| |

বীরঙ্গনা গুরুদাসীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ

আপডেটঃ 6:48 pm | July 14, 2020

Ad

সংগৃহীত প্রদীপ ভৌমিক :

এনাকে চিনেন? ইনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম স্মারক গুরুদাসী মন্ডল। খুলনার পাইকগাছার দেলুটি ইউনিয়নে বাড়ী। বাড়ি নয় এটা স্বাধীনতা যুদ্ধে নৃশংসতার এক খন্ড পবিত্র ভূমি। এখানে বসেই মুক্তির অন্তিম লগে গুরুদাসীর সামনে হত্যা করা হয় তার স্বামী সহ সন্তানদের। চোখের সামনে এমন বিভৎসতায় নির্বাক হয়ে যায় গুরুদাসী। এর পরে রাজাকারেরা তাকে ধরে নিয়ে যায় তাদের ক্যাম্পে, সেখানে দিনের পর দিন চলে নির্বাক গুরুদাসীর উপর ধর্ষণের বিভৎসতা। এক সময় ঐ ক্যাম্প দখল করে মুক্তিযোদ্ধারা, মুক্ত হয় অপ্রকৃতিস্থ গুরুদাসী। তখন থেকেই সে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াত খুলনার পাটকেলঘাটা ডুমুরিয়া সহ বিভিন্ন জায়গায়।
১৯৯০ সাল থেকে ৯৫ পর্যন্ত ডুমুরিয়া থাকার সুবাদে বিভিন্ন সময়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। সে এক বিচিত্র স্মৃতি। হঠাত একদিন তিনি আমার কর্মস্থলে এসে হাতে থাকা কঞ্চি দিয়ে আলতো করে একটা পিটান দিয়ে বলল দে, আমাকে পাঁচ টাকা দে। আমি কোন কথা না বলে দিলাম। তারপরে কি মনে করে আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল ব্যাথা পেয়েছিস? আমি বললাম না। সেই থেকে আমাকে তিনি ছেলে হিসাবে ডাকতেন। তিনি অফিসে এসে বলতেন, কই আমার ছাওয়াল কই? কথায় কথায় জানতে পাই তাঁর অতীত ঘটনা। তিনি বলেন, আমি আসলে পাগল না, পাগল সেজে থাকি। নয়তো আমার সেই স্মৃতি আমাকে উন্মাদ করে দেয়। তোদের সঙ্গে এমন করে সেই বিভৎস স্মৃতি ভুলে থাকি।
তিনি মাসে একবার আসতেন, পাঁচ দশ কিংবা বিশ টাকা দাবি করতেন কিংবা পকেটে হাত দিয়ে সব টাকা বেড় করে তার ইচ্ছা অনুযায়ী ঐ পরিমাণ টাকা নিতেন। কখনো বাধা দিতাম না। তিনি কখনো কখনো বলতেন তোর টাকা লাগবে? সরকারি দপ্তরে কারা অবৈধ টাকা আয় করে তাদের কথাও বলে যেতেন। কে কৃপণ কিংবা কে দুর্ব্যাবহার করত তাও বলতেন। কেমন করে তাঁর সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। তিনি তাঁর বাড়িতে নেবার জন্য চেষ্টা করেছেন, দুর্ভাগ্য আমার তা আর হয়ে ওঠেনি।
একদিন সকাল ১০টা নাগাদ উপজেলা কোর্টের সামনে আমাকে পেয়ে পকেটে হাত দিয়ে প্রায় ছয়শত টাকা নিয়ে গেল। আমি শূন্য পকেটে অফিসে চলে এলাম। ঘটনা শুনে অফিসের সবাই বেশ চিন্তিত হলো, এত টাকা নিলে আমি চলব কি করে? কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল গুরুদাসী ঠিক আসবে। হ্যাঁ দুপুর ২টা নাগাদ অফিসে এসে সব টাকা আমার টেবিলে রেখে বললেন, এই নে তোর টাকা। দেখলাম তোর মনটা কতবড়। আমি বললাম কি মনে হল? তিনি বলেন, তোকে আমি ছেলের মতো মনে করি। আমি বলি, তোমার প্রয়োজন তাই নিয়েছ। তিনি বলেন নারে, আমার অত প্রয়োজন নেই। দে আজকে পঞ্চাশ টাকা দে। সেই তার সর্বোচ্চ চাওয়া। এই হলো গুরুদাসী মন্ডল আমার বীরাঙ্গনা মা। স্বাধীনতায় সর্বোচ্চ ত্যাগী মা, স্বাধীনতার জীবন্ত কিম্বদন্তী। ১৯৯৫ সালে ডুমুরিয়া ছাড়ার পরে আর দেখা হয়নি। এর পরে তাঁকে নিয়ে অনেক হৈচৈ হয়েছে। তাঁর ঘর হয়েছে। টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার প্রচার হয়েছে। তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার এবং তার পরিবারের সর্বোচ্চ ত্যাগের কাছে আমরা চির ঋণী। এই ঋণের বিনিময়ে আমাদের এই দেশে কতটা সম্মান কতটা শ্রদ্ধা কতটা মূল্যায়ন হলো সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আজকে যারা দেশের ক্ষমতা ভোগ করেন তারা কি এদের কথা স্মরণ করেন? যদি না করেন তবে নিশ্চয়ই ইতিহাস একদিন আপনাদেরও আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেবে।
বীরাঙ্গনা মা গুরুদাসী মন্ডল তোমাকে সালাম। তুমি অনেক দিন হলো আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছ, কিন্তু স্মৃতিতে অমলিন। ভাল নেই তোমার বাংলাদেশ আজ আবার শকুনেরা ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে তোমাদের বহু ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশকে। যেমন করে ৭১-এ পাকিস্তানী ও দেশীয় কিছু রাজাকার, আলবদর, আল সামসের বেজন্মারা তোমাদের বীরঙ্গনা করেছে ঠিক তেমনি ভাবে তোমাদের বাংলাদেশকে প্রতিনিয়তই ধর্ষিত হতে হচ্ছে। বাংলাদেশ আজ দেশীয় শত্রুর দ্বারা লুন্ঠিত, ধর্ষিত ও সর্বশান্ত প্রায়। তাই আবারো আর একটি ৭১ চাই, দ্বিতীয় পর্বের ৭১ এবং এবারে পূর্বের সকল ভূলের খেসারত দিয়ে নতুন বাংলাদেশ উপহার দিতে হবে আগামী প্রজন্মের জন্য।
সংগৃহীত পোস্টটি সামান্য সংযোজন করে পোস্ট করা। মূল লেখাটির লেখকের নাম জানা যায়নি।

ব্রেকিং নিউজঃ