| |

সাবেক এমপি মরহুম শামসুল হকের স্মৃতি চারনে আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর কদ্দুছ মাখন

আপডেটঃ 12:43 pm | May 30, 2020

Ad

মো: নাজমুল হুদা মানিক ॥ জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ সহচর, ময়মনসিংহ ২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের ৫বারের সাবেক এমপি, দেশবরেন্য রাজনীতিবীদ, মানুষের অধিকার আদায়ে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর জননেতা এম শামসুল হক সাহেবের স্মৃতিচারন করে মরহুমের প্রতি আত্নার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন সাবেক তুখোর ছাত্রনেতা ও বর্তমানে প্রতিবাদী আওয়ামীলীগ নেতা এম আব্দুল কদ্দুছ মাখন। তাঁর এফবিতে লিখাটিতে তিনি লিখেন, সাবেক এমপি মরহুম শামসুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা।
২৭ মে ময়মনসিংহ অঞ্চলের কিংবদন্তি তূল্য জনপ্রিয় আওয়ামীলীগ নেতা শামসুল হকের মৃত্যু দিবস। ঠিক করেছিলাম ২৭/০৫/টি২০ তারিখে লেখাটি ফেসবুকে পোষ্ট করবো। কিন্তু ২৬/০৫/টি২০ তারিখ থেকে মরহুম শামসুল হক সাহেবের অনুসারীদের শত শত পোষ্ট দেখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি। কারণ যদি কারো লেখা থেকে নতুন কিছু পাওয়া যায়। গত দুদিন উনার বিষয়ে শত শত নেতাকর্মীর লেখা পাঠ করে ভালোবাসা দেখে অভিভূত হলাম। জনাব শামসুল হক সম্বন্ধে লিখলে বই হয়ে যাবে,তাই আমি শুধু স্মৃতিচারণ মূলক কিছু লিখবো।
বঙ্গবন্ধু রচিত অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে শামসুল হক সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, খালেক নেওয়াজ, শামসুল হক, রশীদ ময়মনসিংহের বিশিষ্ট কর্মী, তারা হাশিম উদ্দীন কে পছন্দ না করলেও আমাকে ভালোবাসত। তাদের সাহায্য পেলাম কাউন্সিলর দের থাকার ব্যবস্থা করতে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা বলেছেন, শামছু ভাই না থাকলে সংসদ জমে না।
বিএনপি শাসনামলে কোন এক বিষয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্ক চলাকালীন সময়ে স্পীকার শামসুল হক এমপির মাইক বন্ধ করে দিলে, মাইক ছাড়াই বক্তব্য শেষ করে ভরাট গলায় শামসুল হক বলেছিলেন, মাননীয় স্পীকার, বক্তৃতা দিতে শামসুল হকের মাইক লাগে না।
জেনারেল জিয়া জামায়াত ইসলামীর নেতা কুখ্যাত গোলাম আজমের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিলে তা বাতিলের জন্য শামসুল হক এমপি সংসদে বিল উত্থাপন করেছিলেন। এজন্যে গোলাম আজম সমর্থক জামাত শিবিরের নেতাকর্মীরা তাকে প্রান নাশের হুমকি দিয়েছিল। উনিও মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। জামাত শিবির তাকে মোকাবেলার সাহস পায়নি।
মরহুম শামসুল হক সাহেবের একটি ঘটনা দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়। কোন এক জনসভায় বক্তৃতায় উনি নাকি বলেছিলেন, ৩০ কোটি শহীদদের রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। পিছন থেকে তার এক সহকর্মী তাকে বলেছিল, শামছু ভাই, ৩০ কোটি নয় ৩০ লাখ। শামছু ভাই বলেছিলেন, যা কইছি কইছিই, একটাও কমাইতাম না। এরপর থেকে দেশব্যাপী তার নাম হয়েছে গাইরা (একরোখা) সামছু। উনি ছিলেন এক কথার মানুষ। তার কাজে ও কথায় মিল ছিলো।
প্রয়াত শামসুল হক ছিলেন একজন ভোজন রসিক মানুষ। খাবারে তার প্রচন্ড রুচি ছিলো। একবার শেরপুর সদরের এমপি আতিউর রহমান আতিক এমপি হোষ্টেলে তার রুমে নাস্তা খাবার আয়োজন করেছিলেন। শামসুল হক প্রথম হয়েছিলেন, আমি দ্বিতীয়। উনি আমার প্রশংসা করে বলেছিলেন মমিসিংঙ্গা পুলা খাইবার জানে। এরপরে একদিন এমপি হোষ্টেলে তার রুমে বিশেষ ব্যবস্থায় নামীদামী ও সুস্বাদু মাছ ভাত পেট পুরে খেয়ে ছিলাম। যথারীতি উনি প্রথম আমি দ্বিতীয়। উনি খেয়ে এবং খাইয়ে প্রশান্তি লাভ করতেন।
উনার ডায়াবেটিস ছিলো। কিন্তু পেট ভরে ছানা পায়েশ, চমচম ও মিষ্টি খেয়ে চিনি ছাড়া চা পান করতেন। উনি সব সময় সঙ্গী সাথীদের আনন্দ দিতেন কিন্তু কিছু বুঝতে দিতেন না।
শামসুল হক এমপির বন্ধু ফুলপুরের আবু আলী ফকির সম্পর্কে আমার ফুফা শ্বশুর। শামছু ভাইয়ের সামনে একদিন ফকির সাহেবকে ফুফা বলে সম্বোধন করায় কড়া মেজাজে শামছু ভাই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ফকির ফুফা হলে আমি ভাই হই কিভাবে? সেদিন থেকে উনিও ফুফা হয়ে গেলেন, আমি ভাস্তি জামাই।
মরহুম শামসুল হক ময়মনসিংহ জেলার তদানিন্তন ফুলপুর থানার (হালে তারাকান্দা) ১৯ নং কামারিয়া ইউনিয়নের কামারিয়া গ্রামে ১৯৩০ সনের ২৯ জানুয়ারী জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম এডভোকেট মরহুম ছমির উদ্দীন। উনি ময়মনসিংহ অঞ্চলের স্বনামধন্য আনন্দ মোহন কলেজের ছাত্র ছিলেন। ছাত্র জীবনে উনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। পর্যায়ক্রমে শামসুল হক ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ অলঙ্কৃত করেছেন।
শামসুল হক সাহেব ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় নেতা ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে উনি ঐদিন সন্ধায় ময়মনসিংহ শহরে মিছিলে নেতৃত্ব দেন। তখন উনি ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সেক্রেটারী। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ার কারনে ঐ সময় পুলিশ তাকে ময়মনসিংহ ষ্টেশন রোড থেকে গ্রেফতার করে ৬ মাস জেলে আটক রাখে।
মরহুম শামসুল হক বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ ৬ দফা ও ১৯৬৯ এর গনঅভ্যুত্থানে সক্রিয় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
উনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। উনি একাধারে সাহসী ও কৌশলী সংগঠক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সাবেক রাষ্ট্রদূত আবদুস সুলতান একদিন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ঢালুতে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে বসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিকটে আত্মসমর্পণের কথা প্রকাশ করলে, মুক্তিযুদ্ধের তরুণ সংগঠক শামসুল হক সাথে সাথে পিস্তল বের করে বলেন, তার আগে তোকেই শেষ করে দিব। শামসুল হক বুঝতে পেরেছিলেন আবদুস সুলতান আত্মসমর্পণ করলে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতি হবে,তাই গরম সুরে তাকে নিরস্ত করেছিলেন।
শামসুল হক জাতীয় সংসদের ১৫০ ময়মনসিংহ-২ আসন (ফুলপুর-তারাকান্দ) থেকে ১৯৭০, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৮৮ সনে নির্বাচিত হয়েছিলেন ফুলপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। এমপি ও চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় উনি ফুলপুরের চতুর্মূখী উন্নয়নে সব থেকে বড় ভুমিকা পালন করেছেন।
রজব আলী ফকিরের প্রবল বিরোধিতার মুখে শামসুল হকের দৃঢ়তার কারণে ফুলপুর ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উনি নিজ উদ্যোগে তারাকান্দা সদরে প্রতিষ্ঠা করেছেন বঙ্গবন্ধু ডিগ্রী কলেজ। ফুলপুর মহিলা কলেজ ও বওলা কলেজের এমপিও হয়েছে শামসুল হক এমপির মাধ্যমে। এছাড়া আরো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ মাদ্রাসা নির্মানে তার অবদান অনস্বীকার্য।
উনি এমপি থাকার সময় মালিঝি নদীর উপর রাজঘাট,ছনধরায় ও দেশ বিখ্যাত বালিয়া মাদ্রাসার সন্নিকটে বিশাল দিস্তা ব্রীজ নির্মান করে ফুলপুরের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে বিপ্লব ঘটিয়েছেন।
মরহুম জননেতা শামসুল হক থানা হবার পূর্বেই তারাকান্দায় ফুলপুরের পশু হাসপাতাল স্থাপন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। কারণ পশু হাসপাতাল সাধারণ থানা বা উপজেলা সদরে স্থাপন করা হতো। তারাকান্দাকে থানা বানানোর এটা ছিলো শামসুল হকের প্রথম দূরদর্শী পদক্ষেপ। উনি তারাকান্দায় সাব রেজিস্ট্রারের অফিস স্থাপন করেছেন। সবশেষে তারাকান্দাকে থানা ও উপজেলায় উন্নীত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।
শামসুল হক ছিলেন একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ। ময়মনসিংহ শহরের পন্ডিত পাড়ায় তার পৈত্রিক নিবাস। উনি ময়মনসিংহ জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি সহ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়ীত্ব পালন করেছেন। ময়মনসিংহ অঞ্চলে আওয়ামীলীগের শক্তিশালী অবস্থানের পিছনে জনাব শামসুল হকের ভুমিকা অপরিসীম, অতুলনীয়। বৃহত্তর ময়মনসিংহের আনাচে কানাচে শামসুল হক জনপ্রিয়। অত্র এলাকায় সর্বত্র তার ভক্ত ও কর্মী পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন আনন্দ মোহন কলেজে তার শিক্ষক। ছাত্র শামসুল হকের প্রস্তাবে শিক্ষাগুরু সৈয়দ নজরুল ইসলাম নবগঠিত আওয়ামীলীগে যোগদান করেছিলেন।
ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা একনিষ্ঠ আওয়ামীলীগ নেতা, ফুলপুর-তারাকান্দার গণ মানুষের ভোটে বার বার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, বৃহত্তর ময়মনসিংহের আওয়ামীলীগের অন্যতম অভিভাবক শামসুল হকের মহাপ্রয়ান ময়মনসিংহ অঞ্চলের লাখো মানুষকে স্তম্ভিত ও মর্মাহত করেছে। এ ক্ষতি অপূরনীয়।
প্রিয় নেতার মৃত্যু বার্ষিকীতে অবনত চিত্তে শ্রদ্ধা জানাই।

ব্রেকিং নিউজঃ