| |

ফুলবাড়ীয়ার ঐতিহ্যবাহী লালচিনি তৈরিতে ব্যস্ত কৃষাণ কৃষাণী

আপডেটঃ 2:59 am | March 26, 2016

Ad

সেলিম হোসাইন, ফুলবাড়ীয়া : ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার দেশ খ্যাত ঐতিহ্যবাহী হাতে তৈরী লাল চিনি তৈরীর ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষাণ কৃষাণীরা।
লাল চিনি শুধু মজাদারই নয়, স্বাস্থ্য সম্মত। লাল চিনির তৈরী ফুকা পিঠা, তিলে লাড়–, মুড়ির মোয়া, নারিকেলের তক্তি খেতে খুব মজদার ও সু¯া^াদ। এছাড়াও লাল চিনি তৈরী হয় মজাদার খাবার ‘খীর’। এখনো ফুলবাড়ীয়ায় নতুন জামইকে শ্বাশুরী গরম খীর খাইয়ে জামাই আদার করে থাকেন। জামাই তাতে তুষ্টু হন। গ্রামে প্রবাদ রয়েছে ‘করলে তৈরী লাল চিনির খীর’ খাওয়ার জন্য পড়ে যায় ভীড়। লাল চিনির মিঠাই ও খুব মজাদার। ঘরের বৌ-ঝি’রা চিনির মিঠাই কাঁচের বৈয়ামে ভরে রাখে মাসের পর মাস। সারাদিন বাড়ীর কাজ শেষে বৌ-ঝি’রা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন লাল চিনির একটুকরো মিঠাই খেয়ে ক্লান্তি দূর করে। আঁেখর কাচা রস যেমন সুস্বাদ তেমনি উপকারী। আর পাকা (জ্বালকরা) রস অনেক দিন বোতল জাত করে। বোতলজাত রস আত্মীয় স্বজনদের বাড়ী নিয়ে যাওয়ার ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে চলছে ফুলবাড়ীয়ায়।
পৌষ মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে একটানা ফাল্গুন মাস পর্যন্ত আঁখ মাড়াই ও লাল চিনি তৈরির কাজ চলে। আঁখ চাষীরা সাধারনত ফাল্গুন মাসের শেষের দিক থেকে শুরু করে বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি আখেরঁ চারা রোপন  শেষে খর কুটা দিয়ে রোপনকৃত আঁখা ক্ষেতের আইলে ঢেকে দওয়া হয়। কিছুদিন পর চারা হতে অংকুর গজিয়ে বড় হয়ে আঁখ গাছে রূপ নেয়। এর পর শুরু হয় আঁখ ক্ষেতের পরিচর্যা। প্রয়োজন মতো জৈব ও রাসায়নিক সার দেয়ার পর পুর্ণাঙ্গ আঁেখ পরিণত হয়। আঁখ মাড়াইয়ের পূর্বে চাষীরা লাল চিনি তৈরীর জন্য জ্বালঘর তৈরী করে। লাল চিনি তৈরীতে প্রথমে ৩ শলা বিশিষ্ট লোহার চাপ যন্ত্রের সাহায্যে সেলু মেশিন অথবা যন্ত্রে বিদ্যুৎ চালিত মটর সংযোগ দিয়ে আবার কেউ কেউ চাপ যন্ত্রটি গরু-মহিষ দ্বারা ঘানি টেনে আঁখ মাড়াইয়ের মাধ্যমে রস বের করে। জ্বালঘরে চুলায় দেয়া লোহার বড় কড়াইয়ে পরিমান মতো কাঁচা আঁেখর রস দিয়ে আধাঘন্টা পরিমান জ্বাল দিতে হয়। এক পর্যায়ে ঘন গরম সর আগুনের চুল্লী থেকে নামিয়ে পাত্রটিতে লাল চিনি তৈরীর কারিগর কাঠের তৈরী হাতল দিয়ে দ্রুত ঘর্ষন শুরু করে। আস্তে আস্তে ঠান্তা হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে ঘন জ্বাল দেয়া সর মিহি লাল দানায় রূপ নেয়। প্রতি কাঠায় ৪৫ থেকে ৫০ টিন  আখের রস হয়। প্রতিটিনে ১৫ থেকে ১৬ কেজি কাঁচা রস হয়। ১টিন কাঁচা আখের রস থেকে লাল চিনি পাওয়া যায় ৪ থেকে ৫ কেজি। হাতে তৈরী লাল চিনি কৃষক প্রথমে রোদ্রে শুকিয়ে ঝড় ঝড়া করে বিক্রি করে দেয় বেপারীদের কাছে।
জ্বাল ঘরের দুল্লীতে কাঁচা রস জ্বাল দেয়ার কাজটি করে আঁখের শুকনো পাতা দিয়েই।
উপজেলা কৃষি অফিসার ড. নাসরিন আক্তার বানু জানান, উপজেলায় প্রায় ৭ হাজার কৃষক ১২৮০ হেক্টর জমিতে আখের চাষ করেছে। রাধাকানাই কালাদহ, পলাশতলী, বাকতা, বিদ্যানন্দ এসব এলাকার আঁখ চাষীদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি দেয়া হলে ফুলবাড়ীয়ায় অধিক লাল চিনি উৎপাদন হবে। বর্তমান বাজারে সাদা চিনি প্রতি কেজি ৪৫ টাকা আর লাল চিনি প্রতিকেজি  ৬৫থেকে ৭০ টাকা কেজি। কৃষকের মতে গত বছরের চেয়ে এ বছর লাল চিনির বাজার অনেক ভালো। মৌসুমের শুরুতেই পাইকারী প্রতি মণ লাল চিনি বিক্রি হচ্ছে ২৩শ থেকে ২৫শ টাকা মণ দরে।
উপজেলার কৈয়ারচালা, বিদ্যানন্দ, পলাশতলী, কালাদহ, বাকতা ও সোয়াইতপুর গ্রামের কৃষক আঃ খালেক, তৈয়ব আলী, রুহুল, দৌলত ইকবাল ও হোসেন আলী নামের কৃষক বলেন, সারের মূল্য বৃদ্ধি, মাড়াই সমস্যা, শ্রমিক মুজুরী বৃদ্ধি, উন্নত আখের চাড়াসহ চাষীদের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন সু-দৃষ্টি না থাকায় আঁখ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

ব্রেকিং নিউজঃ