| |

দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন/১৯৭৯

আপডেটঃ 4:11 pm | May 28, 2020

Ad

আব্দুল কদ্দুছ মাখন :
লক ডাউন শুরু হবার পর বাংলাদেশের সকল জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে লিখবো বলে কথা দিয়েছিলাম। ৮ এপ্রিল ১৯৭৩ সনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে লিখেছিলাম। আজ লিখছি ১৯৭৯ সনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে। লেখাটি লিখতে দেরী হবার কারণ, এই নির্বাচনের বিশাল প্রেক্ষাপট নিয়ে ব্যাপক বই পুস্তক ঘাটতে হয়েছে। লেখাটি অনেক বড় বিধায় দুই পর্বে উপস্থাপন করছি। আশা করি ফুলটাইমার রাজনীতিবিদ দের কাজে লাগবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিদেশি রাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দেশের শাসনতন্ত্র রচনা সহ গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন কল্পে সার্বিক উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। স্বাধীন দেশে নিজে ক্ষমতায় থাকা বস্থায় অতিদ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নজির সৃষ্টি করেন। ভোটারদের আকন্ঠ সমর্থনে নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্বের ন্যায় (১৯৭০) বিজয় অক্ষুণ্ণ রাখে আওয়ামীলীগ।
১৯৭৩ সনে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের বিজয় ও নিজেদের অচিন্তনীয় পরাজয় মেনে নিতে পারেনি, ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাপ (ভাষানী), সদ্য গঠিত নতুন দল জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টির, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন পন্থীরা।
উক্ত দলগুলো মূলত শুরু থেকেই আওয়ামীলীগ বিরোধী। আওয়ামীলীগ থেকে বেড়িয়ে ন্যাপ সৃষ্টির পর থেকে ন্যাপ নেতৃবৃন্দ চরম আওয়ামীলীগ বিরোধী। কমিউনিস্ট পার্টি মনে করতো তারা সংগঠিত দল কিন্তু আওয়ামীলীগ তাদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ছাত্রলীগ থেকে বেড়িয়ে যাওয়া কিছু ছাত্র নেতার নেতৃত্বে গঠিত হয় জাসদ। জাসদ নেতৃবৃন্দ একবাক্যে প্রচন্ড আওয়ামীলীগ বিরোধী।
ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ বক্তৃতায় ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ সনের পূর্বে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগকে জঘন্য ভাষায় গালি দিতো। এদের কেউ কেউ বলতো, বঙ্গবন্ধুর চামড়া ও হাড্ডি দিয়ে ডুগডুগি বাজানো হবে। ১৫ আগষ্টের পরে এরা বলতো, এক নেতা এক দেশ, এক গুলিতেই সব শেষ। কমিউনিস্ট পার্টির একটি বড় অংশ পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির নামে গোপনে সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করে।
জাসদের সাথে যুক্ত হয়েছিলো কিছু আর্মী অফিসার। এই আর্মী অফিসারদের নেতৃত্বে, দু/চার জন ছাত্র নেতা কে সামনে দিয়ে গঠিত হয় গণবাহিনী। গণবাহিনী ও পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির কাজ ছিলো থানা লুট, পুলিশের উপর হামলা, পুলিশ হত্যা, আওয়ামীলীগ নেতাদের ব্যবসা বাড়ি লুট করা এবং হত্যা করা। এরা ধনাঢ্য ব্যাক্তিদের নিকট থেকে জোরপূর্বক চাদা আদায় করতো। এরা আইন শৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি ঘটায়। পর্দার অন্তরালে থেকে, মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তান-মার্কিন জোটও অন্যরকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো।
জেনারেল ওসমানীর পরামর্শে তিন জৈষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙ্গিয়ে (রব,দত্ত,জিয়া) শফিউল্লাহ কে সেনাপ্রধান করায় জিয়া মনোক্ষুণ্ণ ছিলো। (সূত্রঃ জেনারেল শফিউল্লাহ।)
মুক্তিযুদ্ধ ফেরত সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিশেষ সুবিধা দেয়ায়, পাকিস্তান ফেরত সেনাবাহিনীর একটি অংশ নাখোশ ছিলো।
রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর প্যারালাল এমন ভাবনা চিন্তা সেনাবাহিনীর ক্ষুব্ধ হবার আরো একটি কারন।
এতকিছুর পরও বঙ্গবন্ধু সম্মিলিত উন্নয়নের লক্ষ্যে সকল দল ও পেশাজীবীদের দেশ জাতির উন্নয়নে ভুমিকা রাখার সুযোগ দেয়ার নিমিত্তে রাজনৈতিক ঐক্যের ব্যবস্থা করেন। বঙ্গবন্ধুর তদানিন্তন ঘনিষ্ঠ জনের লেখায় ও আলোচনায় জানা যায় প্রাথমিক অবস্থায় বঙ্গবন্ধু তিন বৎসরের জন্য জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে বাকশাল গঠন করেন।
কিন্তু উপরিউক্ত সকল চক্রের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২ বৎসর ৫ মাসের মাথায় দুই কন্যা ব্যাতীত সপরিবারে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। উন্মোচিত হয় দলের ভিতরে মীরজাফর খ্যাত খন্দকার মোশতাকের চরিত্র, সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী হিসাবে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করে জেনারেল জিয়াউর রহমান। দেশ চালাতে থাকে আর্মি ও আর্মি প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানের নতজানু ও অত্যাচারী সরকার। আওয়ামীলীগের কিছু নেতা লোভে ও কিছু নেতা ভয়ে সরকারে যোগ দেয়। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী, কিছু শীর্ষ ও মাঝারি নেতা খন্দকার মোশতাক কর্তৃক সরকারে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলে তাদের গ্রেফতার পূর্বক আটক আদেশ প্রদান করে জেলখানায় নিক্ষেপ করা হয়। দেশজুড়ে চলতে থাকে কার্ফিউ, জুলুম, নির্যাতন,মামলা, মোকদ্দমা সহ আর্মি ও পুলিশি শাসন। ১৯৭৫ সনের ৩ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুর খুনী চক্র কারা অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নির্মম ভাবে গুলি করে করে হত্যা করে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী ও মোঃ কামরুজ্জামান কে।
আর্মিদের মাঝে মুক্তিযোদ্ধা অফিসার গনের একটি অংশ সংগঠিত হয়। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ জিয়ার নিজস্ব বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪৬ ব্রিগেডের কিছু তরুণ অফিসারকে দিয়ে জিয়াকে গৃহবন্দী করেন। তারা খুনীদের নিকট থেকে খুনীদের পথ অনুসরণ করে বিনা রক্তপাতে ক্ষমতা নিতে চাইলে, পূর্বোক্ত ষড়যন্ত্র কারীদের সম্মিলিত বিরোধিতায় ব্যার্থ হয়। দেশী-বিদেশী, ডান-বাম সকল চক্র মিলে খুনী চক্রের সহযোগীদের পূনরায় ক্ষমতায় আসতে সহায়তা করে। জিয়া ও গণবাহিনী সমর্থক আর্মিদের নিকটে নির্মম ভাবে নিহত হন তিনজন পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তা, খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা ও লে. কর্নেল এটিএম হায়দার।
চলবে।
আগামী ২৮ মে দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত হবে।

ব্রেকিং নিউজঃ