| |

১৩শ’ বছর আগে ইউরোপে মিলেমিশে ছিল মুসলিম-খ্রিস্টান

আপডেটঃ 8:22 pm | February 29, 2016

Ad

আলোকিত ময়মনসিংহ : ফ্রান্সের নৃবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে খুঁজে পেয়েছেন সেখানকার মুসলিমদের প্রচীনতম কয়েকটি কবর। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো শুধু ফ্রান্সেরই নয়, পুরো ইউরোপে মুসলিমদের প্রাচীনতম সমাধি। এগুলো পাওয়া গেছে খ্রিস্টানদের সমাধি ’সিমেট্রি’র বাইরে। ফ্রান্সের নৃবিজ্ঞান বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পিএলওএস ওয়ান’ (প্লস ওয়ান) এ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

দেশটির নিমস শহরের কবরগুলোতে পাওয়া কয়েকটি কঙ্কাল পরীক্ষা করে গবেষকরা জানিয়েছেন, মৃতদেহগুলোকে মক্কার দিকে মুখ করে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। কঙ্কালগুলোর রেডিওকার্বন পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে, এর হাড়গুলো সপ্তম অথবা অষ্টম শতকের। এ নিয়ে আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত মানুষগুলোর পূর্বপুরুরষরা ছিল উত্তর আফ্রিকার বাসিন্দা, যাদের বলা হয় ‘বার্বার’।

এ বিষয়গুলো নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে, মুসলিমরা আসলে কখন পশ্চিম ইউরোপে প্রবেশ করেছিল। ১৪৯২ সাল পর্যন্ত আইবেরীয় উপদ্বীপে বিদ্যমান ছিল মুসলিম সাম্রাজ্য। পাশ্চাত্যে মুসলিমদের প্রবেশ এবং শাসনকার্য পরিচালনার একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। গবেষকরা মনে করছেন, আবিষ্কৃত কঙ্কালগুলো বার্বারদের। আরব সেনাবাহিনী যখন উত্তর আফ্রিকা হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করে তখন তাদের সাথে মিশে গিয়েছিল বার্বাররা। তবে আবিষ্কৃত কঙ্কালগুলোর হাড়ে যুদ্ধাহত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

ফ্রান্সের জাতীয় নৃবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গবেষক এবং এই গবেষণা প্রকল্পের প্রধান ইভেস গ্লেজি এ বিষয়ে বলেন, ‘আগে থেকে আমাদের ধারণা ছিল, মুসলিমরা অষ্টম শতকের দিকে ফ্রান্সে প্রবেশ করে থাকতে পারে। তবে এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না।’

অষ্টম শতকের শুরুর দিকে ৭১৯ খ্রিস্টাব্দে আরবের উমাইয়া রাজবংশের সময় আরব সেনাবাহিনী স্পেনের ভূখণ্ড থেকে ফ্রান্সে অভিযান চালায় এবং বর্তমানে ফ্রান্সের শহর ‘নিমস’ অধিকার করে। শহরটি তখন রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। ৭৩২ সালে ট্যুরসের যুদ্ধে (ব্যাটেল অব ট্যুরস) মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করে ফরাসী সেনারা। এটাকে পাশ্চাত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। এ যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে খ্রিস্টানদের দূর্গে মুসলিমদের বিজয়ের চেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়।

যুদ্ধ জয়ে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে ফরাসী বাহিনীর প্রধান চার্লসকে ‘হ্যামার’ (হাতুড়ি) উপাধি দেয়া হয়। পরে পশ্চিমা খ্রিস্টান সমাজের প্রধান এই রাজনৈতিক রাষ্ট্রটির জনক হিসেবে উপাধি দেয়া হয় তাকে। অবশ্য আঠারো শতকের বিখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড গিবন দুইটি সভ্যতার এই সংঘাতকে ভিন্নভাবে বর্ণনা করছেন। তার মতে, আরবদের ইউরোপ অধিকারের চেষ্টা চার্লস বন্ধ করতে পারেননি। বরং গিবনের ধারণা ছিল, এর আগেই ফ্রান্সে মুসলিমদের অস্তিত্ব ছিল।

তিনি তার একটি বইয়ে লিখেছেন, ‘মুসলিমদের ইউরোপ বিজয়ের আনন্দ মিছিলটি ছিল জিব্রালটার প্রণালি থেকে ফ্রান্সের লোয়ার নদীর তীর পর্যন্ত। একইভাবে পোল্যান্ড থেকে শুরু করে স্কটল্যান্ডের উচ্চভূমি পর্যন্ত ছিল তাদের যাত্রা। এর আগেই তারা মিশরের নীল থেকে ইরাকের ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত অধিকার করেছিল। সুতরাং তাদের জন্য রাইন নদী অধিকার করা কঠিন কিছু ছিল না। বিভিন্ন তথ্য থেকে বোঝা যায়, মুসলিমরা কোনো প্রকার যুদ্ধ ছাড়া টেমস নদী পর্যন্ত প্রবেশ করেছিল।’

কবরে প্রাপ্ত হাড় এবং কবরের মাটি পরীক্ষা করে গবেষকরা তাদের প্রতিবেদনে বলেছেন, কয়েক শতক ধরে ইউরোপের অনেক জায়গায় মুসলিম এবং খ্রিস্টানরা একই সাথে বসবাস করেছে। এক সাথে কাজকর্ম করেছে এবং একই সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে জীবন যাপন করেছে। গবেষকদের মতে, এটাই শেষ কথা নয়। ফ্রান্সে মুসলিম শাসনামলে দেশটি দক্ষিণাঞ্চলের শাসকদের বিষয়ে পাওয়া বিভিন্ন প্রামাণিক তথ্য থেকে জানা যায়, ওই সময়ে প্রধান ধর্মবিশ্বাসগুলোর নিরাপত্তার বিধান ছিল এবং সবাই তা চর্চাও করতো।

গবেষণা প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়েছে, ‘ওই সময়ের তথ্যপ্রমাণ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, তখকার সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বর্তমানের গতানুগতিক বইগুলো থেকে আমরা যা জানি তার চেয়ে অনেক বেশি।’

ব্রেকিং নিউজঃ