| |

বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্ধি ননীবালা দেবী

আপডেটঃ ১০:২৮ অপরাহ্ণ | জুন ০১, ২০২০

Ad

প্রদীপ ভৌমিক :
কাপড় খুলে শরীরে দুবাটি লঙ্কাবাঁটা ঢোকানো হয়েছিল, না না নেহেরু -গান্ধী মোটেই নয়, ওনারা তো ব্রিটিশ পরিবারের অনুগত।ইনি ননীবালা দেবী।। বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দী ননীবালা দেবী জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৮৮ সালে হাওড়া জেলার বালিতে। বাবা সূর্যকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, মা গিরিবালা দেবী। সেই সময়ের সামাজিক রীতি মেনে ১৮৯৯ সালে মাত্র এগার বছর বয়সে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় ১৯০৪ সালে তাঁর স্বামী মারা যান। তাঁর বয়স তখন মাত্র ষোল। এরপর তিনি তাঁর বাবার কাছেই ফিরে আসেন।
১৯১৪ সালে বেধেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সেই সময় ভারতে যুগান্তর দলের বিপ্লবীরা জার্মানির কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভারতব্যাপী একটা বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে, স্বাধীনতা আনবার রাস্তা পরিষ্কার করতে চেষ্টা করেছিলেন। বাঘা যতীন ও রাসবিহারী বসুর মিলিত চেষ্টায় দ্বিতীয় সিপাহি বিদ্রোহের (২১ফেব্রুয়ারি, ১৯১৫) পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, রাসবিহারী বসু ভারত ত্যাগ করেন। ইংরেজ সরকার ভারত-জার্মান যোগাযোগের খবর জেনে যায়। বাঘা যতীন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বালেশ্বরের যুদ্ধে শহীদ হন (১০ই সেপ্টেম্বর ১৯১৫)। তাঁর মৃত্যুতে বাংলার বিপ্লবী কাজে অপূরণীয় ক্ষতি হয়। তবুও ইংরেজের রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে পূর্ব-ভারতের পথ ধরে চীন ও আসামের মধ্য দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র আনিয়ে ভারতে বিদ্রোহ ঘটাবার জন্য বিপ্লবীরা আবার চেষ্টা করেছিলেন যাদুগোপাল মুখার্জীর নেতৃত্বে।
চারদিকে চলছে তখন আহত ব্রিটিশ-সিংহের প্রচণ্ড আক্রমণ ও নির্মম অত্যাচার। সেই অত্যাচারের ধরন ছিল- ফাঁসি, দ্বীপান্তর, পুলিসের নির্যাতনে পাগল হয়ে যাওয়া এবং চার্লস টেগার্টের তদারকে নিত্য নতুন বীভৎস অত্যাচার। মলদ্বারে রুল ঢোকানো, কমোড থেকে মলমূত্র এনে মাথায় ঢেলে দেওয়া, চোখের মণিতে সুঁচ ফোটানো, গরম লোহা হাতের তালু বা পায়ে চেপে ধরা, কয়েকদিন উপোস করিয়ে পিছনে হাতকড়া অবস্থায় ঠা ঠা রোদে বন্দীকে দাঁড় করিয়ে রেখে লাথি ও রুলের মার – এই ছিল টেগার্টের অত্যাচারের রীতি। এইরকম অসহায় বিপদভরা দিনে, সম্পর্কে ভাইয়ের ছেলে বিপ্লবী অমরেন্দ্র চ্যাটার্জীর কাছে বিপ্লবের দীক্ষা পেলেন বাল্যবিধবা ননীবালা দেবী। দেশকে ভালোবেসে বিপ্লবীদের হয়ে তিনি নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিতেন ও নিপুণ দক্ষতায় সে কাজ সম্পন্ন করতেন। অনেক কাছের মানুষও টের পেত না যে তিনি বিপ্লবী দলের সক্রিয় সদস্য। তিনি বিপ্লবীদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতেন, এক জায়গার নেতাদের নির্দেশ ও নানা দরকারি খবর অন্য জায়গার বিপ্লবীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। অস্ত্রশস্ত্র নিজের কাছে লুকিয়ে রাখতেন আবার গোপনে বিপ্লবীদের কাছে পৌঁছেও দিতেন।
১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে
ভারত-জার্মান যোগাযোগ এবং তার পরের পর বিভিন্ন ঘটনার খবর পেয়ে, সেই সম্পর্কে পুলিস কলকাতার ‘শ্রমজীবী সমবায়’ নামে এক প্রতিষ্ঠানে তল্লাশী করতে যায়। তল্লাশীর সময় অমর চ্যাটার্জী পলাতক হন এবং এক সঙ্গী রামচন্দ্র মজুমদার গ্রেপ্তার হন।
পলাতক অমর চ্যাটার্জী এবং তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে প্রায় দুই মাস আশ্রয় দিয়ে রাখলেন ননীবালা দেবী রিষড়াতে। এদিকে গ্রেপ্তারের সময় রামচন্দ্র মজুমদার একটা ‘মাউজার’ (Mauser) পিস্তল কোথায় রেখে গেছেন সে-কথা দল কে জানিয়ে যেতে পারেননি। বিপ্লবীদের দরকার ছিল সেটির, কিন্তু কীভাবে সন্ধান জানা যাবে?
অতএব জেলে ঢুকে রামচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করে পিস্তলের খোঁজ আনতে চললেন দুঃসাহসী ননীবালা দেবী। সেদিনের সমাজে যা কেউ কল্পনা করতেও পারত না তাই করলেন তিনি। বিধবা ননীবালা দেবী রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী সেজে, তাঁর সঙ্গে প্রেসিডেন্সি জেলে দেখা করতে এলেন। ১৯১৫-১৬ সালে যে যুগ ছিল তখন বাঙালী বিধবাদের পক্ষে সিঁদুর মাথায় এরকম পরের স্ত্রী সেজে জেলে গিয়ে পুলিসের কড়া দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে কাজ হাসিল করার কথা কেউ চিন্তাও করতে পারত না। পুলিস তো নয়ই, কোনো সাধারণ মেয়েও নয়। আজকের সমাজ ও সেদিনকার সমাজ – মধ্যে আছে বিরাট সাগরের ব্যবধান। বিধবা ননীবালা সধবার সাজে সিঁদুর পরে একগলা ঘোমটা দিয়ে রামচন্দ্রের স্ত্রী সেজে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন জেলে। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পিস্তলের সন্ধান জেনে বেড়িয়ে এলেন প্রেসিডেন্সি জেল থেকে।
পুলিস অনেক পরে জানাত পারল যে, ননীবালা দেবী রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী নন। কিন্তু এটা জানতে পারেননি যে, তিনিই রিষড়াতে ছিলেন আশ্রয়দাত্রী।
পুলিশ নজর এড়াতে ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চন্দননগরে আবার বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। তবে রিষড়ার মতো এখানেও মেয়েরা না থাকলে বাড়ি ভাড়া পাওয়া যেত না। তখন আবার এলেন ননীবালা দেবী, গৃহকর্ত্রীর বেশে। এখানে এইসময়ে আশ্রয়দানের উদ্দেশ্যে তাঁর বড়পিসিকেও এনেছিলেন বিপ্লবী ভোলানাথ চ্যাটার্জী। এই বড়পিসি ও ননীবালা দেবী দুটো আলাদা বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে রেখেছিলেন পলাতক বিপ্লবীদের। পলাতক হয়ে আছেন সেখানে বিপ্লবী নেতা যাদুগোপাল মুখার্জী, অমর চ্যাটার্জী, অতুল ঘোষ, ভোলানাথ চ্যাটার্জী, নলিনীকান্ত কর, বিনয়ভূষণ দত্ত ও বিজয় চক্রবর্তী। এঁদের সকলেরই মাথায় অনেক হাজার টাকার হুলিয়া ছিল। এই নিশাচরেরা সারাদিন দরজা বন্ধ করে ঘরে কাটিয়ে দিতেন। শুধু রাতে সুবিধা মতো বেড়িয়ে পড়তেন। পুলিস এসে পড়লেই এই পলাতক বিপ্লবীরা নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যেতেন।
এইভাবে চন্দননগরের বিভিন্ন জায়গায়ে কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশী ও বিপ্লবীদের নিমেষে পলাবার পর ননীবালা দেবীকে আর চন্দননগরে রাখা নিরাপদ হলো না। কারণ পুলিস তৎপর হয়ে উঠেছিল ননীবালা দেবীকে গ্রেপ্তার করতে। তাঁর বাবা সূর্যকান্ত ব্যানার্জীকে পুলিস বালি থানাতে নিয়ে গিয়ে দশটা থেকে পাঁচটা অবধি বসিয়ে রেখে জেরা করত – ননীবালা দেবীর কোথায় আছেন জানতে।
ননীবালা দেবী পলাতক হলেন। তাঁর এক বাল্যবন্ধুর দাদা প্রবোধ মিত্র কাজের জন্য যাচ্ছিলেন পেশোয়ার। বাল্যবন্ধু তার দাদাকে অনেক অনুনয় করে রাজী করালেন ননীবালাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে। ননীবালা দেবী পলাতক অবস্থায় তাঁর সঙ্গে পেশোয়ার গেলেন। এও এক অনন্য কাজ, এক বাঙালী বিধবা অচেনা এক পুরুষের সাথে কয়েক হাজার কিমি দূরে সম্পূর্ণ অন্য এক জায়গায়ে চলে গেলেন লুকিয়ে থাকতে! প্রায় ষোলো-সতের দিন পরে পুলিস সন্ধান পেয়ে যখন ননীবালা দেবীকে গ্রেপ্তার করতে পেশোয়ার গেছে, তখন ননীবালা দেবীর কলেরা চলছে তিনদিন ধরে। প্রথমদিন বাড়ি ঘিরে রেখে তার পরদিনই নিয়ে গেল তাঁকে পুলিস-হাজতে স্ট্রেচারে করে। কয়েকদিন পেশোয়ার হাজতে রাখার পর একটু সুস্থ অবস্থায় তাঁকে নিয়ে আসা হয় কাশীর জেলে, তখন তিনি প্রায় সেরে উঠেছেন।
কাশীতে আসার কয়েকদিন পরে, প্রতিদিন তাঁকে জেলগেটের অফিসে এনে কাশীর ডেপুটি পুলিস-সুপারিনটেন্ডেন্ট জিতেন ব্যানার্জী জেরা করত। ননীবালা দেবী সবই অস্বীকার করতেন – বলতেন কাউকেই চেনেন না, কিছুই জানেন না। তারপর জিতেন ব্যানাজীর তুই-তুকারির অসভ্য ভাষা। ননীবালা দেবী তখনও চুপচাপ থাকতেন।
একদিন দুইজন জমাদারনী (Wardress) ননীবালা দেবীকে একটা আলাদা সেলে (cell) নিয়ে গেল। দুজনে মিলে তাকে জোর করে ধরে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর সমস্ত কাপড় খুলে নিয়ে দু-বাটি লঙ্কাবাটা ওঁর শরীরের ভেতরে দিয়ে দিতে লাগল। ননীবালা দেবী চীৎকার করে লাথি মারতে লাগলেন সমস্ত শক্তি দিয়ে। অসহ্য অসম্ভব অসহনীয় এক বীভৎস জ্বালা, যার বর্ণনা করার ভাষা নেই। এভাবেই অত্যাচার চলত, তার পর আবার তাঁকে নিয়ে আসা হত সেই জেল-গেটের অফিসে জিতেন ব্যানার্জীর কাছে। আবার জেরা। এত অত্যাচার, শরীরের ভেতরে লঙ্কার জ্বালা, তবু তাঁকে ভাঙা সম্ভব হ’ল না।
কাশীর জেলে – সেখানে মাটির নীচে একটা খুবই ছোট ‘পানিশমেন্ট সেল’ অর্থাৎ শাস্তি কুঠুরী ছিল। তাতে দরজা ছিল একটাই, কিন্তু আলো বাতাস প্রবেশ করবার জন্য কোনো জানালা বা সমান্য ঘুলঘুলিও ছিল না। জিতেন ব্যানার্জী তিন দিন প্রায় আধঘণ্টা সময় ধরে ননীবালা দেবীকে ঐ আলো-বাতাসহীন অন্ধকার সেলে তালাবন্ধ করে আটকে রাখত। কবরের মতো সেলে আধঘণ্টা পরে দেখা যেতো ননীবালা দেবীর অর্ধমৃত অবস্থা, তবু মুখ দিয়ে স্বীকারোক্তি বের করতে পারল না। তৃতীয় দিনে বন্ধ রাখল আধঘণ্টারও বেশি, প্রায় ৪৫ মিনিট। স্নায়ুর শক্তিকে চূর্ণ করে দেবার চূড়ান্ত প্রচেষ্টা। সেদিন তালা খুলে দেখা গেল ননীবালা দেবী পড়ে আছেন মাটিতে, জ্ঞানশূন্য।
হাল ছেড়ে দিয়ে পুলিস ননীবালা দেবীকে কাশী থেকে নিয়ে এল কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেলে। ১৮১৮ সালের তিন নম্বর রেগুলেশনের ধারা প্রয়োগ হল তাঁর বিরুদ্ধে, প্রথম মহিলা রাজবন্দি হিসাবে প্রেসিডেন্সি জেলে এলেন তিনি। সেখানে গিয়ে তিনি খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। জেল-কর্তৃপক্ষ, এমনকি জেলা-ম্যাজিস্ট্রেটও তাঁকে অনুরোধ করে খাওয়াতে পারলেন না। ননীবালা দেবী বললেন, বাইরে গেলে খাবেন। প্রতিদিন সকাল ৯টায় নিয়ে যেত তাঁকে গোয়েন্দা-আফিসে, সেখানে আই.বি. পুলিসের স্পেশাল সুপারিনটেন্ডেন্ট গোল্ডি (Goldie) তাঁকে জেরা করত।
-আপনাকে এখানেই থাকতে হবে, তাই বলুন কী করলে খাবেন?
-যা চাইব তাই করবেন?
-করব।
-আমাকে বাগবাজারে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের স্ত্রী সারদা মা’য়ের কাছে রেখে দিন, তাহলে খাব।
গোল্ডি শয়তানি হাসি লুকিয়ে বলে-আপনি দরখাস্ত লিখে দিন।
ননীবালা দেবী তখুনি দরখাস্ত লিখে দিলেন।
গোল্ডি সেটা নিয়ে ছিড়ে দলা পাকিয়ে ছেড়া কাগজের টুকরিতে ফেলে দিল। এবারে সবাইকে চমকে দিয়ে হঠাৎ আহত বাঘের মতো লাফিয়ে উঠে ননীবালা দেবী এক চড় বসিয়ে দিলেন গোল্ডির মুখে।
-ছিড়ে ফেলবে তো, আমায় দরখাস্ত লিখতে বলেছিলে কেন? আমাদের দেশের মানুষের কোনো মান সম্মান থাকতে নেই? দ্বিতীয় চড় মারবার আগেই অন্য সি.আই.ডি’রা তাঁকে ধরে ফেলে। – একশো বছরেরও আগে এক বাল্য বিধবা মেয়ের কি আশ্চর্য সাহস !
জেলের মধ্যে একদিন সিউড়ির দুকড়িবালা দেবীর (১৮৮৭-১৯৭০) সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সকলের কাছে তিনি ‘মাসিমা’ নামে পরিচিতি ছিলেন। দুকড়িবালা দেবী ছিলেন ভারতে ‘অস্ত্র আইনে সাজা প্রাপ্ত প্রথম মহিলা বন্দি’। জানতে পারলেন, সিউড়িতে দুকড়িবালা দেবীর বাড়িতে সাতটা ‘মাউসার’ (Mauser) পিস্তল পাবার অপরাধে দুকড়িবালা দেবীর হয়েছে দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড। রাখা হয়েছে তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদী করে (মানে চোর-ডাকাত’দের সাথে একই সেলে। রাজবন্দী হলে আলাদা সেলে আলাদা ভাবে রাখা হয়)। অসম্ভব খাটাচ্ছে, ডাল ভাঙতে দিচ্ছে প্রতিদিন আধমণ।
মতলব স্থির করে ফেললেন ননীবালা দেবী। উপবাসের ১৯ থেকে ২০ দিন চলছে তখন। আবার এলেন ম্যাজিস্ট্রেট অনুরোধ করতে।
-আপনাকে তো এখানেই থাকতে হবে। কী করলে খাবেন বলুন?
-আমার ইচ্ছামতো হবে?
-হ্যাঁ, হবে।
-তাহলে আমার রান্না করবার জন্য একজন ব্রাহ্মণ-কন্যা চাই, দুজন ঝি চাই।
-ব্রাহ্মণ-কন্যা কেউ আছেন এখানে?
-আছেন, দুকড়িবালা দেবী।
-আচ্ছা, তাই হবে।
এরপরে এলো সমস্ত নতুন বাসন-কোসন, হাঁড়িকুড়ি। ২১ দিনের পরে ভাত খেলেন সেই অসামান্য দৃঢ়চেতা বন্দিনী। সেইসাথে দুকড়িবালা দেবী’কেও বাঁচালেন পরিশ্রম থেকে।
দুই বছর এইভাবে বন্দীজীবন কাটিয়ে দিলেন তিনি। ১৯১৯ সালের এক দিন ননীবালা দেবীর মুক্তির আদেশ এলো।
জেল থেকে ফিরে এসে বালিতে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে তিনি ঠাই পেলেন না। প্রথমত সকলেই পুলিসকে ভয় পায়। এছাড়া বিধবা হয়েও পরস্ত্রী সাজা, পরপুরুষের সাথে একঘরে থাকা বা পেশোয়ার যাওয়া – এইসব কারনে সেই সময়ের অদ্ভুত সমাজের এক পক্ষ তাঁকে মেনে নেয়নি, মেনে নেয়নি তাঁর নিজের বাড়ীর লোকেরা। অন্যদিকে তাঁর নিজস্ব বিপ্লবী সংগঠন বা চেনাজানা সবটাই ব্রিটিশ পুলিশের অত্যাচারে শেষ হয়ে গেছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এই অবস্থায় তখন উত্তর কলকাতার এক বস্তিতে তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়। (অন্য মতে, কোনও পূর্বপরিচিতের অনুগ্রহে একটি কুঁড়ে ভাড়া করেছিলেন হুগলিতে)। সুতো কেটে, রান্নার কাজ করে কোনমতে আধপেটা খেয়ে তাঁর দিন কাটতে থাকে। সমাজ এবং নিজের আত্মীয়-স্বজনদের ওপর রাগে, দু:খে, অপমানে তিনি সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন .. নিজেকে একপ্রকার লুকিয়ে রাখলেন .. এমনকি পরবর্তীকালের কোনও দেশনেতাদের কাছেও গেলেন না। যিনি সমাজকে উপেক্ষা করে দেশের কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন, তিনি কোথায় গেলেন সে ব্যাপারে কেউ জানতেও পারল না, খোঁজও করলো না।
দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় কুড়ি বছর পরে ১৯৬৭ সালের মে মাসে তিনি মারা যান। না, ইতিহাস তাঁর জন্মদিন বা মৃত্যুদিনের তারিখ মনে রাখার প্রয়োজনবোধ করেনি। একটা সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে, পুরনো কোনও বিপ্লবী সাথীর চেষ্টায় অথবা পরাধীন জেলের খাতায় নাম থাকায়, বেঁচে থাকা অবস্থায় পঞ্চাশের দশকে ৫০ টাকা পেনশন পেয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে – যদিও তার কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। কেউ মনে রাখেনি যাঁদের আত্মত্যাগের কথা তাঁদের দলেই ছিলেন বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দী ননীবালা দেবী। তবে স্বদেশীদের নিয়ে তৈরি একটি বাংলা সিনেমায় (সিনেমার নাম ‘বিয়াল্লিশ’) তাঁকে নিয়ে কিছু দৃশ্য ছিল, এইটুকুই। শুধু দেশের জন্য বিধবা হয়েও সধবা সেজেছিলেন, খুবই ছোট কুঠুরী ‘পানিশমেন্ট সেলে’ শ্বাস নিতে না পেরে কতবার অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন। সামান্য একটা গোটা কাঁচালঙ্কা শুধু খেতে বললেই আমরা ভয় পাবো। এইরকম দু-বাটি লঙ্কাবাটা তাঁর শরীরের গোপন জায়গায়ে ভেতরে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কি অপরিশীম যন্ত্রণা তিনি সহ্য করেছিলেন – আমরা সুস্থ অবস্থায় কেউই তা অনুভব করতে পরবো না। উনিশ শতকের গোড়ার বিধবা মহিলা হওয়া সত্বেও নিজ চেষ্টায় তিনি সামান্য লেখাপড়া শিখেছিলেন। নিজে সুতো কেটে পৈতে তৈরি করে তা বিক্রি করে নিজের খরচ চালাতেন। তবু সেই সময়ের বাংলার কোথাও তিনি সম্মানের সাথে থাকার জায়গা পেলেন না। স্বাধীন ভারতেই তাঁকে অনাহারে কাটাতে হোলো। একবুক অভিমান নিয়ে তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখলেন – যা তাঁর মৃত্যুর পরেও শেষ হয়নি।
তাঁর কিছু মহিলা সহযোদ্ধাদের টুকরো টুকরো নানা লেখা থেকে যেটুকু জানা গেছে তাঁর বিষয়ে সেটুকু পুঁজি করেই তাঁকে এই শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন।
জয় হিন্দ্
-সোমনাথ.সিংহ@s.sinha
তথ্য: @স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী: কমলা দাশগুপ্ত; @স্বাধীনতার সংগ্রামের মঞ্চে ভারতের নারী: কৃষ্ণকলি বিশ্বাস।

ব্রেকিং নিউজঃ