| |

মাওলানা মোহাম্মদ শামসুল হুদা পাঁচবাগী

আপডেটঃ 6:02 pm | May 12, 2020

Ad
বিরাট বাংলাদেশ। এই শব্দদ্বয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হলাম আজ। বিরাট বাংলাদেশ মানে বাংলাদেশ, পশ্চিম বঙ্গ ও আসাম। সাহিত্য পড়তে পড়তে ক্লান্তি ভর করলে ইতিহাস ও দর্শন পড়তে শুরু করি। সকালে কার্লোস ফুয়েন্তেসের ছোট্ট উপন্যাস ‘আউরা’ পড়ার পর মনে হলো এবার ইতিহাস বিষয়ক বই পড়া যাক। আলমিরার ভেতর থেকে বের করে আনি একখানা বই। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে পেয়ে যাই এমন একজন সংগ্রামীর তথ্য, যাঁর নাম কখনো শুনিনি, যাঁর সম্পর্কে আগে কখনো পড়িনি। তিনি মাওলানা মোহাম্মদ শামসুল হুদা পাঁচবাগী। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাঁচবাগ গ্রামে তাঁর বাড়ি। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে তিনি ‘কৃষক প্রজা পার্টি’র রাজনীতি করতেন। শেরে বাংলার সেই বিখ্যাত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘বাংলার মানুষের জন্য ডালভাতের’ দাবিটি মাওলানা পাঁচবাগীর পীড়াপীড়িতেই গৃহীত হয়েছিল। তিনি কৃষকদের বিরুদ্ধে অন্যায় ও জুলুমের প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ করার ব্যাপারে তৎকালীন যে কোনো রাজনীতিকের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়চেতা ছিলেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মাওলানা পাঁচবাগী কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থী হিসেবে গফরগাঁও ভালুকা নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রথম বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৪০ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাস হওয়ার পর উপমহাদেশের মুসলমানরা উঠেপড়ে লাগল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য। গোটা বাংলাদেশের মুসলমানরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মোহে আচ্ছন্ন। অথচ মাওলানা পাঁচবাগী এর বিপরীতে। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ কর্তৃক ভারত বিভাগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তদানীন্তন বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সেক্রেটারি মৌলবি আবুল হাশেম, বেঙ্গল কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা কিরণ শংকর রায় প্রমুখ স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন। কিন্তু সেই দাবি কংগ্রেসের কাছে সমর্থন লাভ করেনি এবং গোটা বাংলা-আসামকে পাকিস্তানভুক্ত করার যে দাবি মুসলিম লীগের ছিল, তাও বৃটিশ সরকার মেনে নেয়নি। হাশেম-সোহরাওয়ার্দী ও কিরণ শংকরের স্বাধীন বাংলার দাবির অনেক আগেই, ১৯৪২ সালে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য ‘ক্রিপস মিশন’ যখন ভারতে আসে, তখন মাওলানা পাঁচবাগী মিশন প্রধান স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের কাছে টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠান আসাম ও বাংলা মিলে একটি অঞ্চল বা রাষ্ট্র গঠনের জন্য। এই হিসেবে তাঁকে বৃহত্তর স্বাধীন বাংলার (বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম) বা ‘বিরাট বাংলাদেশের’ সর্বপ্রথম দাবিদার বা স্বপ্নদ্রষ্টা বলা চলে।
এ সময় মাওলানা পাঁচবাগী তাঁর প্রচারপত্রসমূহের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা কায়েমের দাবি পেশ করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা বিরোধী একটি ইশতেহারে তিনি লেখেন :
মিছে কেন পাকিস্তান জিন্দাবাদ
ইংরেজ তাড়াই, পাঞ্জাবি আনতে চাই
বাংলা নহে স্বাধীন, বাংলা চির পরাধীন
পাকিস্তান নয়, ফাঁকিস্তান
পাকিস্তান হবে জালেমের স্থান।
কী আশ্চর্য! পাকিস্তান যে আসলেই ফাঁকিস্তান হবে, জালিমের স্থান হবে, তা তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই কিনা ভবিষদ্বাণী করে দিলেন! পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরোধিতা করে তিনি ১৯৪৫ সালে ‘ইমারত পার্টি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন, যার সভাপতি ছিলেন তিনি নিজে এবং মহাসচিব ছিলেন ড. সানাউল্লাহ বার এট ল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রস্তাবিত ‘সিরাজুদ্দৌলার বৃহত্তর স্বাধীন বাংলা’ কামনা করে অন্য একটি প্রচারপত্রে মওলানা পাঁচবাগী লেখেন :
আমরা নিখিল বাংলার সন্তান
সিরাজুদ্দৌলার বাংলা নামে অভিহিত
কলিকাতাময় নিখিল বাংলা
অবশ্যই চাই।
মোদের এহেন দাবি করিতে হবে পূরণ
মন্ত্রের সাধন হোক, আর শরীর পতন।
কে রোধিতে পারে প্রাক্তনের গতি
মোদের আন্দোলন চলিবে নিতি।
তাই বলি
ওগো পান্থ কেন ক্ষান্ত হও হেরি দীর্ঘ পথ
উদ্যম বিহনে পুরো কিবা কার মনোরথ।
বিনীত―
কলিকাতাময় সিরাজুদ্দৌলার নিখিল বাংলার সন্তান
(মওলানা) মোঃ শামছুল হুদা (পাঁচবাগী)
বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতাকামী রাজবন্দী
প্রেসিডেন্ট, ইমারত পার্টি―বিভাগ-পূর্ব তথা শ্যামা-হক-সোরাবর্দ্দী প্রস্তাবিত কলিকাতাময় বিরাট বাংলাদেশ।
মাওলানা পাঁচবাগী শুধু ইশতেহার প্রকাশ করে ক্ষ্যান্ত হননি, প্রতিরোধও করেছেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে গফরগাঁও নির্বাচনী এলাকায় মুসলীম লীগের প্রার্থী ছিলেন গিয়াসউদ্দিন পাঠান। তাকে জেতানোর জন্য মুসলীম লীগ সর্বশক্তি নিয়োগ করে। মুসলীম লীগের কেন্দ্রীয় নেতা লিয়াকত আলী খান, বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, খাজা নাজিম উদ্দিন, মাওলানা সাব্বিরসহ বহু নেতা নির্বাচনী প্রচারের জন্য ট্রেনযোগে গফরগাঁও এলে লাখ লাখ জনতার প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। গোটা বাংলায় মুসলীম লীগ জয়লাভ করলেও গফরগাঁওয়ে পাঁচবাগী এবং বরিশালে শেরে বাংলা জয়ী হন।
কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অসংখ্য ইশতেহার ও প্রচারপত্র বের করেন মাওলানা পাঁচবাগী। কয়েকটি প্রচারপত্রের নমুনা দেওয়া যাক :
১. পাকিস্তান ইজ ফাঁকিস্তান অব বাকিস্তান
পাকিস্তান ইজ নাথিং বাট ফলস বোগাস।
২. জিন্নাহ বৃটিশের দালাল
কে বলে মোদের দুলাল।
৩. পাকিস্তানের মোহে পড়ি
আজ আমাদের গলায় দড়ি
দিল্লীর লাডডু পাকিস্তান
পেয়ে না পেয়ে সব সমান।
এসব প্রচারপত্র ছিল মাওলানা পাঁচবাগীর রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার। তিনি বিভিন্ন সময় দুই সহস্রাধিক প্রচারপত্র ছেড়েছিলেন বলে জনশ্রুতি। এসব প্রচারপত্র প্রচারের দায়ে তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। ব্রিটিশ সরকার, জমিদার সংগঠন এবং পাকিস্তান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে ১০১৭টি মামলা দায়ের করে। এসব মামলার কারণে তাঁকে ময়মনসিংহ শহরে আট বছর নজরবন্দি হিসেবে আটকে রাখা হয়। ১৯৪৭ সালের শেষদিকে পাক সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাঁকে গ্রামের বাড়িতে অন্তরীণ করে রাখে এবং তার প্রেসটি বাজেয়াপ্ত করে নেয়। ‘অচিরেই দুই বাংলা এক হইতে পারে―বাংলাদেশের জনগণ হিন্দু-মুসলমান উভয়ই এ আশা করতে পারেন’ শীর্ষক এক প্রচারপত্রে তিনি লেখেন : ‘আমার বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বহু মোকদ্দমা আনীত হয়, যার ফলে জেল, জরিমানা এবং বিকল্প সশ্রম কারাদ-ের আদেশ হইয়া এক দীর্ঘকাল আমাকে কারাবরণ ও নির্বাসন ভোগ করিতে হয়।’
আইয়ুব শাসনের ঘোর বিরোধী ছিলেন মাওলানা পাঁচবাগী। ঢাকার নওয়াব হাবীবুল্লাহ ছোট্ট গ্রাম পাঁচবাগকে ‘ছোট্ট জাপান’ বলে আখ্যায়িত করায় মাওলানা পাঁচবাগী তার উত্তরে এক প্রচারপত্রে আইয়ুব খাঁর শাসনের কথা উল্লেখ করে লেখেন :
পাঁচবাগ ছোট্ট জাপান, মিথ্যে কথা নয়
ঢাকার নওয়াব হাবীবুল্লাহ সত্যি কথা কয়।
পাঁচবাগ ছোট্ট জাপান
একদিন ঘটাবে আইয়ুব শাসনের অবসান।
১৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় মাওলানা পাঁচবাগী পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ‘মোদের কপালে ছাই/রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শীর্ষক শিরোনামে হাজার হাজার প্রচারপত্র বিলি করে ময়মনসিংহের জনসাধারণকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে সোচ্চার করে তোলেন। ১৯৫৪ সালে মাওলানা পাঁচবাগী আওয়ামী লীগের নমিনেশন নিয়ে গফরগাঁও-ভালুকা আসন থেকে পুর্ববঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ৬০-এর দশকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন না। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে সব ধরনের সহযোগিতা করেন তিনি। রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানি হায়েনাদের হাত থেকে হিন্দু ও মুসলিম নির্বিশেষে সব মেয়েদের রক্ষা করার চেষ্টা করতেন। তিনি নিজে বিভিন্ন গ্রামে, মহল্লায় বাসিন্দাদের খোঁজ নিতেন এবং নিরীহ ও বিপদে পড়া মেয়েদের নিজের জিম্মায় নিয়ে আসতেন। তাদের আশ্রয় দিতেন তাঁর বাড়িতে। কাউকে কাউকে তিনি মসজিদ, মাদ্রসা ও স্কুলে আশ্রয় দিতেন। সকল আশ্রিতের খাবারের ব্যবস্থা করতেন এবং মুক্তিযুদ্ধে আগ্রহী যুবকদেরকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য নির্দেশ দিতেন।
মাওলানা পাঁচবাগীর পুত্রবধূ বেগম লতিফা আক্তার ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি শত শত মানুষকে মাসের পর মাস নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির বিশাল আঙিনায় আশ্রয় ও আহার দিয়ে জীবন বাঁচাতেন। মাওলানা পাঁচবাগীর এক নাতির নাম উলফত রানা। তিনিও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর একটি গুরু দায়িত্ব ছিল তাদের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের দেখভাল করা। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়েও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৮ সালে বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা আবেগময় কবিতা ‘শহীদ মিনারের আর্তনাদ’-এর জন্য উলফত রানা গ্রেপ্তার ও নিগৃহীত হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে মাতৃভাষা পরিষদের মহাসচিব হিসেবে দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং সংস্কৃতিসেবীদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন বিল উত্থাপন ও পাসের ব্যাপারে তিনি রেখেছেন স্মরণীয় ভূমিকা। ১৯৮৯ সালে তিনিই প্রথম বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস করার দাবি উত্থাপন করেন।
মাওলানা মোহাম্মদ শামসুল হুদা পাঁচবাগী সম্পর্কে জানতাম না। বিস্তারিত জানলাম আজ। জানলাম তাঁর কল্পিত ‘বিরাট বাংলা’ সম্পর্কেও। হয়ত কোনো একদিন বাস্তব রূপ নিতে পারে তাঁর কাঙ্ক্ষিত বিরাট বাংলা। মাওলানা পাঁচবাগীর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারেন বাংলাদেশের ধর্মোন্মাদ, ধর্মব্যবসায়ী তথাকথিত মৌলবি-মাওলানারা। এই প্রগতিশীল, মানবতাবাদী ও দেশপ্রেমী মাওলানার প্রতি শ্রদ্ধা।
(সংগৃহীত)

 

ব্রেকিং নিউজঃ