| |

অনন্যসাধারণ নজরুল-প্রাণিত হৃদয়াঞ্জলি

আপডেটঃ 3:06 pm | August 27, 2020

Ad

অনন্যসাধারণ নজরুল-প্রাণিত হৃদয়াঞ্জলি(১) আজ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলা সাহিত্যের ‘বর্ণিল, বিচিত্র,বহুমুখি, ব্যতিক্রমী, বহুমাত্রিক ও বিদ্রোহী বীর’ কাজী নজরুল ইসলাম। বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, মানবতার কবি, জাগণের কবি, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একাধারে শ্রমিক,সৈনিক,সাংবাদিক, সাহিত্যিক, গীতিকার, গায়ক ও ঔপন্যাসিক । তিনি ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয়া পতœী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান। কাজী নজরুলের ডাক নাম ছিলো দুঃখু মিঞা। শৈশবে তিনি পিতৃহারা হয়েছিলেন। দুঃখ, দারিদ্র্য ও অযতেœ মানুষ হলেও তাঁর প্রাণশক্তি ও প্রতিভা ছিলো অসাধারণ। সমস্ত দুঃখ, দারিদ্র্যকে অতিক্রম করে তিনি তাঁর প্রতিভার বিকাশ সাধন করতে পেরেছিলেন।দেশপ্রেমিক কবি নজরুল শোষকের শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে তাঁর কলমকে অস্ত্র ও বুলেট হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অন্যায়, অবিচার, অসাম্য ও অসত্যের বিরুদ্ধে তিনি লেখনির মাধ্যমে শুরু করলেন প্রচ- বিদ্রোহ। নজরুলের নামকরা বহু বিখ্যাত কবিতা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ‘বিদ্রোহী’, ‘ধুমকেতু’,‘প্রয়োল্লাস’,‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রভৃতি কবিতা সমকালীন পাঠকদের উদ্বুদ্ধ করেছিলো। ব্রিটিশ সরকার এ ধরনের কবিতাকে খুব ভয়ের চোখে দেখতো। ‘ধুমকেতু’তে তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে রুষ্ট ব্রিটিশ সরকার কবিকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কারারুদ্ধ করে। কারাগারে গিয়েও নজরুল ইসলাম তাঁর দেশপ্রেম বিসর্জন দেননি। সেখাইে তিনি তাঁর ‘রাজবন্দীর জবানন্দী’ লেখেন। কবিকে আলীপুর জেল থেকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করে অসম্মান ও অত্যাচার করা হয়। জেলে বসেই কবি ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’, ‘এই শিকল-পরা ছল’, ইত্যাতি কবিতা লেখেন। এক পর্যায়ে তিনি অনশন করেন। সারাদেশের লোক কবির জীবন সংশয়ে ভয়ে অস্থির হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথও তাঁকে অনশন ধর্মঘট পরিত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করেন। দেশের মানুষের অনুভূতি ও বাংলা সাহিত্যের প্রতি নজরুলের ভূমিকার কথা স্মরণ করে উদ্বিগ্ন কবিগুরু তাঁর টেলিগ্রাফ বার্তায় বলেন: Ô Give up hunger strike, our literature claims you.(২)আমরা জানি, কাজী নজরুল ৭৬ বছর বেঁচে ছিলেন; কিন্তু ৩৪ বছর ১ মাস ২০ দিন নির্বাক ছিলেন। যদি এই দীর্ঘ সময় তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারতেন তাহলে তিনি বাংলা সাহিত্যকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতেন।কাজী নজরুল ইসলামের লেখা সর্বশেষ কবিতা গ্রন্থের নাম ‘নতুন চাঁদ’। সুস্থাবস্থায় প্রকাশিত সর্বশেষ কাব্যের নাম ‘নির্ঝর’। ১৯৩৯ সালের জানুয়ারিতে এটি প্রকাশিত হয়। কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কবিতার সংখ্যা ৯০০।‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য নজরুলকে এক বছর কারাবন্দি হয়ে থাকতে হয়েছিল। ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’র ১২তম সংখ্যায় ওই কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার আলবার্ট হলে কবিকে সর্বভারতীয় বাঙালিদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, ব্যারিস্টার ওয়াজেদ আলী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।নজরুলের প্রথম যে বইটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, তার নাম ‘যুগবাণী’। ১৯২২ সালে বাংলা সরকার ফৌজদারি বিধির ৯৯-এ ধারায় বইটি বাজেয়াপ্ত করে। বাংলা সরকারের গেজেট বিজ্ঞপ্তির তারিখ : ২৩ নভেম্বর ১৯২২ এবং নম্বর-১৬৬৬১পি। সেন্ট্রাল প্রভিন্স ও বর্মা সরকার যুগপৎ গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যুগবাণী নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় নজরুলের দুটি কবিতার বই ‘বিষের বাঁশি’ ও ‘ভাঙার গান’। বিষের বাঁশি ও ভাঙার গান বই দুটি বাজেয়াপ্ত করা হয় ১৯২৪ সালে, ফৌজদারি বিধির ৯৯-এ ধারা অনুসারে। ১৯২৪ সালের ২২ অক্টোবর গেজেট ঘোষণায় (নং-১০৭২পি) ‘বিষের বাঁশি’ নিষিদ্ধ হয়। তবে পরাধীন ভারতেই বিষের বাঁশি থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ‘ভাঙার গান’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ১৯২৪ সালের ১১ নভেম্বর।এখনও লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে অনেকগুলো নিষিদ্ধ বইয়ের মধ্যে নজরুল ইসলামের ৪টি বই রয়েছে। বইগুলো হচ্ছে- ভাঙার গান, বিশেষ বাঁশি, যুগবাণী, চন্দ্রবিন্দু। ‘প্রলয় শিখা’ বাজেয়াপ্ত হয় ১৯৩১ সালে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি বের হয় ১৯৩০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর (নং-১৩০৮৭পি) ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১২৪-এ, ১৫৩-এ ধারানুসারে বইটি নিষিদ্ধ হয়। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় ১৯৪৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গেজেট বিজ্ঞপ্তির (নং-৮৫পিআর) মাধ্যমে। রাজদ্রোহিতার অভিযোগে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কবির ছয় মাসের জেল ঘোষণা করেন এবং কবিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তখন নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল দায়ের করা হয়। ইতিমধ্যে ‘গান্ধী-আরাউইন প্যাক্ট’ সম্পাদিত হয়। এই চুক্তির শর্তানুযায়ী অন্যদের সাথে নজরুলও মুক্তি পেয়ে যান। কিন্তু ‘প্রলয় শিখা’ বাজেয়াপ্ত থেকে যায়। ১৯৩১ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৯৯-এ ধারানুসারে ‘চন্দ্রবিন্দু’ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। গেজেট বিজ্ঞপ্তি নং-১৭৬২৫, ১৪ অক্টোবর ১৯৩১। ইংরেজ আমলেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়, অর্থাৎ ৩০.১১.১৯৪৫ সালে গেজেট ঘোষণায় নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। নজরুলের আর বই নিষেধের সুপারিশ থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ হয়নি। যেমন- অগ্নিবীণা, সঞ্চিতা, ফণিমনসা, সর্বহারা, রুদ্রমঙ্গল- এ বইগুলো নিষেধের সুপারিশ থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ হয়নি।(৩) ১৯২৮ সালের মার্চ মাসে আর্থিক শর্তে নজরুর গ্রামোফোন কোম্পানি ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’-এর সাথে যুক্ত হন। এইচএমভি-তে নজরুল সংগীতের প্রথম রেকর্ড করা শিল্পীর নাম শ্রী হরেন্দ্রনাথ দত্ত। রেকর্ড করা নজরুল ইসলামের প্রথম গানটি হলো ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াতি খেলছ জুয়া’। আমরা কি জানি, নজরুল ইসলামের প্রথম রেকর্ড করা ইসলামি গান কোনটি? কোন শিল্পী গানটি রেকর্ড করেন এবং রেকর্ড নং কত? এইচএমভি থেকে রেকর্ড করা নজরুল ইসলামের প্রথম ইসলামি গানটি হলো- ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’ : শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদ গানটি রেকর্ড করেন। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ সাল। ৮টি গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত প্রায় ২ হাজার গানের রেকর্ড বেরিয়েছিল। তৎকালীন বাংলার ২৮টি জেলায় তার গান বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। কাজী নজরুল ইসলামের রেকর্ড করা প্রথম শ্যামাসংগীতটি হলো- ‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়’। শিল্পী মৃণাল কান্তি ঘোষের গানটি ১৯৩২ সালের জুন মাসে রেকর্ড করা হয়েছিল।কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম রেকর্ডকৃত নাটকটি ছিল ‘ঈদুল ফেতর’। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের শেষ রেকর্ড করা গান দুটি হলো : ১. চীন ও ভারত মিলেছে; ২. সংঘশরণ তীর্থযাত্রা পথে। গান দুটি গেয়েছিলেন শিল্পী সত্য চৌধুরী ও জগন্ময় মিত্র।১৯৬৪ সালে ‘নজরুল-গীতি’ এই লেভেলের শব্দবন্ধ চিহ্নিত করে নজরুলের গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে কলম্বিয়া এবং এইচএমভি কোম্পানি। কলম্বিয়ার শিল্পী ছিলেন কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় এবং এইচএমভি’র শিল্পী ছিলেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে এরা কেউই নজরুল-গীতির শিল্পী ছিলেন না।১৯২৮ সালে এইচএমভি কোম্পানি ইলেকট্রিক রেকর্ডিং ব্যবস্থা চালু করে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার উদ্বোধন করেন। কবি নজরুল ইসলাম নিজ কণ্ঠে দুটি কবিতা আবৃত্তির রেকর্ড করেন। কবিতা দুটি হলো : ‘নারী’ এবং ‘রবিহারা’। সেপ্টেম্বর ১৯৪১। কবি নজরুল ইসলাম তার নিজ কণ্ঠে ৬টি গান রেকর্ড করেছিলেন। গানগুলো হলো-১. দিতে এনে ফুল হে প্রিয় : ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩২২. পাষাণে ভাঙালে ঘুম : ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩২৩. কেন আসিলে ভালবাসিলে : এপ্রিল ১৯৩৩৪. দাঁড়ালে দুয়ারে মোর : এপ্রিল ১৯৩৩৫. ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে; কবির সাথে কণ্ঠ দিয়েছিলেন ইলা মিত্র এবং সুনীল ঘোষ।৬. একি সুরে তুমি গান শোনালে : রেকর্ড নং পাওয়া যায়নি।১৯২৯ সালের ২২ নভেম্বর, সন্ধ্যায় কাজী নজরুল ইসলাম বেতারে প্রথম আবৃত্তির অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা নাজিমুদ্দিন সড়কে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছিল। এবং কাজী নজরুলই ঢাকা বেতার কেন্দ্রের নামকরণ করেছিলেন ‘ঢাকা ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র’। এই কেন্দ্রের উদ্বোধনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাণী পাঠিয়েছিলেন। পরের বছর কবি নজরুল ইসলাম স্বয়ং আসেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। আকাশবাণীর গীতি-আলেখ্যর জন্য লিখলেন গান-“আকাশে আজ ছড়িয়ে দিলাম তোমার গানের ফুল তোমার গানের মালা গো কুড়িয়ে তুমি নিও।”১৯৩৩ (মতান্তরে ১৯৩৬) ৮ জুন ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ করা হয়। রবীন্দ্র প্রয়াণ দিনে কাজী নজরুল ইসলামের সেই দিনের স্বরচিত কবিতা ‘রবিহারা’ কবিকণ্ঠে বেতারে প্রচারিত হয়। একই দিনে নজরুল রচিত গান ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’ বেতারে প্রচারিত হয়। তাতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন স্বয়ং নজরুল ইসলাম এবং সুগায়িকা ইলা ঘোষ। ১৯৩৪ সালে কলকাতায় বিবেকানন্দ রোডে গ্রামোফোন রেকর্ডের দোকান দেন। দোকানের নাম দিয়েছিলেন ‘কলগীতি’। দিনের পর দিন বাকিতে রেকর্ড দিয়ে অবশেষে এই ব্যবসা লাটে ওঠে।(৪)বাংলা ভাষায় রেকর্ড করা প্রথম ইসলামি গানটির কথা আমরা জেনে থাকব- “ইসলামের ওই সওদা ল’য়ে/ এল নবীন সওদাগর।” শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ ১৯৩২ সালে গানটি রেকর্ড করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা মাথায় রেখে কাজী নজরুল ইসলাম দুই ধর্মের দুজন শিল্পীকে যে গানটি রেকর্ড করিয়েছিলেন, সেটি হলো- “হিন্দু আর মুসলিম মোরা দুই সহোদর ভাই এক বৃন্তে দুটি কুসুম এক ভারতে ঠাঁই।” শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ এবং শিল্পী মৃণালকান্তি ঘোষ গানটি রেকর্ড করেছিলেন; প্রকাশকাল : ১৯৩৮। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে কবি নজরুল ৩৪ বছর এক মাস ২২ দিন কোনো কথা বলতে পারেননি। ৭৬ বছর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারলে কবির অসংখ্য সৃষ্টি নানা ভাষায় অনূদিত হতো। প্রখ্যাত আমেরিকান কণ্ঠশিল্পী ও কবি জন থর্প ইংরেজি ভাষায় অনূদিত কাজী নজরুল ইসলামের দুটি গান ও একটি কবিতা ক্যাসেট করেন। গান দুটি হলো-১. “চল চল চল ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল” (Left Right Left/By a Drum beat to a heavenly height);২. “বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল” (In Garden plot, o Nightingale, do not/Rock upon his flower stem to-day)আর কবিতাটি হলো ‘বিদ্রোহী’।কাজী নজরুল ইসলাম শ্রমিক-প্রজা স্বরাজ দলের ইস্তেহার তৈরি করেছিলেন। শ্রমিক-প্রজা স্বরাজ দলের মুখপত্রের নাম ‘লাঙল’। লাঙল পত্রিকার প্রধান পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ভারতে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সংগীত ও কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতার বিখ্যাত ‘রেড ফ্ল্যাগ’ গানটির প্রথম অনুবাদকের গৌরব কাজী নজরুল ইসলামের। [১৯২৭ সালের ২১ এপ্রিল : গণবাণী]১৯৩১ সালে ছয় সিলিন্ডারবিশিষ্ট একটি ক্রাইসলার মোটরগাড়ি ক্রয় করেন। গাড়িতে চড়ার শখ কবির বরাবরই ছিল। আর্থিক অবস্থা একটু ভালো হতেই সেই শখ কবি পূরণ করেন। কিন্তু তার এ অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। স্ত্রী প্রমীলা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার চিকিৎসার জন্য গাড়ি এবং পূর্বে ক্রয় করা বালিগঞ্জের জমিটিও বিক্রি করে দিতে হয়।নজরুল বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় প্রতিনিধি রূপে নির্বাচিত হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে বসলেন। পূর্ববঙ্গ থেকে মুসলমান ভোটদাতাদের জন্য সংরক্ষিত এই পদে দাঁড়াবার বিশেষ কোনো যোগ্যতাই নজরুলের ছিল না। যে হাজার হাজার তরুণ-বৃদ্ধ-যুবক পুরুষ-নারী প্রায় প্রতি মাসে প্রতি সপ্তাহে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে, মেদিনীপুর থেকে চট্টগ্রামে, তাকে গরম সমাদরে সংবর্ধনা জানিয়েছেন, তারা কেউই এই নির্বাচনের ভোটার ছিলেন না। সে-কালে এই নির্বাচনে ভোটদানের অধিকার ছিল মুষ্টিমেয় মানুষের, যারা ধনী, প্রতিপত্তিশালী জমিদার, সম্পত্তির মালিক, ব্যবসায়ী অথবা সম্ভ্রান্ত-বংশীয়। সে-কালে সর্বজনীন ভোটাধিকার স্বীকৃত না হওয়ার মুষ্টিমেয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির প্রচারে ভোটারদের কাছে নজরুলের একমাত্র যে পরিচয় তুলে ধরা হচ্ছিল, তা কাফের ধর্মদ্রোহী ও মুসলিম-বিরোধীর। সুতরাং তাদের ভোট পাওয়া নজরুলের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর নির্বাচনে নামতে গেলে যে পরিমাণ অর্থের জোগান চাই, তাও নজরুলের ছিল না। নির্বাচনের প্রয়োজনে তিনি বিধানচন্দ্র রায়ের কাছ থেকে মাত্র শ-তিনেক টাকা পেয়েছিলেন। মুজফফর আহমদ তাকে বাধা দিয়েছিলেন; কিন্তু নজরুল তা উপেক্ষা করেন। নজরুল তার অনুকূলে কোনো ধর্মগুরুর একটি আবেদনও সংগ্রহ করেছিলেন।(৫)বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ১৯৭২ সালের ২৪ মে (১৩৭৯ সনের ১০ জ্যৈষ্ঠ) কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে ভারত থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয়, বাংলাদেশ বিমানে করে। কবিকে সামনে রেখে ঢাকায় নজরুল জন্মজয়ন্তী পালনের জন্য। বাংলাদেশে আসার পর কবির জন্য সরকারি উদ্যোগে পুরনো ২৮নং রোডের ৩৩০/বি ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার বাড়িটি বরাদ্দ করা হয়। সেই সময়ে বাড়িটির নামকরণ করা হয় ‘কবিভবন’। সেখানে কবিকে রাখা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কবির অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর এক বিশেষ সমাবর্তনে কবিকে সম্মানসূচক ডি-লিট উপাদিতে ভূষিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পরে কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।ধানমণ্ডির বাড়িতে কবি কাটিয়েছেন তিন বছর এক মাস ২৯ দিন। কবিভবন থেকে কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় পিজি হাসপাতালের ১১৭নং কেবিনে। পিজি হাসপাতালে কবি মৃত্যু পর্যন্ত, অর্থাৎ ছয় মাস ১১ দিন কাটিয়েছেন।জাতীয় পর্যায়ে ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আয়োজনে কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে লেখা হয়। তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, জাতীয় আর্কাইভ, নজরুল ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির কোথাও নজরুলকে জাতীয় কবি ঘোষণা করা সংক্রান্ত সরকারি কোনো প্রজ্ঞাপন বা অন্য কোনো দলিল পাওয়া যায়নি। নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সংসদে আইন পাস করে এই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।এটা সত্য যে, সরকারি দলিলে বিভিন্ন প্রসঙ্গে নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাকে জাতীয় কবি উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশও প্রণীত হয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য স্বীকৃতি সংরক্ষণের বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়(৬)অন্নদাশঙ্কর রায় ভারতভাগের প্রেক্ষিতে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে লিখেছিলেন-ভুল হয়ে গেছে বিলকুল,আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে,ভাগ হয়নি ক’ নজরুল।এই ভুলটুকু বেঁচে থাক।বাঙালি বলতে একজন আছে,দুর্গতি তাঁর ঘুচে যাক।মূলতঃ কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন জাতীয় জাগরণের পথিকৃৎ-তিনি শুমাত্র একজন কবি বা সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন না। জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে রাজনৈতিকভাবে ছিলেন বরাবরই সোচ্চার। এ জন্য তাঁকে জেল জুলুমসহ নানা নিগ্রহের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি ভারতকে ব্রিটিশ অধীনতা থেকে মুক্ত করার জন্য স্বরাজের পরিবর্তে পরিপূর্ণ স্বাধীনতার আহবান জানিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে ‘ধুমকেত’তে তিনি লিখেছিলেন-‘সর্বপ্রথম ‘ধুমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। ‘স্বরাজ টরাজ বুঝি’ না, কেননা, ও-কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীন থাকবে না। ( নজরুলের প্রবন্ধ সমগ্র: সম্পাদনা মুহম্মদ নীরুল হুদা রশিদুন নবী, ঢাকা। নজরুল ইন্সটিটিউট। ২০১৬ সপ্তম মুদ্রণ, পৃষ্ঠা: ১১১)াধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে তিনি বাঙালির জাগ্রতকরণের তাগিদ অনুভব করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘নবযুগ’-এ ৩ বৈশাখ, ১৩৪৯ বঙ্গাব্দে ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন-‘ বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে-‘বাঙালির বাংলা’-সেদিন তারা অসাধ্যসাধন করবে। সেদিন একা বাঙালিই ভারতকে স্বাধীন করতে পারবে। বাঙালিকে, বাঙালির ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শোনাও-এই পবিত্র বাংলাদেশবাঙালির-আমাদের।দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’তাড়াব আমরা, করি না ভয়যত পরদেশী দস্যু ডাকাত‘রামা’দের ‘গামা’দের।বাংলা বাঙালির হোক। বাংলার জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।( নজরুলের প্রবন্ধ সমগ্র: সম্পাদনা মুহম্মদ নীরুল হুদা রশিদুন নবী, ঢাকা। নজরুল ইন্সটিটিউট। ২০১৬ সপ্তম মুদ্রণ, পৃষ্ঠা: ২৩০)১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে জাতির পক্ষ থেকে দেওয়া সংবর্ধনায় কবিকে জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত করা হয়। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সে সভায় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু তাঁর বক্তব্যে বলেন-‘ নজরুলকে বিদ্রোহী কবি বলা হয় এটা সত্য কথা। তাঁর অন্তরটা যে বিদ্রোহী, তা ষ্পষ্ট বুঝা যায়। আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব, তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব, তখনো তাঁর গান গাইব। (নজরুল জীবনী,রফিকুল ইসলাম, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২০১৫ পৃষ্ঠা: ৪০০-৪০১)।নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর এ অভিপ্রায় পরবর্তী সময়ে বাঙালির লড়াই সংগ্রামকে প্রবলভাবে পরিচালিত করেছিল। আমরা কারাগারে গেছি ‘এই শিকল পরা ছল মোদেরই শিকল পরা ছল’, রাজপথে গেয়েছি ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, প্রতিবাদ সমাবেশে গেয়েছি ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’,ও ‘বিদ্রোহী’সহ অসংখ্য গান-কবিতা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধকালে তাঁর কবিতা ও গান পুরো জাতিকে যুগিয়েছে অনাবিল উদ্দীপনা ও প্রেরণা। তাঁর ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটি হয়ে উঠেছিল বাঙালি জাতির প্রাণের শ্লোগান।[তথ্যসূত্র: সুভাষ সিংহ রায় জানা অজানা নজরুল, দৈনিক সমকাল: ২৫/০৫/২০২০ এবং যারা আলোক দিলো ঢেলে, হরিদাস ঠাকুর]

ব্রেকিং নিউজঃ