| |

৪৬তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস

আপডেটঃ 3:05 am | March 26, 2016

Ad

আলোকিত ময়মনসিংহ : ‘পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত ঘোষণার ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে, নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক, এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।’ প্রয়াত কবি শামসুর রাহমান স্বাধীনতার প্রত্যাশায় উন্মুখ একটি জাতির চেতনাকে ধারণ করে এভাবেই স্বাধীনতাকামী বাঙালির কথা তুলে ধরেছেন।

হ্যা, স্বাধীনতা এসেছে ৩০ লাখ শহীদের প্রানের বিনিমিয়ে। দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর পর।

২৬ মার্চ। ৪৬তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ৪৫ বছর আগে ১৯৭১ সালের এ দিনটিতে আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের। দীর্ঘ নয় মাসের বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা। জাতি পেয়েছিলো একটি দেশ, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত।

ভয়াল ‘কালরাত্রি’র পোড়া ইট-কাঠ, লাশ আর জননীর কান্না নিয়ে রক্তে রাঙা নতুন সূর্য উঠেছিলো ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। ধ্বংসস্তূপ আর লাশের ভেতর দিয়ে রক্তরাঙা সেই নতুন সূর্য। ভীত-বিহ্বল মানুষ দেখলো লাশপোড়া ভোর। সারি সারি স্বজনের মৃতদেহ। আকাশে কুণ্ডুলি পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। পুড়ছে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র আঁকা লাল-সবুজ পতাকা। জ্বলছে শাড়ি, খুকুর ফ্রক। চোখে জল। বুকে আগুন। জ্বলে উঠলো মুক্তিকামী মানুষের চোখ, গড়লো প্রতিরোধ। পেলো স্বাধীনতা।

শনিবার (২৬ মার্চ) ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি জাতির জীবনে সূচনা ঘটছে আরও একটি ঝলমল উৎসব দিনের। রক্ত ও অশ্রুস্নাত বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহের দিন ২৬ মার্চ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মহার্ঘ্য স্বাধীনতার ৪৪তম বার্ষিকী। এ ভূ-ভাগের সবচেয়ে বড় অর্জন, বাঙালির সহস্র বছরের জীবন কাঁপানো ইতিহাস মহান স্বাধীনতা। অসংখ্য শহীদের রক্তে ভেজা,জাতির বীর সেনানীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা দিন। বাঙালির স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিন।

অত্যাচার-নিপীড়নে জর্জরিত বাঙালি জাতির সামনে আলোকময় ভবিষ্যতের দুয়ার খুলে দিয়েছিলো এই দিন। গৌরব ও স্বজন হারানোর বেদনার এই দিনে বীর বাঙালি সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেছিলো। তাই এদিন গৌরব ও অহংকারের দিন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন বই, উইকিপিডিয়া, সংবাদপত্র এবং বিভিন্ন প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পরেই ভাষার প্রশ্নে একাত্ম হয় বাঙালি। ১৯৪৮, ‘৫২ পেরিয়ে ‘৫৪, ‘৬২, ‘৬৬-এর পথ বেয়ে আসে ১৯৬৯।

’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে কেঁপে ওঠে জেনারেল আইয়ুবের শাসন। জনতার সাগরে উন্মাতাল স্রোতধারা। ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’ শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় গ্রাম-শহর-জনপদ।

শত ষড়যন্ত্র ও সামরিক জান্তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ’৭০ এর জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু বাঙালির হাতে শাসন ভার দেওয়ার বদলে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে করতে থাকেন কালক্ষেপণ। প্রস্তুত হয় হিংস্র কায়দায় বাঙালি হত্যাযজ্ঞে। তবে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণেই পাওয়া যায় দিক-নির্দেশনা। আক্ষরিক অর্থে তখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন চলছিলো বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই।

সেই প্রবল প্রদীপ্ত আন্দোলনের জোয়ারে ধীরে ধীরে বাঙালির হৃদয়ে আঁকা হয় একটি লাল-সবুজ পতাকা, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ছবি। কিন্তু বাঙালির আবেগ, সংগ্রাম ও মুক্তির আকাঙ্খাকে নির্মূল করতে অস্ত্র হাতে নামে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী। শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শুরু করে নিষ্ঠুর গণহত্যা। সেই কালরাত থেকেই শুরু হয় মৃত্যু, ধ্বংস, আগুন আর আর্তনাদের পৈশাচিক বর্বরতা। কিন্তু ওই ঘোরতর অমানিশা ভেদ করেই দেশের আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার চির ভাস্বর সূর্য।

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতারের আগ মুহূর্তে দেওয়া সে ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু শত্রু সেনাদের বিতাড়িত করতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ ও নির্দেশ দেন। তৎকালীন ইপিআর’র ওয়্যারলেস থেকে সে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের সর্বত্র।

পরদিন ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি) বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার আরেকটি ঘোষণা পাঠ করেন।

১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার নিভৃত এক আমবাগানে শপথ নেয় স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী সরকার। এ আমবাগানকে পরে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত এ বিপ্লবী সরকারের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় হানাদার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে এই মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।
বিশ্ব মানচিত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামের স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

বিভিন্ন কর্মসূচি
মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন।

যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালন উপলক্ষে এবার জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। শনিবার প্রত্যুষে রাজধানীতে একত্রিশ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

এরপর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধারা, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিকগণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণ জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে প্রধান অতিথি থাকবেন।

দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রগুলোয় বিশেষ নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হবে। সরকারি ও বেসরকারি বেতার ও টিভি চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচারিত হবে।

এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।

জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করবে। হাসপাতাল, জেলখানা, বৃদ্ধাশ্রমসহ এ ধরনের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে এবং রাতে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে।

দেশের সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসেও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করবে।

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শনিবার সরকারি ছুটির দিন। এদিন রাজধানীর সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকাসহ নানা রঙের পতাকা দিয়ে সাজানো হবে।

দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- আগামীকাল ভোরে বঙ্গবন্ধু ভবন এবং দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৬টায় সাভারস্থ জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে এবং সকাল ১১টায় টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন।

২৭ মার্চ বিকাল ৩টা ৩০মিনিটে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আলোচনা সভা। এতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন।

দিবসটি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এছাড়া বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, গণফোরামসহ বিভিন্ন যুব ও ছাত্র সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

ব্রেকিং নিউজঃ