| |

ভাষা আন্দোলনে বাঙালি নারী

আপডেটঃ 9:32 pm | February 24, 2021

Ad

আব্দুল কদ্দুছ মাখন : ভাষা আন্দোলনে বাঙালি নারীঃ-বাঙালি জাতির জন্য ভাষা আন্দোলন একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ এই শব্দ দুটি মনে করিয়ে দেয় একটি রক্ত ঝরার ইতিহাস। আর এই রক্ত দানের সঙ্গে মিশে আছে আমাদের মা-বোনের সংগ্রাম ও ত্যাগে র মহিমা। আসলে নারীদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা ছাড়া পৃথিবীর কোনো আন্দোলনই বেগবান হয় না।১৯৫২ সনে রক্ত ও প্রাণ হারানোর সিড়ি বেয়ে সাফল্য লাভ করা ভাষা আন্দোলনে সহযোগিতা ও লড়াই সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এদেশে নারীরা নিজেদের জন্য একটি মর্যাদার স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি, সংগ্রামের সাধারণ ইতিহাসে খুব বেশি গুরুত্ব পায়না।জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রচিত অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন “ফেব্রুয়ারির ৮ই হবে, ১৯৪৮ সাল। করাচিতে পাকিস্তান সংবিধান সভার বৈঠক হচ্ছিল। সেখানে রাষ্ট্রভাষা কি হবে সেই বিষয়ে আলোচনা চলছিল। মুসলিম লীগ নেতারা উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতী। কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবি করলেন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হোক। কিন্তু মুসলিম লীগ সদস্যরা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিস এর প্রতিবাদ করলো এবং দাবি করলো, বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। তমদ্দুন মজলিস একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যার নেতা ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম সাহেব। যা হোক, সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হয়।” ১১ মার্চ ভোরবেলা শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করলে, বঙ্গবন্ধু, শামসুল হক ও অলি আহাদ সহ ৬৯ জনকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়।বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “জেলের যে ওয়ার্ডে আমাদের রাখা হয়েছিল, তার নাম চার নম্বর ওয়ার্ড। তিনতলা দালান। দেয়ালের বাইরে মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল ১০টায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর ৪টায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হতো না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,’ ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই, পুলিশি জুলুম চলবে না’- এ রকম নানা ধরনের স্লোগান। এই সময় শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, ‘হক সাহেব ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না।”পাকিস্তানি শাসকরা সত্যিই বাংলার মাটিতে অন্য ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি।রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জেও যখন একটি আন্দোলন ছড়িয়ে যায় তখন বোঝা যায় এর দুর্বার গতি। বোঝা যায় কতটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে একটি আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনটিও সেই গতির ছিল। নারীরা পুরুষের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল নারী গন পাকিস্তান আর্মি ও পুলিশদের মুখোমুখি হতে একটুও ভয় পায়নি। ভয় পায়নি পুলিশের তাক করা বন্দুকের নলকে।মায়ের ভাষাকে চিরদিনের মত পাবার আকাঙ্ক্ষায় নারীরা সামনের কাতারে থেকে মিটিং-মিছিল করেছে, পুলিশের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙেছে। নারীরাই প্রথম ১৪৪ ধারা ভেঙে এগিয়ে গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীরা আহতদের চিকিৎসা দিয়ে ভাষা আন্দোলনে একাত্ম হয়েছে। আহত ছাত্রদের চিকিৎসার জন্য অন্য ছাত্রীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলেছে। রাতভর ব্যানার পোস্টার লেখার কাজেও নারীরা সহযোদ্ধার ভূমিকা পালন করেছে। পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের নিজেদের কাছে লুকিয়ে রেখেছে। মায়েরা নিজেদের অলঙ্কার ছেলেদের হাতে তুলে দিয়েছে। শুধু মিটিং-মিছিলই আন্দোলন নয়। আন্দেলনে বহুবিধ খরচ থাকে। থাকা খাওয়া চিকিৎসা সহ আরো অনেক কিছু। সন্তানের সেই খরচ জোগাতে মায়েরা তাঁদের শখের গহনাপত্র বিক্রয় করেছেন। ভাষা আন্দোলনে জড়িত হয়ে অনেক নারী স্বামীর সংসার হারিয়েছেন। কেউ কেউ জেল জুলুমও সহ্য করেছেন। নারীদের অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন।১৯৫২ সালের ইতিহাস প্রমাণ দেয়, ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার মূল কাজটিই করেছিলো রওশন আরা বাচ্চু এবং তাঁর সহপাঠী কয়েকজন ছাত্রী। কারণ দশজন করে মিছিল বের হওয়া প্রথম দুটি দলের অনেক ছাত্রই গ্রেপ্তার হয়। পরে ছাত্রীরা তৃতীয় দলে বেরিয়ে ব্যারিকেড ধরে টানাটানি শুরু করে। সেদিন পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলে অনেক ছাত্রী আহত হয়। এদের মধ্যে ছিলেন রওশন আরা বাচ্চুু, বোরখা শামসুন, সারা তৈফুর, সুরাইয়া হাকিম, সুরাইয়া ডলি। মেয়েদের মোট আহতের সংখ্যা ছিল ৮ জন।ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জে নারীদের ভাষা আন্দোলনে একাত্ম হওয়ায় শিক্ষিকা মমতাজ বেগমের লাঞ্ছনার কথা অনেকেরই জানা। উনি কারা নির্যাতনের একপর্যায়ে সরকারের চাপে স্বামীর কাছ থেকে তালাকপ্রাপ্ত হন। মমতাজ বেগম ভাষার প্রশ্নে আপোষ করেননি, আপোষ করলে চাকুরী স্বামী ফেরত পেতেন। মমতাজ বেগমের ছাত্রী ইলা বকশী, বেনু ধর, শবানীর মতো কিশোরীদেরও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিলো।সিলেট জেলার কুলাউড়ার মেয়ে সালেহা বেগম ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী থাকাকালীন সময়ে ভাষা শহীদদের স্মরণে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলন করেন। আর এই অপরাধে তাঁকে জেলার ডিসি তিন বছরের জন্য স্কুল থেকে বহিষ্কার করে। পরে উনি আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। ফরিদপুর জেলার সুফিয়া আহম্মদ, লালমনিরহাট জেলার ড. শাফিয়া খাতুন সহ চট্টগ্রাম এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের একই রকম চিত্র পাওয়া যায়।ইতিহাসে তেজস্বী নারী হামিদা রহমানের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হামিদা রহমানের নামে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। হামিদা বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল বের করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ধ্বনিতে চারিদিক মুখরিত করেছিলেন। উনি ছেলেদের পোশাক পরে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে যশোর কলেজের বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। পুলিশের ওয়ারেন্টের যন্ত্রণায় এক সময় তিনি আত্মগোপন করতেও বাধ্য হন। এছাড়াও পিরোজপুরের মেয়ে ডা. কাজী খালেদা খাতুন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় কামরুন্নেসা স্কুলের ছাত্রী ছিলেন।জানা যায় যে, স্কুল ছাত্রছাত্রীদের সমাবেশে ২১-এ ফেব্রুয়ারি আমতলার সভায় তিনি বক্তব্য রেখে ছিলেন এবং পরে মিছিলে যোগ দেন। জুলেখা হক, গুলে ফেরদৌস, দৌলতুন্নেসা, ইডেনের ছাত্রী চেমন আরা, বেগম আনোয়ারা খাতুন, হালিমা খাতুন প্রমুখের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং সক্রিয় ভূমিকা পালনের প্রমান পাওয়া যায়। আমাদের বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে লড়াই সংগ্রামের সঙ্গী ছিলেন বহু জানা-অজানা নারী। তাঁদের মধ্যে কিছু নাম খুঁজে পেলেও অনেকেই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলনে অখণ্ড বাংলা ভাষা ভাষী নারী পুরুষ সহ সর্বস্তরের জনতা উত্তাল হয়েছিলো বলেই আমরা বিজয় অর্জন করতে পেরেছি।ধর্মীয় বাধা, সামাজিক বাধা, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় বাধা অতিক্রম করে নারীদের এগিয়ে আসা কতটা সাহসের এবং কতটা দুঃসাধ্য ছিল তা আমরা এই সময়ে এসেও উপলব্ধি করতে পারি। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে একমাত্র বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি জাতি। এই গৌরব একমাত্র বাঙালির। আর এই আলোকোজ্জ্বল গৌবের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বাঙালি নারী। এই সত্যকে অবহেলা বা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ যাত্রায় নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন বাজি রেখে যেসব মহৎ প্রাণ নারী, পুরুষ ভুমিকা রেখেছেন , ইতিহাসের যুগ সন্ধিক্ষণে আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তাঁদের স্মরণ করছি, করবো। আগামী প্রজন্মের নিকটে আহবান ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ কারী নারী-পুরুষের ত্যাগের স্বীকৃত দিয়ে সকলকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করবেন।

ব্রেকিং নিউজঃ