| |

দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন/১৯৭৯।

আপডেটঃ 4:14 pm | May 28, 2020

Ad

আব্দুল কদ্দুছ মাখন :

দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন/১৯৭৯।
২য় পর্ব।
৮ এপ্রিল২০২০ তারিখে, ১৯৭৩ সনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে লিখেছিলাম।
২৬ মে ২০২০ লিখেছি, ১৯৭৯ সনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম পর্ব।
আজ লিখছি ২য় পর্ব।
আশা করি লেখাটি নবীন ও সার্বক্ষনিক রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কাজে লাগবে।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫ শুরু হয় নতুন অধ্যায়ের। জাসদ, গণবাহিনী ও পাকিস্তান-মার্কিন গোপন জোটের সহায়তায় জিয়া মুক্ত হয়ে প্রথমে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও পরে আইনি জটিলতা দেখা দিলে, রাষ্ট্রপতিকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা দিয়ে নিজে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। রাষ্ট্রপতি আবু সাদত মোঃ সায়েম কাঠের পুতুল। মূলত চালিকা শক্তি সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া। ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সনে রাষ্ট্রপতি আবু সাদত মোঃ সায়েমকে হটিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহন করেন।
৩০ এপ্রিল ১৯৭৭ সনে জেনারেল জিয়া তার শাসনকে বেসামরিক করার উদ্দেশ্যে ১৯ দফা কর্মসূচীর ঘোষনা দেন। তার রাষ্ট্রপতি নিয়োগকে বৈধ করার লক্ষ্যে গনভোট/আস্থা ভোটের আয়োজন করেন। ভোটার উপস্থিতির হার ছিলো ২% এর নীচে কিন্তু দেখানো হয় ৮৮%। জিয়ার পক্ষে দেখানো হয় প্রদত্ত ভোটের ৯৮%। কিন্তু ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিলো না বললেই চলে। হাঁ ভোটের বাক্স ভরে ছিলো ভোট গ্রহনের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার গন।
বাংলাদেশ আর্মি এ্যাক্টের ২৯২ ও ২৯৩ বিধি অনুযায়ী জিয়া উক্ত নির্বাচনে প্রার্থী হবার যোগ্য ছিলো না। উক্ত বিধিতে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ আছে, সামরিক বাহিনীর কোন সদস্য তার চাকুরীর মেয়াদ শেষ না হলে কোন নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না। কিন্তু আর্মিতে চাকুরীরত থাকা বস্থায় জেনারেল জিয়া পেরেছিলো।
জেনারেল জিয়া একাধারে রাষ্ট্রপতি, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও সেনা বাহিনীর ষ্টাফ প্রধানের পদে থেকে ১৯৭৮ সনের ২১ এপ্রিল পরবর্তী ৪৩ দিনের মাথায় জুনের ৩ তারিখ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘোষণা দেন। শেষ মুহুর্তের প্রচার প্রচারনা ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন বাদ দেয়া হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিরোধীদল সময় পায় ৪০ দিন। প্রচারের সময় দেয়া হয় ২০ দিন। জিয়া প্রচারে সরকারী সকল সুযোগ সুবিধা ও হেলিকপ্টার সহ সব ধরনের যানবাহন ব্যবহার করে। বিরোধী প্রার্থীদের এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। উল্লেখিত পদ সমূহের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র সমূহকে জিয়ার পক্ষে একচেটিয়া ব্যবহার করা হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অধ্যাদেশ ১৯৭৮ অনুযায়ী কোন সরকারী চাকুরীজীবি ও সরকারী বেতন গ্রহিতার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হবার সুযেগ ছিলো না। কিন্তু জিয়া আইন ভঙ্গ করে জোর পূর্বক রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হলে আর্মি, পুলিশ ও সরকারী চাকুরীজীবি গন ন্যাক্কার জনক ভাবে জিয়ার পক্ষাবলম্বন করে। প্রকাশ্য ও গোপন কারচুপির মাধ্যমে জিয়া বিজয়ী হন।
১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জেড ফোর্সের অধিনায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল জিয়াউর রহমান, ১৯৭২ সালে প্রবর্তিত দালান আইন বাতিল করে ১১ হাজার সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেন। উক্ত আদেশে মামলার দায় থেকে রেহাই পায় হাজার হাজার অভিযুক্ত। ১৯৭৬ সনের ১৮ জানুয়ারী, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ত্যাগ করে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহন কারীদের বাংলাদেশী নাগরিকত্ব ফেরত পাবার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে বলেন। জেনারেল জিয়া Second proclamation জারীর মাধ্যমে সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করে দালালদের ভোটার হবার সুযোগ দেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধিতার কারণে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, পিডিবি ও নেজামে ইসলামের নেতাদের সংসদে নির্বাচিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৭ সনে ১ নং প্রক্লামেশন জারী করে সংবিধানের কিছু অংশ তুলে দেয়া হয়। উক্ত সময়ে সামরিক আদালত গঠনের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ ও স্বাধীনতার পক্ষশক্তি দমনের কাজ পুরোমাত্রায় চলমান ছিলো।
১৯৭৮ সনের ১৫ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়া এক ফরমান জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে সকল ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নামে নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন।
উক্ত রুপে ধীর গতিতে দীর্ঘ সময় পরিকল্পনা করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের লক্ষ্যে নীলনকশা প্রনয়ন করে ১৯৭৯ সনের ২৭ জানুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। নির্বাচনের দিন বিষয়ে আওয়ামীলীগ সহ আরো কিছু রাজনৈতিক দলের আপত্তির কারণে ২৭ জানুয়ারীর পরিবর্তে ১৮ ফেব্রুয়ারী দিন ধার্য্য করে তফসিল ঘোষণা করা হয়।
জিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও দূর্নীতি হয়। বিএনপির গুন্ডা বাহিনী ঢালাও হুমকি ধামকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। বহু জায়গায় অন্যায় অত্যাচার চালায়। আর্মি, পুলিশ, সিভিল প্রশাসন ও ভোট গ্রহনের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারী কর্মকর্তা গন ন্যাক্কার জনক ভাবে জিয়া গঠিত বিএনপির পক্ষাবলম্বন করে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে আওয়ামীলীগের অভিজ্ঞ ও সিনিয়র পার্লামেন্টারিয়ানদের পরিকল্পিত উপায়ে ফেল করানো হয়। এই নির্বাচনে দেশের সবথেকে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের মূল অংশ (আওয়ামীলীগ-মালেক) কে দেয়া হয় ৩৯ টি আসন। আওয়ামীলীগ (মিজান)কে দুইটি আসন। অথচ যুদ্ধাপরাধের দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, পিডিবি এবং নেজামে ইসলামের নিষিদ্ধ ও ঘৃনিত ব্যাক্তিদের সমন্বয়ে গড়া সম্পুর্ন নতুন জোট ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) কে দেয়া হয় ২০ টি আসন। যার শতভাগ ছিলো স্বাধীনতা বিরোধী।
সরকারী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে ভোট ডাকাতি ও মিডিয়া ক্যু’র মাধ্যমে জিয়া নিজের দল বিএনপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে ২০৭ টি আসনে বিজয়ী ঘোষনা করে। নির্বাচনে জাসদ ৮, ন্যাপ (মো) ১, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ ২, বাংলাদেশ গনফ্রন্ট ২, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল ১, গনতান্ত্রিক আন্দোলন ১, জাতীয় একতা পার্টি ১ ও স্বতন্ত্র ১৬ জনকে বিজয়ী ঘোষনা করা হয়। স্বাধীনতার চেতনা ভূলন্ঠিত করার উদ্দেশ্যে, ১৯৭৯ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে বিপুল সংখ্যক দালাল ও স্বাধীনতা বিরোধীকে বিজয়ী করে জাতীয় সংসদে আনা হয়।
পরের পর্ব তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

ব্রেকিং নিউজঃ