| |

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনকে করোনা ভাইরাস রোগীদের চিকিৎসায় আপত্তি

আপডেটঃ 6:00 pm | May 26, 2020

Ad
স্টাফ রির্পোটার. ঃ ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন আট তলা ভবনকে কোভিড ডেডিকেডেট হাসপাতাল করার প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাপসাতাল কর্তৃপক্ষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো এক পত্রে এই আপত্তির কথা জানিয়েছে। ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলন নেতৃবৃন্দ এমন প্রস্তাবের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত কোভিড সংক্রমণ প্রতিরোধ কমিটির এক সভায় হাসপাতালের এই নতুন ভবনটিকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল করার প্রস্তাব ও এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়। ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলন কমিটির সভাপতি এ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান খান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ময়মনসিংহবাসীর প্রত্যাশা ও চাহিদার প্রেক্ষিতে গত চার বছরে নতুন ভবনে তিল তিল করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুল প্রত্যাশিত ক্যাথল্যাব, করোনারি কেয়ার ইউনিট, আইসিইউ ও ডায়ালাইসিসসহ আধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসা সেবার ওয়ার্ড-ইউনিট। কোভিড হাসপাতালে রূপান্তরের সিদ্ধান এসব সেবা ভেঙ্গে পড়বে, ধ্বংসের মুখে যাবে মূল্যবান মেশিনারিজ সামগ্রী। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাছির উদ্দিন আহমেদ একাদিক পত্রিকার প্রতিনিধিকে জানান, একাধিক বিকল্প থাকার পরও নতুন আট তলা ভবনকে কোভিড করার ঘোষণা আত্মঘাতী ছাড়া আর কিছুই নয়। কোভিড চিকিৎসায় জড়িত চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীদের থাকা খাওয়াসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষায় সব ধরনের উদ্যোগ নেয়ার কথা উল্লেখ করে হাসপাতাল পরিচালক আরও জানান, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতালের নতুন ভবন ছাড়াও একাধিক বিকল্প রয়েছে। তবে কোভিড প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান জানান, এ নিয়ে উদ্বেগের কিছুই নেই। পরিস্থিতি মোকাবেলায় এসকে হাসপাতাল, পরানগঞ্জ হাসপাতাল, নার্সিং ডরমেটরি ও সিবিএমসিএইচসহ বেসরকারী প্রাইভেট হাসপাতালকে বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলে চূড়ান্ত পর্যায়ে হাসপাতালের নতুন ভবনকে ব্যবহার করা হবে। এই ক্ষেত্রে রোগী ছাড়া আর কিছুই স্থানান্তর করা হবে না বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষীয় সূত্র জানায়, হাসপাতালের এই আটতলা নতুন ভবনে রয়েছে বহুল প্রত্যাশিত ক্যাথল্যাব, হৃদরোগীদের জন্য করোনারি কেয়ার ইউনিট-সিসিইউ, ইমারজেন্সি বায়োকেমেস্ট্রি ল্যাব, মরণাপন্ন রোগীদের জন্য ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট-আইসিইউ, কিডনী ডায়ালাইসিস ইউনিট, নিউরো সার্জারি, ইউরোলজি, প্লাস্টিক ও বার্ণ ইউনিট, হেমাটোলজি ওয়ার্ড, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও প্যাথলজি ল্যাবসহ বিশেষায়িত বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিট। অপর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ও সেন্ট্রাল এ্যাসির এই নতুন ভবনটিকে কোভিড হাসপাতাল করা হলে গুরুত্বপূর্ণ এসব ওয়ার্ড ইউনিট ও মেশিনারিজসহ ক্যাবল,ওয়্যারিং ও প্ল্যান্ট সরিয়ে পাশের পুরনো চারতলা ভবনে স্থানান্তর করতে হবে। এ সময় মোটা অঙ্কের টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা স্পর্শকাতর মেশিনারিজ অকেজো ও বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেই সাথে ব্যাহত হবে হৃদরোগ, কিডনি, গাইনি ও জেনারেল সার্জারিসহ আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীদের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম। অথচ নতুন এই ভবনের বিকল্প হিসেবে একই ক্যাম্পাসের অন্তত ২০০ শয্যার একটি নার্সিং ডরমেটরির নতুন ভবনকে কোভিড হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কোভিড প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা এই ডরমেটরি পরিদর্শনও করেছিলেন। এর বাইরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের আওতাধীন সংক্রামক ব্যাধির সূর্যকান্ত হাসপাতালে ৭০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড ছাড়াও সাত শয্যার আলাদা আইসিইউতে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। ময়মনসিংহ সদরের পরাণগঞ্জ হাসপাতালে ৩০ শয্যা ও মুক্তাগাছার শারীরিক শিক্ষা কলেজে ৫০ শয্যার কোভিড রোগীদের সেবা নিয়ে প্রস্তুতি ছিল স্বাস্থ্য বিভাগের। এতসব বিকল্প থাকার পরও এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে গুঞ্জন উঠেছে নতুন আটতলা ভবনের চিকিৎসাসেবা অকার্যকর করতে একটি মহল কলকাটি নাড়ছে।
এই ভবনের সেবা কার্যক্রম অকার্যকর কিংবা ক্ষতিগ্রস্থ হলে লাভবান হবে হাসপাতালের বাইরের প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক ল্যাব। এ নিয়ে জেলা প্রশাসনের সভায় উপস্থিত হাসপাতালের উপ পরিচালক ডাঃ লক্ষ্মীনারায়ণ মজুমদার নতুন ভবনকে কোভিড করার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিলেন। স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ-স্বাচিপ ময়মনসিংহ শাখার সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ মতিউর রহমান ভুইয়া জানান, করোনা পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলে চূড়ান্ত পর্যায়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। তবে এর আগে বিকল্পের তালিকায় থাকায় কমিউনিটি বেজড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে কোভিড হিসেবে প্রস্তুত রাখা উচিত। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. হিবরুল বারী জানান, নতুন ভবনকে কোভিড করার চিন্তা থেকে বের হয়ে আসা উচিত।
কারন নেফ্রোলজি, আইসিইউ, সিসিইউসহ গাইনী ও জেনারেল সার্জারি রোগীদের কী হবে? যদিও জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, রোগীদের ডায়ালাইসিসসহ প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা বাইরের প্রাইভেট ল্যাব সরকারী ফি’য়ে করতে সম্মত আছে।
করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডা. এবিএম মশিউল আলম জানান, গত ২৮ এপ্রিল ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভায় করোনা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কমিটির সদস্যরা এ সময় বলেন, দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতসহ পরিস্থিতি সামাল দিতে রোগীদের সরিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন আট তলা ভবনটিকে কোভিড ডেডিকেটেড করার প্রস্তাব করা হয়। ওই সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এমপি, জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান, হাসপাতালের উপ পরিচালক ডাঃ লক্ষ্মীনারায়ণ মজুমদার, মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাঃ চিত্ত রঞ্জন দেবনাথ ও সিভিল সার্জন ডা. এবিএম মশিউল আলম উপস্থিত ছিলেন। কমিটির সুপারিশ ও এই প্রস্তাবটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় গত ৩রা মে। ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডাঃ মশিউল আলম আরও জানান, সুবিধাজনক জায়গায় সরকারী ভবন না পাওয়ায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনকেই বেছে নেয়া হয়েছে। এর আগে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ময়মনসিংহের সংক্রামক ব্যাধির সূর্যকান্ত হাসপাতালে ৭০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড ও সাত শয্যার আইসিইউ ওয়ার্ড, ময়মনসিংহ সদরের পরাণগঞ্জ হাসপাতালে ৩০ শয্যা, মুক্তাগাছা শারীরিক শিক্ষা কলেজে ৫০ শয্যার আইসোলেশন, বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে ২৪০ শয্যাসহ অন্যান্য উপজেলা মিলিয়ে ৪৫০ শয্যা প্রস্তুত রাখার কথা জানিয়েছিল জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। সর্বশেষ ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ক্যাম্পাসে নব নির্মিত নার্সিং ডরমেটরিতে ২০০ শয্যা আইসোলেশন ওয়ার্ড করা যাবে বলেও জানিয়েছিলেন সিভিল সার্জন। এসব স্থাপনায় প্রয়োজনে রোগীদের সিলিন্ডারের অক্সিজেন সরবরাহ দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এতসব বিকল্প থাকার পরও এখন ভোল পাল্টে সিভিল সার্জন বলছেন, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ না থাকায় এসব জায়গায়কে বেছে নেয়া যায়নি! গত শনিবার পর্যন্ত ময়মনসিংহ বিভাগে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩৬০ জনের। এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৯০ জনের। জেলায় মারা গেছেন পাঁচজন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই হাসপাতালের নতুন ভবনকে বেছে নেয়া হয়েছে বলে জানায় স্বাস্থ্য বিভাগ।

ব্রেকিং নিউজঃ