| |

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও মিলেনি ফুলবাড়ীয়ার ৩ বীরাঙ্গনার রাষ্ট্রিয় স্বৃকীতি তালিকা ভুক্তির নামে মোটা টাকা দাবীর অভিযোগ বীরাঙ্গনা পরিবারের

আপডেটঃ 2:54 am | March 26, 2016

Ad

আবুল কালাম : স্বাধীনতার ৪৫ বছর কেটে গেছে। আধাঁর কাটেনী ফুলবাড়ীয়ার ৩ বীরাঙ্গনা পরিবারের। চোখে মুখে এখনও তাদের আতংকের ছাঁপ। ভিক্ষার টাকায় চলে বীরাঙ্গনার সংসার। তালিকা ভুক্তির নামে মোটা অংকের টাকা দাবী করায় বারংবার স্বপ্ন হয়েছে ধুলিসাৎ।
শহীদ জননী মালেকা ঃ
ফুলবাড়ীয়া উপজেলার বাকতা ইউনিয়নের কৈয়ারচালা গ্রামের কৃষক আক্কাছ আলীর স্ত্রী মালেকা খাতুন। স্বামী সংসার সন্তান  নিয়ে সুখেই চলছিল তার জীবন সংসার। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে জুন মাসের দিকে ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের গাড়ী বহর থেকে  লোকালয়ে এসে নিরীহ গ্রামবাসীর উপর অত্যাচার চালায় পাকবাহিনী। মালেকাকে বাড়ীতে একা পেয়ে পাশবিক নির্যাতন চালায় পাকবাহিনী। পাকবাহিনীর বর্বরতার শিকার মালেকা ১০/১৫ দিন প্রচন্ড রক্তক্ষরনে শহীদ হন। শহীদ জননী মালেকার ৩ পুত্র মোসলেম উদ্দিন, ইদ্রিছ আলী ও ওমর আলী পরের বাড়ীতে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালায়। মায়ের জন্য এখনো চোখের জ্বল ফেলে মালেকার কন্যা মল্লিকা ও ৩ পুত্র।
বীরাঙ্গনা জয়ন্তী বালা ঃ
ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের জয়ন্তী বালা দেবী। জয় দিয়েই শুরু হয়ে ছিল তার জীবন। কিন্তু বেশি দিন টেকেনী তার জয়। জয়ের স্থান দখল করে রিক্ত নিঃস্ব সমাজে নিস্পেষিত হয়েছে তিনি। স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রথমে নিয়েছে সতীত্ব। পরে নিয়েছে স্বামীকে। এর পর হারিয়েছে কার কলিজার টুকরা ৮ বছরের ছোট ভাইকে। এত কিছু হারানো জয়ন্তীর কপালে জোটেনী রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি। পরের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে ভাইয়ের সংসারের একাকীত্ব জীবন নিয়ে আধ মরার মত বেঁচে আছে জয়ন্তী।
উপজেলার ভাবানীপুর গ্রামের রমেস চন্দ্র দেবনাথের বড় মেয়ে জয়ন্তী বালা দেবীর সাথে ভালুকা উপজেলার গোয়ারী গ্রামের উমেস চন্দ্র দেবনাথের পুত্র নিতাই চন্দ্র দেবনাথের বিয়ে হয় স্বাধীনতার ৪ বছর আগে। নতুন সংসারে জয়ন্তীর যখন জয়জয়কার ঠিক সে সময় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম দিকে তার শ্বশুড়বাড়ীসহ আশেপাশের বাড়ীতে পাকহানাদার ও এদেশীয় দোসরা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। স্বামীর বাড়ীতে পাকবাহিনীর দোসরদের হাতে জয়ন্তী ধর্ষিতা হয়। এ খবর জানাজানি হলে জয়ন্তীর শ্বশুড় জয়ন্তীকে তার পিত্রালয়ে রেখে যান।
তার স্বামী নিতাই চন্দ্র দেবনাথ যোগ দেন মুক্তিবাহিনীতে। ক‘দিন পরেই তার স্বামী ভালুকার বাওউল্লাবাজু যুদ্ধে শহীদ হয়। স্বামী শহীদ হওয়ার খবর শুনে শ্বশুড়বাড়ীতে গিয়ে স্বামীর লাশ দেখে বাড়ীতে চলে আসে।
বিজয়ের ক‘মাস আগে তাদের বাড়ীতে আগুন দিয়ে লুটপাট অগ্নি সংযোগ করে দেশীয় রাজাকাররা। সে সময় তৃতীয় শ্রেনীতে পড়া ৮ বছরে ছোট ভাই খোকন দেবনাথ  রাজাকারের বেয়নেটের আঘাতে মারাতœক ভাবে আহত হয়। বুকে আঘাত করায় দীর্ঘ ৪ মাস মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে।
স্বাধীনদেশে উড়ে লাল সবুজের পতাকা। সব হারিয়ে জয়ন্তীবালা দেবী ভাই কানাইলাল দেবনাথের ঘরে মাথা গুঁজার ঠাঁই নেয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে এক পত্রে জয়ন্তীর অসহায় পরিবারকে ২ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর সে পত্র আখড়ে ধরে রাখা নারীর সন্ধান পান উপজেলা আওয়ামীলীগের তথ্য ও গবেষনা বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট ইমদাদুল হক সেলিম। তার সহায়তায় সমাজকল্যান মন্ত্রনালয় একটি বিধবা ভাতার কার্ড পান তিনি। এর পর পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা জয়ন্তী বেরিয়ে আসে মিডিয়ায়।
স্বীনতার যুদ্ধের ৪৫ বছর কেটে গেছে। কিন্তু এ বীরাঙ্গনার কপালে জুটেনী কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তিনি চান জীবনের শেষ বেলায় যেন তিনি পান রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি, তবেই উনার সব হারানো জীবন সার্থক হবে।
একাকীত্ব জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা বীরাঙ্গনা জয়ন্তীবালা দেবী জানান, যখন তার বিয়ে হয় তখন তার বয়স ছিল ১৩/১৪ বছর। সে সময়কার স্বপ্ন এখনকার স্বপ্নের মধ্যে কত তফাত। আমি ইচ্ছে করলেই তো আর সব ফিরে পাব না। তার ৮ বছরের ছোট ভাই হারানোর ব্যথা এখনও বড় কষ্ট দেয়। তার শান্তনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাইসহ সব হারানো ব্যথা যদি সইতে পারে, তিনি কেন পারবেন না বলেই, কেঁদে উঠে জয়ন্তী। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, আমি কোন স্বৃকীতি চাইনা, অর্থনৈতিক সাহয্যও চাইনা। আমি শুধু চাই বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে ধরে দু:খটা ভাগ করে নিতে।

Fulbaria Birangana-
বীরাঙ্গনা নূরজাহান
তরফদার বাড়ীতে আগুন দিয়েছে পাকসেনারা। ভয়ে মসজিদে আশ্রয় নিয়েছে গ্রামের মানুষ। মসজিদ নিরাপদ নয় ভেবে ভয়ে পালাচ্ছে গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বণিতা। তাদের সাথে এক সন্তানের জননীও। একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে দৌড়ানোর সময় দুই পাকসেনা এক সন্তানের জননীকে ধরে নিয়ে বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে সর্বস্ব লুটে নেয়। দেশ স্বাধীনের পর এক রাতে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় স্বামী। আশ্রয় নেয় ভারতে। ৪৫ বছর ধরে স্বামী হারা  বীরাঙ্গনার দিন চলে ভিক্ষার টাকায়।
স্বাধীনতা সংগ্রামের ১২ বছর আগে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ছনকান্দা গ্রামের মানিক বেপারীর মেয়ে নূরজাহানের সাথে একই গ্রামের শের আলী মন্ডলের পুত্র হযরত আলীর সাথে বিয়ে হয়। স্বামী দিনমজুর। পরের বাড়ীতে কাজ করে এক মেয়ে সন্তান নিয়ে। সুখেই চলছিল তাদের সংসার।
১৯৭১ সনের ভাদ্র মাসের বুধবার সকাল ১০ টার দিকে পাকসেনা ও স্থানীয় আলবদর ও রাজাকাররা পাশ্ববর্তী বাড়ীর তরফদার বাড়ীতে আগুন দেয়। এলাকার অন্যান্যদের সাথে নূরজাহানও একটি মসজিদে আশ্রয় নেয়। মসজিদ নিরাপদ নয় ভেবে সকলেই এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ী শুরু করে। তাদের সাথে নূরজাহানও দৌড়ায়। নূরজাহান তাদের বাড়ীর দক্ষিনের ছনকান্দা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের  মাঠ দিয়ে দৌড়ানোর সময় নূরজাহানের উপর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে পাকসেনা ও রাজাকারদের। মাঠ থেকে ধরে নিয়ে দুই পাকসেনা সর্বস্ব লুটে নেয় তার।
দেশ স্বাধীন হয়ার পর বীরাঙ্গনা নূরজাহানের কপালে জমতে থাকে কালো মেঘ। একদিন রাতে কাউকে কিছু না বলে বাড়ী ছাড়ে স্বামী হযরত আলী। এক সন্তানের জননী স্বামীর জন্য অপেক্ষায় থেকে ভিক্ষা করে সংসার চালাতে শুরু করে। ৪৫ বছর ধরে চলছে তার ভিক্ষাবৃত্তি।
৪৫ বছর ধরে বীরাঙ্গনা নূরজাহানের ধারনা ছিল সর্বস্ব লুটের খবর প্রকাশ পেলে কবর দেবে না মানুষ। এ ভয়ে কোন মিডিয়ার সামনে মুখ খুলেনি বীরাঙ্গনা নূরজাহান। কানে কম শোনা বৃদ্ধা নূরজাহান যুদ্ধের স্মৃতি স্বরন করে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। যেন সমস্ত আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে তার বুকে। শাড়ীর আচল দিয়ে মুখমুঁচে আর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, কত শত কথা জমা তার বুকের ভিতর।
দেশ স্বাধীনের পর বাড়ী থেকে চলা যাওয়া স্বামী হযরত আলী আশ্রয় নেয় ভারতে। বর্তমানে অপর স্ত্রী সন্তান নিয়ে হযরত আলী বসবাস করে নগাঁও জেলার লংকা থানার আর্মি বাজারের জেঠাংবস্তিতে।
বীরাঙ্গনা নূরজাহানের মেয়ে হাজেরা খাতুন জানান, ৮/৯ বছর আগে তার ভারত থেকে বাড়ীতে এসেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন পরে বাপকে কাছে পেয়ে খুশি হয়নি মা খুশি হয়নি কেউ। কিছুদিন পরে সে আবার চলে গেছে ভারতে। মানুষের কাছে শুনছেন ভারতে রয়েছে তাদের ৫/৬ জন ভাই বোন।
দুলাল তরফদার জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক। নূরজাহানকে পাকসেনারা ধরে পাশবিক নির্যাতন করেছে । সে সময় তিনি দূর থেকে দেখেছেন, কিন্তু কিছুই করার ছিল না।

Fulbaria -Malaka-
ফুলবাড়ীয়ায় এক সময় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৪শ ৫০ জন। মৃত্যু জনিত কারনে এ সংখ্যা এখন ৩৫০ জনে। ফুলবাড়ীয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এ বি সিদ্দিক জানান, ফুলবাড়ীয়ায় ১৮ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা রয়েছে। তার মধ্যে তালিকা ভুক্ত ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা। নতুন করে ১৮শ ৯৭ জন মুক্তিযোদ্ধা আবেদন করেছে। তাদের বাছাঁই কবে নাগাদ হবে জানতে চাইলে তিনি জানান, আগামী বাজেটের পর নতুন করে আবেদনকারীদের বাছাঁই প্রক্রিয়া শুরু হবে। বাজেটের সাথে মুক্তিযোদ্ধা বাছাঁইয়ের সম্পর্ক কি জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দিতে পারেননি।
বীরাঙ্গনার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি একগাল হেসে জানান, আসলে বীরাঙ্গনার কোন তালিকা তাদের কাছে নেই। ইদানিং ৩ জনের নাম পাওয়া গেছে। বীরাঙ্গনাদের নাম তালিকা ভুক্তির বিষয়ে মোটা অংকের ঘুষ দাবীর বিষয়টি জানতে তিনি প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে জানান, ঘুষদাবী করা মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
এ উপজেলা আওয়ামীলীগের তথ্য ও গবেষনা বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট ইমদাদুল হক সেলিম জানান, ৩ বীরাঙ্গনাদের ২৬ মার্চ সংবর্ধনা দেয়া হবে। এটা হবে বীরাঙ্গনাদের প্রথম সংবর্ধনা। বীরাঙ্গনাদের আর্থিক সহায়তা করা হচ্ছে। তাদের নাম তালিকার ভুক্তির জন্য উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে। অতি দ্রুত তাদের নাম তালিকাভুক্তি করা হবে।
আলোকিত ময়মনসিংহ পত্রিকার সম্পাদক প্রদীপ ভৌমিক বীরাঙ্গনাদের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য নেয়ার জন্য ফুলবাড়ীয়ায় বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলেন, এক পর্যায়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার বনানী বিস্বাসকে বীরাঙ্গনাদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ৭দিন আগে তাদের সম্পর্কে শুনেছি। এখন পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে কোন সাহায্য করা হয় নাই। তবে ফুলবাড়ীয়া উপজেলা পরিষদ ২৬শে মার্চ তাদেরকে সংবর্ধনা ও আর্থিক সাহায্য করার সিন্দান্ত নিয়েছে।
বীরাঙ্গনা পরিবারের শেষ ইচ্ছা ঃ

DSC04030
ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ৩ বীরাঙ্গনার মধ্যে একজন শহীদ। বাকী দুজন এখনো জীবিত।  বীরাঙ্গনা পরিবার গুলো জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বাংলাদেশের প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করে মরতে চান। এটাই তাদের প্রত্যাশা।
এই প্রতিবেদনটি যাদের সহযোগীতায় প্রকাশ করা হয়েছে দৈনিক আলোকিত ময়মনসিংহ পত্রিকার সম্পাদক প্রদীপ ভৌমিক, ফুলবাড়ীয়া প্রতিনিধি সেলিম হোসাইন, মোনালিসা।

ব্রেকিং নিউজঃ