| |

শেষ দেখা

আপডেটঃ 1:31 pm | May 14, 2020

Ad
আনোয়ার মাষ্টার
১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের কোন এক হেমন্তের জোছনা রাত্রি।হেমন্তের ঝিরিঝিরি হাওয়া বুকের মাঝখানটা যেন সুশীতল করে দেয়। বাঘমারা আমার একমাত্র ফুফুর বাসা। ফুফুমা আমাকে ছোটবেলা থেকেই খুব আদর করতেন।তাই ফুফুমার বাসায় উঠিএবং রাত্রি যাপনকরি। পরদিন অতি প্রত্যুষে তখনকার সেভেন আপ ট্টেনের একজন যাত্রী হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। তখন সবে মাত্র বয়স বিশ বছর এবং পৌনে বি,এসসি থেকে বি,এসসি হয়েছি।তা-ই ঢাকা বিস্ববিদ্য্যালয়ে প্রিলিঃ তে ভর্তি হওয়ার জন্য ফরম তুলে তা পূরণ করে জমা দেব। কিন্তু এই কাজটি তখন আমার কাছে ছিল অনেক কঠিন। কারণ এর পূর্বে আমার ঢাকা যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে মাত্র একবার তাও আবার সেটা ছিল আর এক নিরানন্দ ও দৈব অভিযাত্রা যেখানে ঢাকা আসা-যাওয়া বাবদ খরচ ছিল মাত্র পনের টাকা।
যাক সেকথা আসল কথায় ফিরে আসি।তবে তার আগে পৌনে বি,এসসি কথাটার একটা যুক্তি দেওয়া প্রয়োজন আছে বলে আমি তার যথার্তথা তুলে ধরছি।১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে গফরগাঁও কলেজ থেকে আমি বি,এসসি পরীক্ষা দেই এবং বাড়িতে বসে চাকুরী প্লাস বিস্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঐ সময় আমার হাই স্কুল জীবনের প্রিয় বি,এসসি স্যার পরবর্তী সময়ের প্রধান শিক্ষক জনাব আব্দুল মজিদ স্যার এর ডাকে এবং আমার পিতার নির্দেশনায় রসুলপুর হাই স্কুলে একজন বি,এসসির দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে উক্ত বিদ্যালয়ে রেজাল্ট এর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত বি,এসসি শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করি। আর সেই সুবাদে তখনকার কোন কোন ছাত্র-ছাত্রী আমাকে আড়ালে পৌনে বি,এসসি স্যার বলে সম্বোধন করত।তবে আমার কাছে মোটেও খারাপ লাগত না বরং কথাটায় বেশ মজা পেতাম। কারণ ঐ সময় রসুলপুর হাই স্কুলের বেশ সুনাম ছিল। আমি ঐ স্কুলের একজন ছাত্র বলেই প্রশংসা করছিনা।কারন ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে এই স্কুল থেকেই ঢাকা বোর্ডে বানিজ্য বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে স্ট্যান্ড করেছিলেন শুভাশীষ চন্দ্র বসু।শেখ হাসিনা সরকারের বৈদেশিক ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের সচিব রৌওনক জাহান অত্র বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। তাছাড়া এইস্কুলের অনেক ছাত্র ছাত্রী আজও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অদিষ্ঠিত যাদের অনেকই আমার প্রিয় ছাত্র ছাত্রী। যেমন মোকাম্মেল হোসেন বর্তমানে বঙ্গভবনের একজন অফিসার, সেনাবাহিনী অফিসার মেজর ফরহাদুজ্জামান আকন্দ সহ আরও অনেকেই। বলতে গিয়ে হয়ত আসল কথার খেই হারিয়ে ফেলেছি। ডিগ্রি পরীক্ষার রেজাল্ট হল এমন একদিন যেদিন রসুলপুর হাই স্কুল প্রাঙ্গণে রাতে মঞ্চায়ন হবে তিন দিন ব্যাপি নাটক। আর সেই দিনই গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজ উদ দৌলার নিকট আমার এক দাদাভাইকে নিয়ে পারমিশন আনতে গেলাম। ও,সি সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কি কর? আমি সোজা সাপ্টা বলে দিলাম বি,এসসি পরীক্ষা দিয়েছি। কথা শেষ না হতেই আবার প্রশ্ন পাশ করেছ? আমি বললাম আমি পাশ করব স্যার। তিনি বললেন যাও রেজাল্ট আগে জেনে আস, পাশ করলে নাটকের পারমিশন আছে নতুবা নাই।আমার দাদা ভাই এবার মুখ খুললেন যাওতো মাস্টার রেজাল্ট নিয়ে আস।আমিও সম্বিত ফিরে পেলাম ঠিকইত এইবলে রোম থেকে বের হলাম থানা থেকে একটু দূরেই গফরগাঁও কলেজ। সেখানে গেলাম চার্ট টানানো খুব একটা ভির নেই।আমি সহজে আমার রোল খোঁজে পেলাম রেজাল্ট আসল দ্বিতীয় বিভাগ। আমি যতটুকু আনন্দ পেলাম রেজাল্ট নিয়ে তার চেয়ে দ্বিগুণ আনন্দ আমার নাটকের পারমিশন নিয়ে। থানার ও,সি সাহেবত শুনেই সেন্ট্রিকে বললেন রসুলপুর নাটকে তিনজন কনস্টেবল দিয়ে দিতে বল।আর সেদিন রাতে আমি রসুলপুর নিজেকে “যৌতুক হল অভিশাপ “বই অভিনয়ের মাধ্যমে আত্নপ্রকাশ করলাম পূর্নাঙ্গ বি,এসসি রুপে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব এই পরিকল্পনাত ৪/৫ দিন আগেরই ছিল। তাই আগের দিন বিকাল বেলা ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ঘুরে বেড়ালাম। অবশ্য সেদিন একজনের সাথে মিলেমিশেই অনেক পথ হাতে হাত রেখে ঘুরলাম, দেখলাম অনেক কিছু জানলাম এবং শুনলাম। শেষ কথা ছিল আগামীকাল ট্টেনে ওঠার আগে যাতে আমি লিমার (ছদ্দ নাম)সাথে দেখা করে যাই।
যেকথা সেই কাজ শেষ রাত্রি অর্থাৎ ফজরের আজানের আগেই বিছানা ছাড়তে হবে।তাই কেমন ঘুম হয়েছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।প্রত্যুষে ঘুম থেকে ওঠে হাত মুখ ধুয়ে রেডি হয়ে ফুফুমার কাছ থেকে দোয়া চেয়ে বিদায় নিলাম। পায়ে হেঁটে আসলাম নির্দিষ্ট স্থানে এবং অপেক্ষা করছিলাম লিমার জন্য। ও আসল তার সাথে অপর একজন নাম ঠিক এই মুহুর্তে মনে করতে পারছিনা। লিমা এসেই কিছু না বলে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করল।আমার মন প্রাণ ভরে গেল মনে হল আমি ইহাকে পেলাম… ভবিষ্যৎ তাকে নিয়েই আমার সকল স্বপ্ন রচিত হবে,রচিত হবে অমিয় সম্ভাবনা……।কিন্তু ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমার চান্স হলনা। সব স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল….।রাজশাহী ইউনিভার্সিটি চান্স হল মনোবিজ্ঞানে।কিন্তু পিতার অসুস্থতা এবং নিষেধাজ্ঞার কারনে তা আর হয়ে উঠল না।তারপর নতুন করে নিয়োগ প্রাপ্ত বিজ্ঞান শিক্ষক হিসাবে সেই রসুলপুর হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু। কিন্তু তার সনে আর দেখা হল না।এ দেখাই যেন জীবনের শেষ দেখা……..।

 

ব্রেকিং নিউজঃ