| |

নারীরা অন্ধকারে আলো ছড়ায়, পথ দেখায়, আলোকিত করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম

আপডেটঃ 4:27 pm | March 08, 2016

Ad

আলোকিত ময়মনসিংহ : আন্তর্জাতিক নারী দিবস অন্তত একটা দিন গোটা বিশ্ব আলাদা করে মনে করে নারীরাই এই জগতের শক্তি আর প্রেরণার উৎস। নারীরাও অন্ধকারে আলো ছড়ায়, পথ দেখায়, আলোকিত করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। যে নারী গর্ভধারিণী, যে নারী মায়াময়, যে নারীর জন্য যুগ যুগ ধরে বহমান আমাদের এই মানব সভ্যতা। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে নারীরা স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
যার অধিকাংশ সম্ভব হয়েছে যাদের লেখনির মাধ্যমে। আঠারো শতকের মধ্যভাগে বাংলা সাহিত্যে নারী লেখিকাদের আবির্ভাব ঘটে। সহহিত্যের মাধ্যমে মুক্তির আলো ছড়ানো নারীরা অধিকার প্রতিষ্ঠায় পালন করেছেন অনস্বীকার্য ভূমিকা। আন্দোলনের পথিকৃৎ নারীদের যুগ যুগ ধরে মুক্তিকামী মানুষ স্মরণ করে আসছে।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাঙালি নারী হিসেবে বাংলা সাহিত্য সৃজনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন নওয়াব ফয়জুন্নেসা। তিনি ১৮৫৮ সালে ত্রিপুরা জেলার পশ্চিম গাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মুহম্মদ গাজী চৌধুরীর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। ফয়জুন্নেসার দাম্পত্য জীবন সুখময় ছিলনা। বিয়েবিচ্ছেদ, নানা ব্যাধি ও অত্বর্জীবনের অশান্তিই তার সাহিত্য সাধনার অন্যতম অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ফয়জুন্নেসার একটি মাত্র সাহিত্য কীর্তি ‘রূপজালাল’। তার এ আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি।
বেগম রোকেয়া
১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে সম্পূর্ণ প্রতিকূল এক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেন এই লেখিকা। নিজের চেষ্টা ও মনোবল সম্বল করে তিনি ইংরেজি, বাংলা ও উর্দু ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। সম্ভ্রান্ত ঘরে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্নেহশীল ও মুক্ত মনের অধিকারী স্বামীর সংস্পর্শে এসে তিনি লেখাপড়া করার ও চিত্ত বিকাশের সুযোগ পান। কিন্তু স্বামীর সান্নিধ্য সুখ তার বেশিদিন ভোগ করার সৌভাগ্য হয়নি। বিয়ের মাত্র দশ বছর পরে তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের প্রতি সব আকর্ষণ হারিয়ে তিনি সমাজ সংস্কার ও সমাজ গঠনমূলক কাজে নিজেকে উজাড় করে দেন। বেগম রোকেয়া রচিত গ্রন্থ তার চিন্তা ও কর্মাদর্শের বাণীরূপ। মতিচূর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, সুলতানার স্বপ্ন প্রভৃতি লেখিকার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ‘পদ্মরাগ’ বেগম রোকেয়া রচিত একটি উপন্যাস। সম্ভবত ‘পদ্মরাগ’ লেখিকার সর্বশেষ রচনা। বিবাহিত জীবন তথা সংসার ধর্ম পালনই যে নারীজীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়, সে বক্তব্যই উচ্ছ্বসিত হয়েছে তার স্পষ্ট কণ্ঠে।
মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা
১৯০৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাবনা শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম খান বাহাদুর মোহাম্মদ সোলায়মান সিদ্দিক। এক সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করায় তার কাব্য প্রতিভা অতি শৈশবে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াকালে তিনি প্রথম কবিতা লেখেন। মাত্র নয় বছর বয়সে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘আল ইসলাম’ পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তিরিশ বছর ধরে তার কবিতা সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকায় ছাপা হযেছে। তার রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পসারিণী’ ১৯৩৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষায় মুসলমান মহিলা কবির এটাই প্রথম প্রকাশিত আধুনিক কবিতার বই। কবির অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ মন ও মৃত্তিকা, অরণ্যের সুর। ছোটদের জন্য তার রচিত কাব্যগ্রন্থ রাঙা ঘুড়ি, রোদ বৃষ্টি ও শ্রাবনী। অসাধারণ কাব্যপ্রতিভার জন্য এ কবিকে ১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমী এবং ১৯৭৭ সালে একুশের পদকে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৭ সালের ২ মে মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা ইন্তেকাল করেন।
শামসুন নাহার মাহমুদ
১৯০৮ সালে নোয়াখালী জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে এই লেখিকার জন্ম হয়। বেগম মাহমুদের শিক্ষাজীবন অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। প্রবেশিকা পরীক্ষায় তিনি তিন বিষয়ে ডিস্টিংশন নিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। প্রবেশিকা পরীক্ষার পর তিনি ডাক্তার ওয়াহিদুদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। বেগম মাহমুদ ১৯৩২ সালে বিএ এবং ১৯৪২ সালে এম এ পাস করেন। তিনিই বাংলাদেশের মুসলিম মেয়েদের মধ্যে প্রথম গ্র্যাজুয়েট। শৈশবেই শামসুন নাহারের সাহিত্য প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত তৎকালীন কিশোর পত্র ‘আঙ্গুর’-এ তার প্রথম রচনা একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। বেগম মাহমুদ রচনা করেছেন রাকেয়া জীবনী, বেগম মহল, শিশুর শিক্ষা, আমার দেখা তুরস্ক ও সর্বশেষ রচনা নজরুলকে যেমন দেখেছি। ১৯৩৭ সালে লেখিকার শ্রেষ্ঠ রচনা ‘রোকেয়া জীবনী’ প্রকাশিত হলে জীবনীকার ও প্রাবন্ধিক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। শামসুর নাহার মাহমুদ ১৯৬৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
বেগম সুফিয়া কামাল
বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট মহিলা কবি বেগম সুফিয়া কামাল। সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালে বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদ পরগণায় মাতামহ সৈয়দ মুয়াজ্জম হোসেন চৌধুরীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। সুফিয়া কামাল স্কুল কলেজে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাননি। এগারো বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। তবে স্বামীর সংস্পর্শে এসে তিনি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার সুযোগ পান। তার কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, উদাত্ত পূরবী। এছাড়া তিনি গল্প, ভ্রমণ কাহিনী, প্রবন্ধ ও স্মৃতি কথাও লিখেছেন। কামিনী রায়ের পর বাংলা সাহিত্যে অনেক দিন পর্যন্ত বিশিষ্ট কোনো নারী কণ্ঠস্বর শোনা যায়নি। সুফিয়া কামালের কবিতায় সেই কণ্ঠস্বর যেন আবার নতুন করে বাংলা ভাষায় উচ্চারিত হলো। এই নন্দিত মুসলিম নারী ‘কবি ঢাকায় ১৯৯৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
সেলিনা হোসেন
১৯৪৭ সালের ১৪ জুন রাজশাহী শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একই সঙ্গে কথাসাহিত্যিক, গবেষক এবং প্রাবন্ধিক। তার লেখার জগৎ বাংলাদেশের মানুষ, তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। জীবনের গভীর উপলব্ধির প্রকাশকে তিনি শুধু কথাসাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, শাণিত ও শক্তিশালী গদ্যের নির্মাণে প্রবন্ধের আকারেও উপস্থাপন করেছেন। বেশ কয়েকটি উপন্যাসে তিনি বাংলার লোক-পুরাণের উজ্জ্বল চরিত্রগুলোকে নতুনভাবে এনেছেন। সেলিনা হোসেনের পৈতৃক নিবাস বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার হাজীরপাড়া গ্রামে। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমীর গবেষণা সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এর আগে বিভিন্ন পত্রিকায় উপ-সম্পাদকীয়তে নিয়মিত লিখতেন। বিশ বছরেরও বেশি সময় ‘ধান শালিকের দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমীর প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ২০০৪ সালের ১৪ জুন চাকরি থেকে অবসর নেন।

ব্রেকিং নিউজঃ