিনি বলেন, ‘অধীনস্তদের কাজগুলো সাধারণত তাদের বসের নির্দেশনায় হয়ে থাকে। আমরা দেখব যারা অধীনস্ত ছিলেন তারা কাজে কোনো গাফিলতি করেছেন কি-না, সমস্যা করেছেন কি-না। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আর কিছু পর্যালোচনা করছি।’

সাংবাদিককে শাস্তি দেয়ার ঘটনায় ইতোমধ্যে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সাংবাদিক আরিফুল মুক্ত হয়েছেন। আমরা এখন চেষ্টা করছি, সরকারি যে ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে, সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়াটা আমাদের জন্য অপরিহার্য। সেই বিষয়গুলোর জন্য আমরা এগোচ্ছি। অল্প সময়ের মধ্যে আপনারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো জানতে পারবেন।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অনেকগুলো অসঙ্গতি পেয়েছি এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।’

কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমাদের প্রসিডিউরের কিছু ব্যাপার আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত স্বাক্ষরিত না হবে, জনপ্রশাসন মন্ত্রী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তার স্বাক্ষরের যে বিষয়গুলো রয়েছে সেগুলো সম্পন্ন হলেই তখন আমাদের জানানোটা বিধি সঙ্গত হয়।’

‘প্রথমত তাকে ওখান থেকে উইথড্র (প্রত্যাহার) করা হবে। দ্বিতীয় তার বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিউর নেয়া হবে। ডিপার্টমেন্টাল মামলা হবে, সেই অনুযায়ী তার যে বিচার সেটি হবে’- বলেন ফরহাদ হোসেন।

বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ মহলে আলাপ-আলোচনা হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘(ডিসি) প্রত্যাহার তো হবেনই। তারপরে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেব। এটার জন্য আমাদের আরেকটু বসতে হবে। কারণ একেবারে বিধিসম্মতভাবে করতে হবে। আমি আশ্বস্ত করছি, তার কর্ম অনুযায়ী তার শাস্তি হবে। তিনি যদি দোষী সাব্যস্ত হন, বিচার না হলে তো আমরা বলতে পারি না তার কী হবে। এটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যেহেতু তিনি ইতোমধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন, সেজন্য আমরা অবশ্যই কিছু সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি।’

আরিফের কী হবে, সেই প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সাজা হয়েছে, আটকও হয়েছিলেন। অবশ্যই আমাদের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসবে। আমাদের তদন্তের মধ্যে অনেক কিছু পেয়ে গেছি। লড়তে গেলে তো তদন্তের রিপোর্ট তো সেখানে পেশ করা হবে। অতএব বিচারের সময় আমরা যখন দেখব যেগুলো হয়েছে, সত্য প্রমাণিত হয়নি, তখন যেটা হওয়ার সেটাই তো হবে, সেক্ষেত্রে তো সেফ হয়ে যাবেন। এটাই তো স্বাভাবিক।’

‘প্রশাসন যেন মানুষের কল্যাণে কাজ করে সেজন্য আমাদের পক্ষ থেকে শক্ত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নির্দেশনা আছে। আপনারা আশ্বস্ত থাকতে পারেন, বিচারের মধ্য দিয়ে যদি সে দোষী সাব্যস্ত হয় তার সর্বোচ্চ সাজা হবে।’

এই ঘটনার মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রশ্নবিদ্ধ হল কি-না, জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মোবাইল কোর্টটা অত্যন্ত জরুরি, কারণ তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তিগুলো দিতে পারে। রমজান মাস আসছে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো থেকে শুরু করে নানান রকম ঘটনা ঘটে, ভেজাল জিনিস বিক্রি করে, সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অত্যন্ত উপযোগীভাবে কাজ করে। কেউ কোনো অনাচার করছে, কোনো কিছু করছে, সেটাও কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে (বিচার) হয়। আমরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক। ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে অবশ্যই বিষয়টি মাথায় রেখেছি। আমরা কিন্তু এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ের সমস্ত কর্মকর্তাদের ইতোমধ্যে বলে দিয়েছি, যাতে করে জনগণের জন্য, জনস্বার্থে ভ্রাম্যমাণ আদালত অত্যন্ত প্রয়োজন, সেখানে যেন বিতর্ক সৃষ্টি না হয়।’

এক পর্যায়ে পাশে থাকা জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, ‘৫-৬ হাজার কর্মকর্তা। এরমধ্যে দুই একজন খারাপ হতে পারেন। যখন আমরা নিয়োগ দেই তখন তো দু-একটি ভুল হতেই পারে। একজন কর্মকর্তার অতীত কর্মকাণ্ড বিচার বিশ্লেষণ করে জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, তখন এসব বিষয় আসেনি। যেখানে দু’একটা ভুল হয়ে যেতে পারে। দু-একজন কর্মকর্তার অনিয়মের দায়ভার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কখনোই নেয় না। ডিসি নিয়োগের জন্য আগে শুধু কিছু সংস্থা থেকে প্রতিবেদন নেয়া হত, এখন জেলা প্রশাসক, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ছাড়াও স্বাধীনতার স্বপক্ষের লোকের কাছেও আমরা খোঁজখবর নেই।’

এর মধ্যে অবশ্য সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম জামিন পেয়েছেন। অন্যদিকে মধ্যরাতে অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড প্রদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছেন বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক হারুন উর রশীদ। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মধ্যরাতে টাস্কফোর্সের অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত কে পরিচালনা করেছেন তা জানতে চেয়েছেন।

ব্রেকিং নিউজঃ