| |

স্বাস্থ্যব্যবস্থার সেকাল-একাল অধ্যাপক ডাঃ এম এ আজিজ

আপডেটঃ 1:36 pm | August 25, 2020

Ad

ইব্রহিম মুকুট ঃ চিকিৎসা যদিও আমাদের মৌলিক অধিকার, কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে তৎকালীন পূর্ব-বাংলার স্বাস্থ্য সেক্টর ছিল অবহেলিত। তখন কলেরা ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়ার প্রাদূর্ভাব ছিল তবুও প্রাইমারী হেলথ কেয়ার এর অবস্থা ছিল নাজুক। চিকিৎসকরা ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদেরও চাকুরির মর্যাদা কিংবা সামাজিক মর্যাদা কোনটাই আশানুরূপ ছিল না। ৭১’এর মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের স্বাস্থ্য সেক্টরকে পূণর্গঠিত করার হাত দেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ন্যায় আমাদের দেশের চিকিৎসকগণ মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং ৬৯জন চিকিৎসক শহীদ হন। চিকিৎসকদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল অগাধ আন্তরিকতা এবং ভালোবাসা। স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য সেক্টরে ব্যাপক উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা হাতে নেয়, যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিল– স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একজন চিকিৎসক-কে (ডাঃ টি হোসেন) স্বাস্থ্য সচিব হিসাবে নিয়োগ প্রদান করেন।- চিকিৎসকদের মর্যাদাকে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীতকরণ করেন।- নবীন চিকিৎসকদের ইন-সার্ভিস প্রথা চালু করে চাকুরির ধারাবাহিকতা রাখার সুযোগ করে দেন।- প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইউনিয়ন সাব-সেন্টার এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেন।- পরিবার-পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন।- গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার (বিএমআরসি) স্থাপন করেন।- উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান এন্ড সার্জনস (বিসিপিএস) প্রতিষ্ঠা করেন।- স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালকে পুর্নাঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে উন্নিতকরণ করেন যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭৩ সালে এমবিবিএস কোর্সের প্রথম ব্যাচ চালু হয়।- পুরাতন আইপিজিএম এন্ড আর- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শাহবাগে স্থানান্তর এবং উন্নীতকরণ করেন।- জনস্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)প্রতিষ্ঠা করেন।- শিশু স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর দিয়ে শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।- সংক্রমক রোগের চিকিৎসায় মহাখালীতে সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।- ড. আর জে গ্রাস্থের পরামর্শক্রমে পঙ্গু হাসপাতালের সম্প্রসারণ করেন।- শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ০৫ (পাঁচ) শয্যার প্লাষ্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপন।- বারডেম ও গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের জন্য জায়গা বরাদ্দ করেন।এছাড়াও ঔষধনীতি প্রস্তুত এবং ভিটামিন-এ এবং এন্টিহেলমেনথিক-ডে আরম্ভ করেন। এসব কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর দেশ পরিচালনায় স্বাস্থ্য সেক্টরে জনগণের মৌলিক অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য সেক্টরে আমূল পরিবর্তনের নতুন নতুন ধারার সূচনা করেন।১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্টের পট পরিবর্তনের পর দেশের অন্যান্য সেক্টরের মতো সারা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও আবারো অন্ধকারে নিমজ্জ্বিত হয় এবং বঙ্গবন্ধুর সেই উদ্যোগগুলো আবারো উপেক্ষিত এবং অবহেলিত হয়। জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকারের আমলে সকল শ্রেণী পেশার মানুষই নির্যাতিত ও বঞ্চিত হতে থাকেন। যার প্রেক্ষিতে ১৯৭৮ সালে আমরা পে-কমিশনের একটি বড় আন্দোলনও হতে দেখেছি। চিকিৎসকরাও তখন সংগঠিত হতে থাকেন এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের দাবী দাওয়া এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে তারাও সোচ্চার হতে শুরু করেন। জিয়ার অবৈধ সরকারের পতনের পর স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের শাসন আমল শুরু হয়। তখনও অবশ্য ১৯৮৫-৮৬ সালে প্রকৃচির মাধ্যমে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠে এবং তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) ডাক্তারদের বিভিন্ন দাবী দাওয়া সম্মিলিত ২১দফা এবং ২৩ দফা দাবী নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। চিকিৎসকদের ইন-সার্ভিস প্রথা বন্ধ করে দেয়ার ফলে সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন হয়। এক পর্যায়ে স্বৈরাচারী এরশাদ গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি ঘোষনা করল সারা দেশের চিকিৎসক সমাজ উত্তাল আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে এবং বিএমএ’র কাছে সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেয়। বিএমএ তিন জোটের রূপ রেখার রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে এই আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তোলে। ৯০’এর গণঅভ্যূত্থানে তখনকার বিএমএ’র যুগ্ম-সম্পাদক ডা. শামসুল আলম খান মিলন এর রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন হয়। আমরা চিকিৎসক এবং অন্যান্য পেশাজীবিরা আশা করেছিলাম পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার আমাদের কাঙ্খিত দাবী দাওয়াগুলোর সমূহ সমাধান করবে কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখলাম ভিন্ন অবস্থা।৯৬’র আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের ভোট ও ভাতের আন্দোলনে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন এর নেতৃত্বে চিকিৎসক সমাজ আবারো রাজনৈতিক আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে মাঠে নামে এবং তৎকালীন স্বৈরাচারী খালেদা সরকারের পতন হয়।

ব্রেকিং নিউজঃ