| |

‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন আইন’ কথাতেই সীমাবদ্ধ

আপডেটঃ 9:24 pm | March 08, 2016

Ad

ভিক্ষাবৃত্তিসব থেকে নিকৃষ্ট বৃত্তি হিসেবে বিবেচিত এটিআয়ের কোনো বিকল্প পথ নেই এমন সহায়-সম্বলহীন মানুষগুলো অনেকটা বাধ্য হয়ে সাধারণত এ পথ বেছে নেন

তবে রাজধানী ঢাকার চিত্র এর সম্পূর্ণ ভিন্নভিক্ষাবৃত্তি জনবহুল এই শহরটির কিছু অসাধু মানুষের একটি রমরমা ব্যবসাভিক্ষুকদের আয় থেকে প্রতিদিন কোটি টাকার উপরে নিয়ে যায় এ সংঘবদ্ধ চক্র

সংঘবদ্ধ এই চক্র নিয়ে দীর্ঘ দুই মাস অনুসন্ধান করেছেন দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদক সাঈদ শিপনঅনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্যপাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে তা তুলে ধরা হলো

রাজধানীর ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমনকি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও ভিক্ষুকমুক্ত নগরী গড়ার কথা বলা হয়। তবে বাস্তবতা হলো― রাজধানীকে ভিক্ষুকমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে আইন থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ দেখা যায়নি।

ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন, ২০১১তে বলা হয়েছে, যে নিজে বা কারও প্ররোচনায় ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্ত, সে ভবঘুরে হিসেবে বিবেচিত হবে। এ আইনে ভবঘুরেদের আটক করার বিধান রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে আইনের তৃতীয় অধ্যায়ের ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিম্নে নন এমন কর্মকর্তা অথবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা, কোনো ব্যক্তিকে ভবঘুরে বলে গণ্য করার যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে মর্মে নিশ্চিত হলে, তিনি উক্ত ব্যক্তিকে যে কোনো স্থান থেকে যে কোনো সময় আটক করতে পারবেন।’

আইনে আরও বলা হয়েছে, ভবঘুরেকে আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করতে হবে। আর আটককৃত ব্যক্তি ভবঘুরে হলে ম্যাজিস্ট্রেট যেকোনো আশ্রয়কেন্দ্রে কমপক্ষে ২ বছর তাকে আটক রাখার জন্য অভ্যর্থনা বা আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেবেন।

এদিকে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ হিসেবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২০১০ সালে ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ শীর্ষক কর্মসূচি হাতে নেয়।

এরপর ২০১০-১১ অর্থবছরে কর্মসূচি খাতে ৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৭ কোটি টাকা এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তবে মোটা অঙ্কের টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কর্মসূচির আওতায় খরচ হয়েছে এক কোটি টাকারও কম। জরিপ, আসবাব কেনা এবং ময়মনসিংহ ও জামালপুরে কিছু কার্যক্রম পরিচালনায় এ টাকা খরচ হয়। আর গত দুই অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় তেমন কোনো কাজ হয়নি। ফলে কমেছে বরাদ্দের পরিমাণও। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে ২০১৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বলেন, দেশে কোনো ভিক্ষুক নেই বলে বাজেটে ভিক্ষুক পুনর্বাসনের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখতে হয়নি। শহরের রাস্তাঘাটে যে ভিক্ষুকদের দেখা যায়, তারা চরিত্রগতভাবে ভিক্ষুক। এদের রাজবাড়ি বানিয়ে দিলেও ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়বে না।

অবশ্য অর্থমন্ত্রী ওই বক্তব্যের কোনো বাস্তবতা আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ কর্মসূচির আওতায় ২০১১ সালে ঢাকা শহরে ১০টি বেসরকারি সংগঠনের সহায়তায় ভিক্ষুক জরিপে ১০ হাজার ভিক্ষুকের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে ডেটাবেজ তৈরি করা হয়। তবে কর্মসূচির আওতায় কাগজে-কলমে ময়মনসিংহ ও জামালপুরে মাত্র ৬৬ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

এর মধ্যে কর্মসূচির আওতায় ১২ জনকে ১২টি রিকশা, ১৭ জনকে ১৭টি ভ্যান ও ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য পাঁচ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়। এ ভিক্ষুকদের সবাই ময়মনসিংহ জেলার। এর পাশাপাশি জেলাটির আরও ৮ জন ভিক্ষুককে পাঁচ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়।

তবে এই ৩৭ জন ভিক্ষুকের মধ্যে ৩০ জন বর্তমানে কোথায় আছে? কী করছে? তার কোনো তথ্য নেই সমাজসেবা অধিদফতরে। ধারণা করা হচ্ছে, এরা সবাই রিকশা ও ভ্যান বিক্রি করে আবারও ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে গেছেন।

এ ক্ষেত্রে ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন, ২০১১ প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। এই আইনে বলা হয়েছে, যদি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কেউ পালায় তবে সে কমপক্ষে ৩ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। আইনের চতুর্থ অধ্যায়ের ২২(১)(খ) ধারায় এ বিধান রাখা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি জাতীয় সমাজসেবা দিবস ও সমাজসেবা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি ভিক্ষুক ও ছিন্নমূল মানুষদের সরকারের তরফ থেকে বিনা খরচে পুনর্বাসন করার কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনার পর ২ মাস চলে গেলেও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি ঢাকা শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত করার লক্ষ্যে গ্রহণ করা কর্মসূচিরও কোনো কার্যক্রম নেই। বর্তমানে এ কর্মসূচির সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত হয়ে আছে।

সমাজসেবা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ দুই অর্থবছরে কর্মসূচির আওতায় সরকার ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫০ লাখ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে এই কোটি টাকা থেকে এক টাকাও ছাড় হয়নি। এমনকি কর্মসূচি বাস্তবায়নের অধিদফতরে কোনো জনবলও নেই। অন্য ডেস্ক থেকে সাময়িকভাবে এই কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত দায়িত্ত্ব পালন করছেন একজন সমাজসেবা কর্মকর্তা।

এ ছাড়া জরিপ করাদের মধ্য থেকে পাইলট পর্যায়ে ২ হাজার ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। পাইলট পর্যায়ে ১ হাজার জনকে ময়মনসিংহ জেলায় এবং বরিশাল ও জামালপুর জেলায় ৫শ’ জন করে পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল― ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিতদের পুনর্বাসন ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আয়ের কাছে সম্পৃক্ত করা। কর্মসূচির আওতায় কিছু কর্মপরিকল্পনা হাতে নিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ৮টি পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করে প্রতিটিতে ২৫০ জন করে মোট দুই হাজার জন ভিক্ষুকের অস্থায়ী পুনর্বাসন করার কথা থাকলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

এদিকে চলতি অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ‘যার জমি আছে ঘর নাই তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ উপখাতের আওতায় নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ভিক্ষুকদের জন্য ১৫টি ঘর তৈরির জন্য ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের সহায়তায় ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করতে এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে আটটি উপজেলার মধ্যে কিশোরগঞ্জ উপজেলায় কাজের আওতায় ১০টি ঘর তৈরি শেষ হয়েছে। ৫০টি ঘর তৈরির কাজ চলছে।

সার্বিক বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করা হলে সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালক (কার্যক্রম) আবু মো. ইউসুফ দ্য রিপোর্টকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর আমরা ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের কার্যক্রম জোরদার করেছি। এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ চলছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর কোনো ভিক্ষুককে ধরে নিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখনো কোনো ভিক্ষুককে ধরা হয়নি। পুনর্বাসন-সংক্রান্ত কাজ শেষ হলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ৩৭ জন ভিক্ষুককে রিকশা, ভ্যান ও ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য পাঁচ হাজার করে টাকা দেওয়া বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই কর্মসূচির আওতায় আগে একজন প্রজেক্ট ডিরেক্টর ছিলেন। এখন তিনি নেই। আমরা কর্মসূচির আওতায় নতুন প্রজেক্ট ডিরেক্টর নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে প্রজেক্ট ডিরেক্টর নিয়োগের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের।

ব্রেকিং নিউজঃ