| |

উত্তাল মার্চের দিনগুলো

আপডেটঃ 4:16 am | March 01, 2016

Ad

৭০-এর নির্বাচনের পর ৭১-এর ২৫শে মার্চ নির্ধারিত ছিল পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১৯৭১ সনের ১লা মার্চ এক বেতার ভাষণে জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করেন। জনতা গর্জে উঠল। বাংলার জনতা আর বঞ্চনা সহ্য করতে পারছে না। আর ৬ দফা নয় এবার বাঙালি ১ দফা তথা স্বাধীনতার সংগ্রামে চূড়ান্তভাবে নেমে পড়েছে। ১লা মার্চ বিক্ষোভ মিছিলে ঢাকা উত্তাল স্লোগান উঠল আর নয় ৬ দফা এবার চাই স্বাধীনতা। বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা তোমার আমার ঠিকানা। ২রা মার্চ ছাত্র জনতা বঙ্গবন্ধুর ইঙ্গিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করল। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেন ৭ই মার্চ তিনি রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতিকে চূড়ান্ত দিক-নির্দেশনা দিবেন।

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ১৯৭১। বিশ লক্ষাধিক জনতার সমাগম রেসকোর্স ময়দানে মুহুর্মুহু স্লোগান উঠছে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। বীর বাঙালি অস্ত্রধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উপবিষ্ট হলেন। বঙ্গবন্ধু ২৩ বত্সরের পাকিস্তানী নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন। ধাপে ধাপে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের বর্ণনা দিলেন। বঙ্গবন্ধু জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার দিক-নির্দেশনা দিলেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে একটি জন যুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে শত্রুমুক্ত করার সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা দিলেন। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বললেন “আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার মানুষকে হত্যা করা হয়, তাহলে তোমাদের প্রতি আমার নির্দেশ রইল প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়াছি, রক্ত আরো দেব, বাংলাদেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ; এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। এই বলে বঙ্গবন্ধু ভাষণ শেষ করলেন। জনগণ প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। ২৫ মার্চ রাত ১২টায় পাকিস্তান বাহিনী বাংলাদেশের জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ও রাজারবাগ পুলিশ ও পিলখানা ইপিআরকে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করার নির্দেশ দেন। সাথে সাথে রাজারবাগ পুলিশ ও ইপিআর প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। রাজারবাগ পুলিশের প্রবল প্রতিরোধে পাকিস্তান বাহিনী এক পর্যায়ে পিছু হটে। পরে আবার প্রস্তুতি নিতে তারা রাজারবাগ আক্রমণ করে। সারারাত এ যুদ্ধ চলে। প্রায় সাড়ে আটশ’ পুলিশ শহীদ হল। প্রতিরোধ যুদ্ধের মাধ্যমেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। বাংলাদেশের ছাত্র জনতা, পুলিশ, ইপিআর এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। দিনের পর দিন মুক্তিবাহিনী দলে ভারি হতে থাকল। মুক্তিবাহিনী এক বিশাল বাহিনীতে পরিণত হল। ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গর্বিত হল। বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি করে সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী কর্ণেল ওসমানিকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক করা হইল। বাংলাদেশকে ১১টি যুদ্ধ সেক্টরে ভাগ করা হল। ১১ জন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ দেয়া হল। মুক্তিযুদ্ধ ধীরে ধীরে বেগবান হল। ওদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মার্শাল ‘ল’ কোর্টে বিচার শুরু হল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রথম দিকে খুব একটা বেগবান ছিল না। যার ফলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধীরে ধীরে জেলা, মহকুমা, থানা হেড কোয়ার্টারগুলো দখল করে নিল। মে মাসের শেষ দিক হতে মুক্তিযুদ্ধ ধীরে ধীরে বেগবান হতে শুরু করল। আগষ্ট-সেপ্টেম্বরে মুক্তিবাহিনী এতই শক্তিশালী হলো যে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের মুখে পাকিস্তান বাহিনী পর্যুদস্ত হতে থাকল। প্রতিটি রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর তীব্র আক্রমণে আর উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলায় পাকিস্তানী বাহিনী ছিন্ন ভিন্ন হতে থাকল। নভেম্বর মাসে পাকিস্তানী বাহিনী ঢাকায় জড়ো হতে শুরু করল। তারা আর ঢাকার বাইরে থাকতে পারল না। ডিসেম্বরে তারা ঢাকায় অবরুদ্ধ হয়ে গেল। ইতিমধ্যে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে ভারতীয় বাহিনীকে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করল। এই যৌথ বাহিনীর আক্রমণে টিকে থাকতে না পেরে পাকিস্তানী বাহিনী যৌথ বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করল। বাংলাদেশ স্বাধীন হল। সাড়ে সাত কোটি মানুষ এখন বঙ্গবন্ধুকে চায়, কেননা বঙ্গবন্ধুহীন স্বাধীনতা অর্থহীন মনে হলো। পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিলেন।

ব্রেকিং নিউজঃ